এডিবির নামে প্রতারণার ফাঁদ!

আপডেট : ২২ জুলাই ২০২৬, ০৪:০০

একসময় প্রতারকেরা ছদ্মবেশ ধারণ করিয়া মানুষের দ্বারে দ্বারে উপস্থিত হইত, আজ তাহারা মানুষের হাতের মুঠোয় থাকা মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পর্দায় প্রবেশ করিতেছে। বিশ্বাসকে পুঁজি করিয়াই তাহাদের এই বাণিজ্য। গত মঙ্গলবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন হইতে জানা যায়, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) নাম, লোগো ও কর্মকর্তাদের পরিচয় ব্যবহার করিয়া ভুয়া ঋণের প্রলোভন দেখাইয়া অর্থ আদায় করিতেছে কিছু প্রতারক।

প্রযুক্তির ইতিহাস মূলত মানুষের আস্থার ইতিহাস। মানুষ যখন ভাষা সৃষ্টি করিয়াছে, তখন সে অন্যের কথায় বিশ্বাস করিতে শিখিয়াছে। যখন মুদ্রা সৃষ্টি করিয়াছে, তখন অপরের প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস স্থাপন করিয়াছে। আর যখন ডিজিটাল জগতের দ্বার উন্মুক্ত করিয়াছে, তখন তাহার বিশ্বাসকেও ভার্চুয়াল পরিসরে স্থানান্তরিত করিয়াছে; কিন্তু সভ্যতার এক চিরন্তন সত্য এই যে, যেইখানে বিশ্বাসের আলো জ্বলে, প্রতারণার ছায়াও সেইখানে জন্ম লয়। আজকের সাইবার প্রতারণা সেই পুরাতন অন্ধকারেরই নূতন অবয়ব। প্রযুক্তির প্রসারের পাশাপাশি মানুষের জীবন যেমন সহজতর হইয়াছে, তেমনি প্রতারণার কৌশলও হইয়াছে অধিকতর পরিশীলিত। কেবল এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) নাম, লোগো ও কর্মকর্তাদের পরিচয় ব্যবহার করিয়া ভুয়া ঋণের প্রলোভন দেখানোর ঘটনা নূতন নহে, কিছুদিন পূর্বে বিশ্বব্যাংকের নাম ব্যবহার করিয়াও অনুরূপ প্রতারণার অভিযোগ উত্থাপিত হইয়াছিল। অর্থাৎ প্রতারকেরা এখন আর কেবল মানুষের অর্থ লুণ্ঠন করিতেছে না—তাহারা মানুষের বিশ্বাস, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা এবং ডিজিটাল সভ্যতার নিরাপত্তাবোধকেও আঘাত করিতেছে। আমাদের সমাজে প্রতারণার এই নূতন রূপের বিস্তারের পশ্চাতে এক নির্মম বাস্তবতাও রহিয়াছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থানের সংকট, সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা এবং দ্রুত উন্নতির স্বপ্ন বহু মানুষকে সহজেই প্রলোভনের জালে আবদ্ধ করিতেছে। যখন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করিয়া বলা হয় যে, কয়েকটি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করিলেই বিপুল পরিমাণ ঋণ কিংবা আর্থিক সহায়তা পাওয়া যাইবে, তখন অনেকের পক্ষেই সেই প্রলোভন উপেক্ষা করা সহজ নহে। একটি ভুয়া ওয়েবসাইট, একটি নকল ফেসবুক পেজ কিংবা জাল পরিচয়পত্র এখন অতি সহজেই তৈরি করা সম্ভব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ভুয়া তথ্যেরও একটি বিশ্বাসযোগ্য মুখচ্ছবি তৈরি করা সম্ভব। ফলে সত্য ও মিথ্যার মধ্যবর্তী ব্যবধান ক্রমশ ক্ষীণ হইয়া আসিতেছে। এই কারণেই ডিজিটাল সাক্ষরতা আজ বিলাসিতা নহে—ইহা নাগরিক জীবনের একটি মৌলিক প্রয়োজন।

প্রকৃত পক্ষে, এই সংকট কেবল অর্থনৈতিক অপরাধের সংকট নহে—ইহা বিশ্বাসের সংকট। একটি সমাজ তখনই সুস্থ থাকে, যখন তাহার নাগরিকেরা প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতি আস্থা রাখিতে পারেন। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কিংবা আর্থিক সংগঠন—সকলের বিশ্বাসযোগ্যতাই একটি সামাজিক সম্পদ। প্রতারকেরা যখন এই বিশ্বাসকে পণ্যসামগ্রীর ন্যায় ব্যবহার করে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমগ্র সমাজের পারস্পরিক আস্থার ভিত্তি। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক—তিন পক্ষেরই দায়িত্ব অনস্বীকার্য। রাষ্ট্রকে সাইবার অপরাধ দমনে অধিকতর দক্ষতা ও সমন্বয়ের পরিচয় দিতে হইবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রতারকদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনিবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অপরদিকে নাগরিকেরও কিছু দায়িত্ব রহিয়াছে। মনে রাখা প্রয়োজন, কোনো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ব্যক্তিপর্যায়ে সরাসরি ঋণ প্রদানের বিনিময়ে অর্থ দাবি করে না। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ প্রেরণের শর্তে ঋণ বা অনুদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করে, তাহা হইলে তাহা সন্দেহের চোখে দেখা আবশ্যক।

সভ্যতার অগ্রযাত্রা বিশ্বাস ব্যতীত সম্ভব নহে; কিন্তু সেই বিশ্বাসকে সচেতনতার প্রহরায় রক্ষা করাও সমানভাবে প্রয়োজন। কারণ, প্রতারণার বিরুদ্ধে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রযুক্তি এখনও কোনো যন্ত্র আবিষ্কার করিতে পারে নাই—তাহার নাম মানুষের বিবেচনাবোধ। স্মরণ রাখিতে হইবে, ডিজিটাল যুগে সেই বিবেচনাবোধই আমাদের সবচাইতে নিরাপদ পাসওয়ার্ড, সবচাইতে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা।

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন