ডারউইনে যে দরজা খুলেছে, ম্যাকাইয়ে বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে তার ওপাশে আরও বড় এক ইতিহাসের সামনে। আগামীকাল ভোর ৬টায় গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায় শুরু হতে যাওয়া দ্বিতীয় টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে পারলেই দুই ম্যাচের সিরিজ ২-০ ব্যবধানে জিতে যাবে বাংলাদেশ। আর সেই জয়ের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার ঘরের মাঠে ফিরে আসবে ১৮৮৭ সালের একমাত্র দুই টেস্টের ধবলধোলাইয়ের স্মৃতি।
সেবার ইংল্যান্ড দুই টেস্টের অ্যাশেজ সিরিজ ২-০ ব্যবধানে জিতেছিল। এরপর অস্ট্রেলিয়ার ঘরের মাঠে আর কোনো দুই বা ততোধিক টেস্টের সিরিজে প্রতিপক্ষ তাদের পুরোপুরি মুছে দিতে পারেনি। এই জায়গাতেই ম্যাকাই টেস্টের মাহাত্ম্য। বাংলাদেশ জিতলে ১৮৮৭ সালের পর প্রথম দল হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার ঘরের মাঠে দুই টেস্টের সিরিজে ধবলধোলাই করবে। ক্রিকেটের ১৩৯ বছরের একটি অপেক্ষার অবসান ঘটবে বাংলাদেশের হাতে।
দুই বছর আগে পাকিস্তানের মাটিতে বাংলাদেশ কী করতে পারে, সেটিও হয়তো অনেকের কল্পনার বাইরে ছিল। ২০২৪ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান সফরে গিয়ে প্রথম টেস্টেই ১০ উইকেটের জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। এরপর দ্বিতীয় টেস্টে ৬ উইকেটের জয়। দুই ম্যাচের সিরিজ ২-০ ব্যবধানে জিতে ইতিহাস গড়েছিল নাজমুল হোসেন শান্তর দল। সেটি ছিল পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয় এবং পাকিস্তানের মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সিরিজ জয়। সেই ঘটনার দুই বছর পর আবার আগস্ট। আবারও বাংলাদেশ এমন একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে। এবার প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া।
ডারউইনের প্রথম টেস্টে বাংলাদেশ যে জয় পেয়েছে, সেটি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের প্রথম টেস্ট জয়। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে নেমেই এমন সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ। ২০০৩ সালের পর এটাই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সফর। এই অস্ট্রেলিয়াই আবার এখন বিশ্বের ১ নম্বর টেস্ট দল।
ম্যাকাইয়ে নামার আগে বাংলাদেশের শিবিরে স্বস্তির খবর। অনুশীলন সূত্র অনুযায়ী, মুশফিকুর রহিমের চোট গুরুতর নয়। দলের অনুশীলনে তাসকিন আহমেদের একটি শর্ট বল অতিরিক্ত বাউন্স করে তার আঙুলে আঘাত করে। ব্যথায় নেটে বসে পড়েছিলেন তিনি। পরে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে আবার ব্যাটিংয়ে ফেরেন। ম্যাচের দুই দিন আগে এমন ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি করেছিল। তবে অনুশীলন শেষে দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মুশফিক ফিট আছেন এবং দ্বিতীয় টেস্টে তার খেলা নিয়ে আপাতত কোনো শঙ্কা নেই।
মুশফিকের সুস্থ থাকা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ডারউইনে প্রথম টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের ব্যাটিং ইউনিট যে দৃঢ়তা দেখিয়েছে, ম্যাকাইয়ের চ্যালেঞ্জেও অভিজ্ঞ এই ব্যাটারের উপস্থিতি সেই ধারাবাহিকতার জন্য বড় ভরসা। সিরিজ এখন বাংলাদেশের হাতে। তাই একাদশে বড় কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন না পড়াই দলের জন্য স্বস্তির।
অন্যদিকে তানজিদ হাসানকে নিয়ে কিছুটা সতর্ক বাংলাদেশ টিম ম্যানেজমেন্ট। ম্যাকাইয়ের অনুশীলনে দলের সঙ্গে ওয়ার্মআপ ও ফিল্ডিং করেছেন তিনি। কিন্তু ব্যাটিং অনুশীলনে নামেননি। নেটের এক পাশে প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশারের সঙ্গে দাঁড়িয়ে পুরো অনুশীলন দেখেছেন। দলের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ঘাড়ের আড়ষ্টতার কারণে গতকাল তাকে ব্যাটিং থেকে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে। টেস্ট শুরুর আগে আরও এক দিন সময় থাকায় আপাতত বড় কোনো শঙ্কা দেখছে না টিম ম্যানেজমেন্ট। আশা করা হচ্ছে, আজকের অনুশীলনেই তিনি পুরোপুরি ফিরতে পারবেন। তানজিদের সুস্থ হয়ে ফেরা বাংলাদেশের জন্য বিশেষ স্বস্তির হবে। ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট শতক এসেছিল তার ব্যাট থেকেই। মাত্র দ্বিতীয় টেস্টে ১০১ রানের ইনিংস খেলে তিনি ম্যাচের গতিপথ বদলে দিয়েছিলেন। সেই আত্মবিশ্বাস নিয়েই এখন ম্যাকাইয়ের চ্যালেঞ্জ।
অনুশীলনে নজর কেড়েছেন শরীফুল ইসলামও। দীর্ঘ সময় বোলিং করেছেন এই বাঁহাতি পেসার। তাকে আলাদাভাবে পরামর্শ দিতে দেখা গেছে প্রধান কোচ ফিল সিমন্সকে। ডারউইনে বাংলাদেশের পেস আক্রমণ অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংকে যে চাপে ফেলেছিল, সেই সাফল্যের পর শরীফুলের প্রস্তুতি বাড়তি আগ্রহ তৈরি করাই স্বাভাবিক। ডারউইন টেস্টে তিনি খেলেননি। দ্বিতীয় টেস্টে তার ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
বাংলাদেশের সামনে এখন এক ম্যাচে দুই অর্জনের হাতছানি। প্রথমটি সিরিজ জয়। দ্বিতীয়টি ১৩৯ বছরের ইতিহাস বদলে দেওয়া। ডারউইনে বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে জেতা আর অসম্ভব কোনো শব্দ নয়। এবার ম্যাকাইয়ে প্রশ্নটা আরও বড়। উত্তরটা মিলবে মাঠেই। তবে ডারউইনের পর বাংলাদেশ আর শুধু অঘটনের আশায় থাকা দল নয়। তারা এখন ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে ইতিহাস লেখার সুযোগ পাওয়া একটি দল।

