গত ২৪ ঘণ্টায় অতিবর্ষণে প্লাবিত হয়েছে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা। পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় কক্সবাজারে মোট ৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। অতিবর্ষণে আবারও পাহাড় ধসের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রোববার (৫ জুলাই) বিকেল থেকে সোমবার বিকেল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার ভারীবর্ষণে পৃথক চারটি পাহাড় ধসের ঘটনায় রোহিঙ্গা নারী-শিশু এবং স্থানীয়সহ মোট ৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও পুরো জেলার পাহাড়ি এলাকায় বাস করা লাখো মানুষ চরম আতঙ্কে রয়েছেন।
অন্যদিকে আরও দুই দিন বৃষ্ট অব্যাহত থাকার আভাস জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। অতিভারী বর্ষণে ইতোমধ্যে প্লাবিত হচ্ছে জেলা ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিম্নাঞ্চল ও সমতল।
বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন এলাকায় থাকা লাখো মানুষ উৎকণ্ঠায় দিনপার করছেন। প্রতিবছরই পাহাড় ধসে ঘটছে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি- তবুও শুষ্ক মৌসুমে নিরাপদ আশ্রয় গড়ার তাগিদ থাকে না। ঝুঁকিতে প্রাণহানি এড়াতে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পরামর্শ দিচ্ছেন জেলা ও উপজেলা প্রশাসন।
সূত্রমতে, কক্সবাজারে একরাতের ভারীবর্ষণে সোমবার দিবাগত রাত ও ভোরের পৃথক চারটি পাহাড় ধসের ঘটনায় নারী-শিশুসহ ৯জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মাঝে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৃথক তিনটি পাহাড়ধসের ঘটনায় রোহিঙ্গা নারী-শিশুসহ ৮ জন মারা গেছেন। পাহাড় ধসে নিহতের ঘটনা কক্সবাজার সদরের পৌরসভা এলাকায়।
নিহতরা হলেন- উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী ক্যাম্পের ডি/৬ ব্লকে আশ্রিত রোহিঙ্গা মোহাম্মদ কামাল হোসাইন (৪৪), স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং ছেলে মোহাম্মদ আনাস (৪), রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৭ ব্লকের মোহাম্মদ রশিদের ছেলে একরাম (৭), বালুখালী ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি/১১ ব্লকের বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাকের মেয়ে উম্মে হাবিবা (২৭) ও তানজিনা আক্তার (১৩), একই ক্যাম্পের মোহাম্মদ রশিদের ছেলে মোহাম্মদ রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩) এবং কক্সবাজার সদরের পৌরসভার ১২নং ওয়ার্ডের ছাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে মারা যান আলী আকবর (৪৬)।
উখিয়া ফায়ারসার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা বলেন, উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী ক্যাম্পের ডি/৬ ব্লকে বসতঘরের ওপর পাহাড় ধসে মাটি এসে কামাল হোসাইনের বাসা চাপা পড়ে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ফায়ারসার্ভিস কর্মীরা উদ্ধার তৎপরতা চালায়। এসময় স্বামী-স্ত্রী-সন্তানসহ ৩ জনকে মৃত ও ২ জনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। একই রাত ২টার দিকে রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং ৭নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৭ ব্লকে পাহাড়ি ঢলে আসা মাটি চাপায় একরাম (৭) নামে এক রোহিঙ্গা শিশুর মৃত্যু হয়।
রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকরা শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে বলে জানিয়েছেন ক্যাম্পের মাঝি এনায়েত উল্লাহ। সর্বশেষ রাত ৩টার দিকে বালুখালী ১১নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি/১১ ব্লকে পাহাড়ধসে নারী ও শিশুসহ চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। এসময় আহত হন আরও একজন।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন,
ভারীবর্ষণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৃথক পাহাড় ধসের ঘটনায় ৮ জন মারা যাওয়ার খবর পেয়েছি। বৃষ্টি চলমান থাকায় পাহাড়ধসের আরও আশঙ্কা রয়েছে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থানকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, সোমবার ভোরে কক্সবাজার সদরের পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে আলী আকবর নামে একজনের মৃত্যু হয়। এসময় পাহাড় ধসে চাপা পড়ে একই পরিবারের ৩ জন। স্থানীয়রা ৩ জনকে উদ্ধার করে। এসময় আলী আকবরের অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর কক্সবাজারের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, কক্সবাজারে রোববার বেলা ১২টা থেকে সোমবার (৬ জুলাই) বেলা ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ২৬৭ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এ বৃষ্টিপাত হচ্ছে। সমুদ্রবন্দর গুলোতে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। আরও দুইদিন ভারীবর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে।
ঝুঁকিতে থাকা ক্যাম্প ৯ এর বাসিন্দা মাবিয়া খাতুন বলেন, সমতলে জায়গা পায়নি। তাই পাহাড়ে ঘর করেছি। পাহাড়ের উপরেও ঘর, নিচেও ঘর। কোন সময় ধসে পড়বে ভয়ে থাকি। বৃষ্টি হলেই পাহাড় ধসে আশঙ্কায় সময় কাটে।
কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ভূমিধসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই প্রতিটি ক্যাম্পে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম ও সচেতনতামূলক উদ্যোগ নেয়া হয়। ভূমিধসের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলো বিশেষ নজরদারিতে রয়েছে। ঝুঁকিতে থাকাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার কার্যক্রম চলছে। গত বছর এ কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন হয়, এবারও এর ব্যতিক্রম হবে না বলে আশা করেন তিনি।
এদিকে কক্সবাজারের ঈদগাঁও বাজার, ফসলি বিল, মানুষের ঘরবাড়ি, পোকখালী, চৌফলদন্ডী, পেকুয়া, চকরিয়া, রামু, কক্সবাজার শহরের বিজিবি ক্যাম্প, আলীরজাহাল, এসএমপাড়া, কুতুবদিয়াপাড়া, সমিতিপাড়া, পর্যটনজোন, মহেশখালীর নিম্নাঞ্চল বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে। অনেক বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে সৃষ্টি হয়েছে দুর্ভোগ। জেলার অন্য পাহাড়ি এলাকাতেও একইভাবে ঝুঁকিতে বাস করছেন হাজারো মানুষ।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, ভারী বর্ষণের আভাস পাওয়ার পর থেকেই সবখানে সতর্কতার আগাম বার্তা দেওয়া হয়। এরপরও রোববার দিনগত রাতে এবং সোমবার ভোরে পাহাড় ধসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৮ জন এবং কক্সবাজার শহরে একজন মারা গেছেন। ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যেতে মাইকিং অব্যাহত রেখেছি। ভারী বর্ষণ যেহেতু আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, জেলা ও উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা করা হয়েছে। সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কক্সবাজারের পরিস্থিতি মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে।

