বিটিআরসিতে গণশুনানি

দুর্বল নেটওয়ার্ক, কলড্রপ, ধীরগতির ইন্টারনেট নিয়ে গ্রাহকদের বিক্ষোভ

মোবাইল ফোন অপারেটরদের বিরুদ্ধে প্রায় ৬৭ হাজার অভিযোগ

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২৬, ০৪:২৯

মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠলেও সেবার মান নিয়ে গ্রাহকের অসন্তোষ কাটছে না। নেটওয়ার্ক দুর্বলতা, ধীরগতির ইন্টারনেট ও কলড্রপের পাশাপাশি গ্রাহকের অজান্তে বিভিন্ন ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস (ভ্যাস) চালু করে টাকা কেটে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। গত সাড়ে পাঁচ বছরে (জানুয়ারি ২০২১ থেকে জুন ২০২৬) দেশের চার মোবাইল অপারেটরের বিরুদ্ধে এসব বিষয়ে ৬৬ হাজার ৭০৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে (বিটিআরসি)।

গ্রাহকের অভিযোগ ও মতামত জানতে গতকাল বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিটিআরসি ভবনে সপ্তম গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কলরেট, ডাটা প্যাকেজ, ডাটার মেয়াদ, ডাটা ক্যারি ফরওয়ার্ড, নেটওয়ার্ক কাভারেজ, সিম নিবন্ধন, এনইআইআর ও সেবার মান নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। গ্রাহকের অধিকার সুরক্ষা ও সেবার মান উন্নয়নে এসব অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছে কমিশন। বিটিআরসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত চার অপারেটরের বিরুদ্ধে জমা পড়া অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রবির বিরুদ্ধে ২৪ হাজার ৮৭৪টি। এরপর রয়েছে গ্রামীণ ফোন (২১ হাজার ৫২৬টি), টেলিটক (১১ হাজার ৫৯৪টি) এবং বাংলালিংক (৮ হাজার ৭১১টি)। অভিযোগের বড় অংশই সেবার মান, ইন্টারনেটের গতি এবং ভ্যাস-সংক্রান্ত। এর বাইরে মোবাইল নম্বর পরিবর্তন (এমএনপি), রিচার্জ ও বিলিং, সিম নিবন্ধন, ট্যারিফ ও কলরেট, সিমের মালিকানা, লাইসেন্স, মোবাইল ব্যাংকিং, প্রতারণা এবং কুইজ বা পুরস্কার নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন গ্রাহকরা।

এবারের গণশুনানিতে অংশ নিতে ২ হাজার ৯৯০ জন নিবন্ধন করেন। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৭২ জন নারী, ১ হাজার ৪৭ জন পেশাজীবী এবং ৬৩৮ জন শিক্ষার্থী। প্রাপ্ত অভিযোগের মধ্যে সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগ-সংক্রান্ত ছিল ১ হাজার ৪৫টি, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশন্স বিভাগ নিয়ে ৮৪৪টি, স্পেকট্রাম নিয়ে ৬৩টি, লিগ্যাল অ্যান্ড লাইসেন্সিং নিয়ে ১৯টি এবং এনফোর্সমেন্ট অ্যান্ড ইন্সপেকশন নিয়ে পাঁচটি।

জামালপুরের রাকীব রায়হান কলরেট কমানোর বিষয়ে জানতে চাইলে বিটিআরসির সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের মহাপরিচালক জানান, বর্তমানে ভয়েস কলের ট্যারিফ সর্বনিম্ন ৪৫ পয়সা এবং সর্বোচ্চ দুই টাকা। তবে গ্রাহকের চাপ কমাতে ফ্লোর প্রাইস কমানোর কাজ চলছে। ডাটা ক্যারি ফরওয়ার্ড ও ৫জি সেবার গতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ফুয়াদ হাসান খান। বিটিআরসি জানায়, সম্প্র্রতি পরিচালিত ড্রাইভটেস্টে কোনো অপারেটরের সেবার মান নির্ধারিত সীমার নিচে পাওয়া যায়নি। আগামী মাস থেকে প্রতি মাসে সেবার মানের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। বিদ্যুত্ চলে গেলে কলড্রপ বাড়ে কি না এবং ডাটা প্যাকেজ নিয়ে গ্রাহকের বিভ্রান্তির বিষয়ে জানতে চান আনোয়ার সাদাত। বিটিআরসি জানায়, প্রতিটি প্যাকেজের সুবিধা ও শর্ত পরিষ্কারভাবে জানানোর নিয়ম রয়েছে। সেবার ওপর নজরদারি বাড়াতে ‘সক্ষমতা প্ল্যাটফরম’ও চালু করা হয়েছে।

বিটিআরসির হেল্পলাইন ও ওয়েবসাইটে পাওয়া প্রায় ১৩ হাজার অভিযোগের মধ্যে ১১ হাজার ২৭৯টির (৮৬.৭ শতাংশ) নিষ্পত্তি হয়েছে। তবে এ হারকে যথেষ্ট মনে করছে না কমিশন। গত বছরের গণশুনানিতে পাওয়া ১ হাজার ৭৫৬টি অভিযোগের মধ্যে বিটিআরসি-সংশ্লিষ্ট ২২১টি অভিযোগ আলাদা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। চলতি বছর সরাসরি ১১টি প্রশ্নসহ মোট ২ হাজার ২৯০টি প্রতিক্রিয়া পেয়েছে কমিশন, যা আগের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ১ হাজার ২৩৪টিরও বেশি প্রতিক্রিয়া ছিল মোবাইল সেবা নিয়ে।

এসএমএস মাস্কিং ও আন্তর্জাতিক ওটিপি নিয়ে গাজীপুরের তৌহিদ হাসানের প্রশ্নের জবাবে বিটিআরসি জানায়, অ্যাপ্লিকেশন-টু-পার্সন (এ২পি) বার্তায় মাস্কিং করা হয় এবং ভবিষ্যতে সব ধরনের এসএমএসকে এর আওতায় আনার কাজ চলছে। আন্তর্জাতিক ওটিপির ক্ষেত্রে আর্থিক ও কারিগরি দুই ধরনের জটিলতা রয়েছে। বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিভাগের কমিশনার মাহমুদ হোসেন জানান, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১ (সংশোধিত ২০২৬)-এর ৮৭ ধারা অনুযায়ী প্রতি চার মাসে অন্তত একবার গণশুনানি করতে হবে। শুনানিতে ওঠা প্রশ্ন ও সুপারিশ আলাদা তালিকায় রেখে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে।

ইত্তেফাক/এএম