খাগড়াছড়ি

মসজিদ-মন্দিরে সরকারি বরাদ্দের চাল নিয়ে ‘চালবাজি’

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৬, ১৭:৫৮

প্রতিটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দেওয়ার কথা এক মেট্রিকটন চাল। কিন্তু তার পরিবর্তে দেওয়া হলো ৯ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজি চালের বিপরীতে মিলেছে ৭ থেকে ৯ টাকা করে। শুনে শায়েস্তা খাঁর আমলের বাজার দরের কথা মনে পড়লেও এই ঘটনা সত্যিই ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে খাগড়াছড়ির রামগড়ে।

মূলত ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের মানবিক ত্রাণের আওতায় খাগড়াছড়ির রামগড়ে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দের এক মেট্রিকটন চালের বরাদ্দ থাকলেও তার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৭ ও ৯ হাজার টাকা করে ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার ২৭টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নামে ২৭ মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীলরা অভিযোগ করেন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা বরাদ্দের চাল প্রতিটন ৩৩-৩৪ হাজার টাকায় বিক্রি করে তাদেরকে দিয়েছেন ৭ হাজার ও ৯ হাজার টাকা হারে।

তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এস এম এ করিম।

জানা যায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে বন্যা, নদী ভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য মানবিক সহায়তা হিসেবে প্রদত্ত ত্রাণ কার্যের (চাল) বরাদ্দ থেকে রামগড় উপজেলার জন্য ১২ মেট্রিকটন, রামগড় পৌরসভার জন্য  তিন মেট্রিকটন ও দীঘিনালা উপজেলার জন্য  ৮ মেট্রিকটন চাল উপ বরাদ্দ দেন জেলা প্রশাসক। এছাড়া  একই সময়ে সরকারি-বেসরকারি এতিমখানা, লিল্লাহ বোর্ডিং, অনাথ আশ্রম, বৃদ্ধাশ্রম ও অন্যান্য  সামাজিক কল্যাণে নিয়োজিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে মানবিক সহায়তা হিসেবে জেলার ৯ উপজেলা ও তিনটি পৌরসভার জন্য মোট ৯৬ মেট্রিকটন চাল উপ বরাদ্দ দেন জেলা প্রশাসক। তারমধ্যে রামগড় উপজেলার জন্য ১০ মেট্রিকটন ও পৌরসভার জন্য ৫ মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ হয়।

গত ১৫ জুন জেলা প্রশাসক সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের অনুকূলে এ উপ বরাদ্দ দেন বিতরণের জন্য।

জানা যায়, রামগড় উপজেলার ২৭টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নামে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নামে এক মেট্রিকটন হারে চাল বরাদ্দ করেন। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কাছ থেকে বরাদ্দপত্র গ্রহণের পর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও খাদ্য গুদামের মাধ্যমে  বরাদ্দ করা চালের ছাড়করণ হয়। অভিযোগ উঠেছে, বরাদ্দপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদের এক টন চালের বদলে নগদ ৯ হাজার ও ৭ হাজার টাকা করে প্রদান করা হয়েছে।

১২টি মসজিদ ও নূরাণী মাদ্রাসায় চাল না দিয়ে প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে নগদ ৯ হাজার টাকা, ১০ টি মন্দির ও বৌদ্ধ বিহারের দায়িত্বশীলদের সাত হাজার টাকা  হারে প্রদান করা হয়। অন্যদিকে একটি মাদ্রাসায় দেওয়া হয় ২০ হাজার টাকা।

রামগড় পৌর সভার তালিমুল কুরআন নূরাণী মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন অভিযোগ করে বলেন,

‘আমার মাদ্রাসার নামে এক মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ হলেও পিআইও (প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা) মাদ্রাসার এক শিক্ষককে অফিসে ডেকে নিয়ে ৯ হাজার টাকা দিয়েছেন।’

একই অভিযোগ করেছেন, বালুখালি বাহারুল উলুম ইসলামিয়া মাদ্রাসা ও এতিম খানার সভাপতি ওসমান গণি, বলিটিলা তালিমুল কুরআন মাদ্রাসার সভাপতি আবু বকর সিদ্দিক, সোনাই আগা কালী মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি।

ধনঞ্জয় ত্রিপুরাসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও শিক্ষক। তারা জানান, ‘পিআইও বরাদ্দের চাল বাজারে প্রতিটন ৩৩-৩৪ হাজার টাকা হারে বিক্রি করেছেন। অথচ আমাদের কাউকে দিয়েছে ৯ হাজার  টাকা, আবার কাউকে ৭ হাজার টাকা।’

বালুখালি বাহারুল  উলুম ইসলামিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ওসমান গণি অভিযোগ করে বলেন, ‘বালুখালি আলো তালীমুল কুরআন মাদ্রাসা নামে একটি প্রতিষ্ঠানের নামে  এক টন বরাদ্দ দেওয়া হলেও এ নামে ওই এলাকায় কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নাই।’

এদিকে, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এএসএম করিম এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ‘যার নামে বরাদ্দপত্র ইস্যু করা হয়, সে  ব্যতিত অন্য কারও পক্ষে বরাদ্দের চাল বা গম  খাদ্য গুদাম থেকে উত্তোলন করা সম্ভব নয়।’

রামগড় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী শামীম এ ব্যাপারে বলেন, ‘মৌখিকভাবে এ  অভিযোগ পেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছি। তদন্তক্রমে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ইত্তেফাক/এপি