মধ্যপ্রাচ্যে এফ-৩৫ সহ বিপুলসংখ্যক যুদ্ধবিমান পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৬, ১৬:৩৮

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কার মধ্যে ইসরায়েলে অতিরিক্ত যুদ্ধবিমান ও মাঝ আকাশে জ্বালানি ভরার রিফুয়েলিং বিমান আনতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে অঞ্চলজুড়ে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন, কঠোর ভ্রমণ সতর্কতা, সামরিক কৌশলে পরিবর্তন এবং ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য নতুন অভিযানের প্রস্তুতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ওয়াশিংটন আবারও সংঘাতের মাত্রা বাড়ানোর পথে এগোচ্ছে। যদিও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এখনই পূর্ণমাত্রার যুদ্ধকে অনিবার্য বলতে নারাজ, তবু তাদের মূল্যায়ন, পরিস্থিতি খুব দ্রুত বদলে যেতে পারে।

টানা আট রাত ধরে চলা হামলা-পাল্টা হামলার পর উপসাগরীয় অঞ্চলে গোলাগুলির এই বিনিময় যেন এখন এক ধরনের দৈনন্দিন রুটিনে পরিণত হয়েছে। ইরানে প্রতিটি নতুন দফার হামলা শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী একটি বিবৃতি দেয়, আবার অভিযান শেষ হওয়ার পর আরেকটি বিবৃতি প্রকাশ করে। জবাবে ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ে দেয় এবং নতুন করে হুমকি উচ্চারণ করে। শনিবার রাত থেকে আজ রোববার সকাল পর্যন্তও একই ধারা অব্যাহত ছিল। আজ রোববার সকালে কুয়েতে সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে।

সাম্প্রতিক কয়েক দিনের একাধিক ঘটনার পর এমন মূল্যায়ন সামনে এসেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে আরেক দফা উত্তেজনা বৃদ্ধির জন্য নিজেদের প্রস্তুতির মাত্রা বাড়াচ্ছে, যা প্রয়োজনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফিরে যাওয়ার পথও খুলে দিতে পারে। অঞ্চলে অতিরিক্ত মার্কিন সেনা মোতায়েন, রিফুয়েলিং বিমান ও যুদ্ধবিমান পৌঁছানো, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের জন্য আরও কঠোর ভ্রমণ সতর্কতা জারি এবং সাম্প্রতিক সংঘাত থেকে শিক্ষা নিয়ে সামরিক পরিকল্পনায় পরিবর্তনের খবর, সব মিলিয়ে বড় ধরনের প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

মূল্যায়ন হলো, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী (মিডটার্ম) নির্বাচনের আগে ওয়াশিংটন যদি নতুন কোনো উত্তেজনা সৃষ্টি করে, তবে তা সম্ভবত সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত রাখার চেষ্টা করবে। কিন্তু ইরানের সঙ্গে সীমিত সংঘর্ষও নিয়ন্ত্রণে রাখা মোটেও সহজ নয়। গতকাল শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ঘোষণা দেয়, একদিন আগে জর্ডানে ইরানের হামলায় ২ মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং আরও এক সেনা এখনো নিখোঁজ। সংঘর্ষ পুনরায় শুরু হওয়ার পর এটাই প্রথম মার্কিন সামরিক প্রাণহানির ঘটনা।

মার্কিন কর্মকর্তারা মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসকে জানান, সাম্প্রতিক কয়েক দিনে জর্ডানে আরও কয়েক ডজন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। ওয়াশিংটনের দাবি, এর জবাব হিসেবে টানা অষ্টম রাতেও ইরানে হামলা চালানো হয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই প্রতিশোধকে যথেষ্ট বলে মনে নাও করতে পারেন।

আরেক মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, নিহত সেনারা মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে অবস্থান করছিলেন। এই ঘাঁটির একটি টার্মিনাল হাই অলটিট্যুড এয়ার ডিফেন্স বা থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গত মার্চ মাসে হামলার শিকার হয়েছিল। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, ইরান মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে এবং এমন অত্যন্ত দ্রুতগতির ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে, যা ভূমির কাছে পৌঁছানোর সময় কৌশলে দিক পরিবর্তন করতে সক্ষম।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংবেদনশীল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ইরানের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। কারণ মার্কিন মহলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, লক্ষ্য নির্ধারণে (টার্গেট অ্যাকুইজিশন) ইরান হয়তো চীন বা রাশিয়ার সহায়তা পাচ্ছে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ধৈর্যও ফুরিয়ে আসছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ধারাবাহিক হামলা এবং মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রশাসনের ভেতরে কঠোরপন্থিদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। তাদের দাবি, এখন ‘কাজ শেষ করার’ সময় এসে গেছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেন্টাগন সাম্প্রতিক সংঘাত থেকে শিক্ষা নিচ্ছে। ভবিষ্যৎ হামলাকে আরও কার্যকর করতে এবং ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অতিক্রম করতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ড্রোন ও অন্যান্য মানববিহীন ব্যবস্থার ব্যবহার আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান।

ইসরায়েলে পৌঁছাচ্ছে মার্কিন যুদ্ধবিমান
এদিকে, আরেক দফা উত্তেজনার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলে রিফুয়েলিং বিমান এবং যুদ্ধবিমান পাঠাচ্ছে। মার্কিন পাইলট ও ক্রুরা শুরুতে তেল আবিবের কাছাকাছি অবস্থান, সমুদ্র উপকূল এবং রাতের জীবনযাত্রার সুবিধার কারণে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে অবস্থান করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) নিশ্চিত করেছে, ট্যাংকার বিমানগুলো শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর ঘাঁটিতেই মোতায়েন করা হবে।

ক্রুদের অবসর সময়ে দক্ষিণ ইসরায়েলের ঘাঁটি থেকে তেল আবিবে যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে পৌঁছে যাওয়া কয়েক ডজন রিফুয়েলিং বিমানের পাশাপাশি যুদ্ধবিমানও ইসরায়েলে স্থানান্তর করা হচ্ছে। ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র জার্মানির স্পাংডাহলেম বিমানঘাঁটি থেকে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছে। একই সঙ্গে ব্রিটেন থেকে অত্যাধুনিক স্টেলথ এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও এই অঞ্চলে স্থানান্তর করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব যুদ্ধবিমান অন্যান্য মিশনের পাশাপাশি ইরানের ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাকে সহায়তা করা রাডার ধ্বংসের কাজেও ব্যবহার করা হতে পারে।

ইত্তেফাক/এনএ