ক্রিকেটারদের চোট নিয়ে কঠোর বিসিবি, মেডিক্যাল বিভাগের কার্যক্রমে আর কোনো আপস নয়

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১৬:৫৬

গতকাল মিরপুর শের-ই বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে বিসিবির মেডিক্যাল বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সরকার মাহবুব আহমেদ শামীম জানিয়েছেন, ক্রিকেটারদের চোট ব্যবস্থাপনা নিয়ে তারা আর কোনো ধরনের আপস করবেন না। 

সম্প্রতি লিটন কুমার দাসের চোট নিয়ে তৈরি হওয়া নানামুখী আলোচনা ও সমালোচনার জবাবে আত্মপক্ষ সমর্থন করে তিনি দাবি করেন, দেশে করানো লিটনের স্ক্যান রিপোর্টে কোনো ভুল ছিল না। আঘাত পাওয়ার দুই দিন পর করা প্রথম স্ক্যান এবং চৌদ্দ দিন পর করা দ্বিতীয় স্ক্যানে চোটের চিত্র সঠিকভাবে এসেছিল এবং তাতে স্পষ্টভাবেই 'গ্রেড ওয়ান ইনজুরি' ধরা পড়েছিল।

কিন্তু নির্বাচক, দলীয় ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন পর্যায় থেকে আসা অনুরোধের কারণে অতীতে নিয়ম ভেঙে সময়সীমার আগেই খেলোয়াড়দের মাঠে নামার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। নিজেদের এই ভুলের কথা স্বীকার করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. শামীম জানান, চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্ধারিত প্রটোকল লঙ্ঘন করে আগে যেসব আপস করা হয়েছিল, ভবিষ্যতে তার পুনরাবৃত্তি আর ঘটবে না এবং মেডিক্যাল বিভাগের সুস্পষ্ট অনুমতি ছাড়া কোনো ক্রিকেটার মাঠে ফিরতে পারবেন না। নিজের দীর্ঘ চিকিৎসা জীবনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি জোর দিয়ে বলেন, একজন খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ার এবং দেশের স্বার্থ রক্ষায় শতভাগ সুস্থতা নিশ্চিত করে মাঠে নামা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।

এই নীতিগত কঠোরতার পটভূমিতে রয়েছে লিটন দাসের সাম্প্রতিক চোট-ধাঁধা। গত ১৪ জুন কাফ মাসলে আঘাত পাওয়ার পর জিম্বাবুয়ে সফরে পাঠানো হলেও ব্যথার কারণে তিনি খেলতে পারেননি এবং বিসিবির প্রায় ২৫ লাখ টাকা খরচে সিঙ্গাপুর নিয়ে স্ক্যান করানোর পর তার পায়ে ফোলা ধরা পড়ে। ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের স্ক্যানের মান নিয়ে সংশয় এবং প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশারের মেডিক্যাল ক্লিয়ারেন্সের ওপর নির্ভর করার বক্তব্যের পর বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল মেডিক্যাল বিভাগকে কড়া বার্তা দেন এবং একজন পরিচালকের নেতৃত্বে তদন্তের নির্দেশ দেন।

লিটনের পাশাপাশি নাহিদ রানা, মোস্তাফিজুর রহমান, শরীফুল ইসলাম এবং তানজিম হাসান সাকিবও বর্তমানে চোটের তালিকায় থাকায় মেডিক্যাল বিভাগ তাদের চোট প্রটোকলে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি বিভাগটিকে পুরোপুরি ঢেলে সাজানোর বিশাল পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

বর্তমান সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে বিসিবির মেডিক্যাল বিভাগকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা এবং সর্বাধুনিক সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মাত্র দুজন চিকিৎসক নিয়ে চলা এই বিভাগে জরুরি চিকিৎসা বা সাধারণ পরীক্ষানিরীক্ষার সুযোগ নেই, এমনকি ম্যাচ ও অফিশিয়াল অনুশীলন ছাড়া অন্য দিনগুলোতে অ্যাম্বুলেন্স সুবিধাও মেলে না। পাশাপাশি চোট পাওয়া ক্রিকেটারদের সাহায্য করার জন্য কোনো আন্তর্জাতিক মানের পুনর্বাসন সেন্টার নেই। আঞ্চলিক ভেন্যুগুলোতে চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য সমস্যায় ক্রিকেটারদের ঢাকায় ছুটে আসতে হয়।

এসব চাহিদা মেটাতে একাডেমি ভবনে বরাদ্দ পাওয়া প্রায় ৩ হাজার বর্গফুট জায়গায় অত্যাধুনিক মেডিক্যাল ইউনিট গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে বিসিবি। গতকাল মেডিক্যাল কমিটির সভা শেষে ডা. শামীম জানান যে শর্ট-টার্ম ও লং-টার্ম পরিকল্পনার অধীনে চিকিৎসক সংখ্যা বাড়ানো, জরুরি ভিত্তিতে একটি নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স কেনা এবং ধাপে ধাপে ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল ইউনিট, ওপিডি, অবজারভেশন বে ও বিশ্বমানের পুনর্বাসন ইউনিট স্থাপন করা হবে। মানের দিক থেকে কোনো ছাড় না দিয়ে বিভাগটিকে সম্পূর্ণ অত্যাধুনিক রূপ দেওয়া হবে।

বিসিবির এই মহাপরিকল্পনায় যুক্ত করা হয়েছে আঞ্চলিক সম্প্রসারণ ও স্পোর্টস মেডিসিনের বিষদ পরিধি। দেশের পাঁচটি প্রধান ভেন্যুতে আঞ্চলিকভাবে একজন করে চিকিৎসক, ফিজিও এবং ট্রেনার নিয়োগ দেওয়ার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে, যাতে প্রাথমিক চিকিৎসায় ক্রিকেটারদের ঢাকায় আসতে না হয়। ডা. শামীম আশাবাদ ব্যক্ত করে জানান, স্পোর্টস মেডিসিন সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারলে ক্রিকেটের পাশাপাশি বাংলাদেশের ফুটবলসহ অন্যান্য সব খেলাধুলার অ্যাথলেটরা ব্যাপকভাবে উপকৃত হবেন।

ইত্তেফাক/জেডএইচ