মাত্র ১০ টাকায় চিকিৎসক দেখানোর সুযোগ এবং বিনা মূল্যে ওষুধ পাওয়ার খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রাজধানীর মিরপুর ১৩ নম্বরের সরকারি ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। আগে প্রতিদিন যেখানে ১৫০ থেকে ২০০ জন রোগী চিকিৎসা নিতেন, এখন সেই সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে।
এতে বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মীদের। দূরদূরান্ত থেকে আসা অনেক রোগী চিকিৎসা না পেয়েই ফিরে যাচ্ছেন, আবার থেরাপির সিরিয়াল পেতেও দীর্ঘ অপেক্ষার মুখে পড়তে হচ্ছে।
চাঁদপুরের ৫৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর দীর্ঘদিন ধরে পায়ের ব্যথায় ভুগছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিওতে তিনি জানতে পারেন, মিরপুরের সরকারি ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে মাত্র ১০ টাকায় চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। সেখানে বিভিন্ন ধরনের থেরাপির ব্যবস্থাও রয়েছে। সেই খবরের সূত্র ধরেই তিনি চাঁদপুর থেকে ঢাকায় আসেন।
সিরিয়াল নিয়ে চিকিৎসক দেখানোর পর জাহাঙ্গীরকে জানানো হয়, বর্তমানে রোগীর চাপ অনেক বেশি। তাই নতুন করে থেরাপির সিরিয়াল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাকে বেশ কিছু ওষুধ লিখে দেওয়া হয় এবং থেরাপির জন্য দুই মাস পর মুঠোফোনে যোগাযোগ করতে বলা হয়।
এতে ক্ষুব্ধ হন জাহাঙ্গীর। ১১ আগস্ট সকালে হাসপাতালের ফটকের কাছে কথা বলার সময় তিনি বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, ‘সকাল ছয়টার সময় আইছি। আইয়া ১০ টাকা দিয়ে টোকেন লইছি। দশটা বাজছে ডাক্তার দেখাইতে। ডাক্তার কয়, এহন আর থেরাপি নাই। লোক সব ভর্তি হয়ে গেছে। আঠারো শ টাকার ওষুধ লেখে দিছে। এডি এত টাকা দিয়া কেনা লাগলে ৫০০ টাকা ভাড়া দিয়া এত দূর আইলাম কেন?’
গত মাসের শেষ দিকে ‘লাইফ স্টোরি’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে সরকারি ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালটি নিয়ে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। ভিডিওটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।মাত্র ১০ টাকায় চিকিৎসক দেখানোর সুযোগ এবং বিনা মূল্যে ওষুধ পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা হঠাৎ করে বেড়ে যায়।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ফেসবুকে প্রচারিত ভিডিও দেখে যেমন মানুষ আসছেন, তেমনি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও চিকিৎসার আশায় রোগীরা ছুটে আসছেন। রোগীর এই বাড়তি চাপ সামলানো হাসপাতালের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবাইকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আবার অনেক রোগী ধারণা করেছিলেন, হাসপাতালে চিকিৎসার পাশাপাশি সব ওষুধও বিনা মূল্যে দেওয়া হবে। বাস্তবে অধিকাংশ ওষুধ তাদের নিজেদেরই কিনতে হচ্ছে।
হাসপাতালটিতে ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক—দুই শাখা মিলিয়ে ৪৫ জন শিক্ষক ও চিকিৎসক কর্মরত রয়েছেন। হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক সোহরাব হোসেন বলেন, হঠাৎ করে রোগীর সংখ্যা এত বেড়ে যাওয়ায় সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, বহির্বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া এবং রোগী ভর্তি রাখার পাশাপাশি হাসপাতালে আকুপাংচার, হিজামা, পঞ্চকর্ম ও ইয়োগার মতো সেবাও দেওয়া হয়। আকুপাংচার চিকিৎসা নিতে হলে বহির্বিভাগে আগাম সিরিয়াল নিতে হয়। রোগীর চাপ এত বেড়েছে যে সেই সিরিয়াল এখন আগামী বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে।
সোমবার সকালে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, চিকিৎসক দেখানোর জন্য রোগীদের দীর্ঘ সারি। টিকিটের লাইন ভবনের বাইরে পর্যন্ত চলে গেছে। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও দেখে আসা মানুষের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও অনেকে চিকিৎসা নিতে এসেছেন।
নোয়াখালী থেকে ৪০ বছর বয়সী মাহমুদা খাতুনও চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসেছেন। তিনি জানান, ফেসবুকে ভিডিও দেখেই তিনি এখানে এসেছেন। তবে হাসপাতালে এতটা ভিড় হবে, তা তিনি বুঝতে পারেননি। যেহেতু এত দূর থেকে এসেছেন, তাই কষ্ট হলেও চিকিৎসক দেখিয়েই ফিরতে চান তিনি।
শুধু চিকিৎসক দেখানোতেই নয়, থেরাপি নিতে গিয়েও রোগীদের অতিরিক্ত খরচ করতে হচ্ছে। সরকারি সরঞ্জামের স্বল্পতার কারণে আকুপাংচারের জন্য প্রয়োজনীয় নিডল বা সুচ এবং জীবাণুনাশক রোগীদের নিজেদেরই কিনতে হচ্ছে। এতে প্রায় এক হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। এর সঙ্গে বেশির ভাগ ওষুধও বাইরে থেকে কিনতে হওয়ায় চিকিৎসার মোট ব্যয় আরও বাড়ছে।
ইন্টার্ন চিকিৎসক মুতাসিম বিল্লাহ বলেন, ‘অনেক রোগী এসে ঘুরে যাচ্ছেন। বলছেন, আমরা নাকি হয়রানি করছি। তারা কেউ বুঝছেন না, আমাদের ধারণক্ষমতা কম, লোকবল কম। আমরা তো ভিডিওটি করিনি, ফেসবুকে দেইনি।’
হাসপাতালের এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সেখানে কর্মরত শিক্ষক ও চিকিৎসকদের ২৫ মাস ধরে বেতন-ভাতা বন্ধ রয়েছে। এরপরও তারা এতদিন দায়িত্ব পালন করে গেছেন। বর্তমানে রোগীর সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় কাজের চাপও বহুগুণ বেড়েছে। নিয়মিত কর্মঘণ্টার বাইরেও তাদের সেবা দিতে হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে শিক্ষক-চিকিৎসকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।

