সাভার ও আশুলিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান গ্যাস সংকট এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে আবাসিক এলাকায় দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজার হাজার পরিবার। নিয়মিত বিল পরিশোধ করেও কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে গ্রাহকদের মধ্যে। একই সঙ্গে অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিস্তার এবং শিল্পকারখানায় অতিরিক্ত গ্যাস ব্যবহারের কারণে বৈধ আবাসিক গ্রাহকরা বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত প্রায় দুই বছর ধরে সাভারের পুরো উপজেলাতেই গ্যাসের সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। গত কয়েক মাসে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। অনেক এলাকায় সারাদিন গ্যাস থাকে না। গভীর রাতে অল্প সময়ের জন্য গ্যাস এলেও চাপ এতটাই কম থাকে যে রান্না করা সম্ভব হয় না।
এ অবস্থায় বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার এলপি গ্যাস, বৈদ্যুতিক চুলা কিংবা মাটির চুলা ব্যবহার করছে। এতে একদিকে বাড়ছে অতিরিক্ত খরচ, অন্যদিকে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে প্রতিদিনই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও শিশুদের নিয়ে থাকা পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে।
সাভারের ব্যাংক কলোনি বাসিন্দা ফিরোজ আলম বলেন, সারাদিনে দুই ঘণ্টাও ঠিকমতো গ্যাস পাওয়া যায় না। গ্যাসের চাপ এত কম থাকে যে এক হাঁড়ি পানিও গরম করা যায় না। অথচ প্রতি মাসেই নিয়মিত বিল দিতে হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন শিল্পকারখানায় অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার কারণেই আবাসিক এলাকায় এমন সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
গেন্ডা এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন, বৈধ সংযোগ বন্ধ থাকলেও টাকা দিলেই অবৈধ গ্যাস সংযোগ মিলছে। কিছু অসাধু কর্মকর্তা, ঠিকাদার ও স্থানীয় দালালদের যোগসাজশে প্রকাশ্যেই অবৈধ সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। এতে বৈধ গ্রাহকরা ন্যায্য সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় বহু বাড়িতে অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি সংযোগের জন্য বাড়ির মালিকদের কাছ থেকে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অবৈধ সংযোগের কারণে পাইপলাইনের চাপ কমে গিয়ে বৈধ গ্রাহকদের বাসাবাড়িতে গ্যাস পৌঁছাচ্ছে না।
এদিকে দেশের এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক জটিলতার প্রভাবও সাভার ও আশুলিয়ার গ্যাস সংকটকে আরও প্রকট করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় শিল্পাঞ্চল ও আবাসিক এলাকায় চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ফলে শিল্পকারখানার পাশাপাশি সাধারণ গ্রাহকরাও ব্যাপক দুর্ভোগে পড়েছেন।
গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পাঞ্চলের অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসচালিত বয়লার ও যন্ত্রপাতি পর্যাপ্ত চাপ না পাওয়ায় উৎপাদন কমে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে, এতে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে।
তীব্র গ্যাস সংকটের প্রতিবাদে গত ১৯ জুলাই সাভারের জালেশ্বর এলাকায় তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি পিএলসির আঞ্চলিক কার্যালয় ঘেরাও, বিক্ষোভ ও স্মারকলিপি প্রদান করেন শত শত আবাসিক গ্রাহক। তারা অভিযোগ করেন, প্রায় এক বছর ধরে গ্যাস সংকটে ভুগলেও গত দুই মাস ধরে অনেক এলাকায় একেবারেই গ্যাস নেই। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আরও কঠোর কর্মসূচিরও ঘোষণা দেন তারা।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির সাভার আঞ্চলিক কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহ কম থাকায় চাহিদা অনুযায়ী বিতরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। যে পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, তা সমন্বয় করেই সরবরাহের চেষ্টা করা হচ্ছে। গ্রাহকদের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তবে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের দাবি, শুধু সরবরাহ সংকটের অজুহাত নয়, অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা, দায়ীদের আইনের আওতায় আনা এবং আবাসিক এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তারা বলেন, নিয়মিত বিল দিয়েও যদি রান্না করা না যায়, তাহলে এটি শুধু সেবার সংকট নয়, বরং সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার শামিল।

