ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ক্রমবর্ধমান হামলার মধ্যে সৌদি আরবকে রক্ষায় ‘যেকোনো পর্যায়ে’ যেতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির সামরিক মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী বলেছেন, সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি পাকিস্তানের অঙ্গীকার ‘নিঃশর্ত’।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) আরব নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনসের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক আহমেদ শরিফ চৌধুরী এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান কূটনৈতিক ও শারীরিক দুইভাবেই সৌদি আরবের পাশে রয়েছে। এখানে আমি শারীরিকভাবে শব্দটির ওপর জোর দিতে চাই। আমরা যেকোনো পর্যায়ে যেতে প্রস্তুত।’
আহমেদ শরিফ চৌধুরী বলেন, সৌদি আরবের পাশাপাশি মক্কা ও মদিনায় ইসলামের দুই পবিত্র স্থান রক্ষার ক্ষেত্রেও পাকিস্তানের অঙ্গীকার রয়েছে। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দেশটি প্রতিরোধ অব্যাহত রাখবে বলেও জানান তিনি।
সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর লক্ষ্য করে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান-সমর্থিত হুথি বাহিনী। বৃহস্পতিবার তায়েফে একটি প্রতিহত ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে একজন নিহত ও দুজন আহত হন। সাম্প্রতিক হামলাগুলোতে ৮০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
এ ছাড়া মক্কা শহরের নিয়ন্ত্রিত আকাশসীমার দিকে অগ্রসর হওয়া একটি হুথি ড্রোনও প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। তবে মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে হুথিরা।
অন্যদিকে, ইরাক থেকে আসা ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনের তিনটি পাম্পিং স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ ওই তেল রপ্তানি রুটটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে হয়।
পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্রের এবারের বক্তব্য গত সপ্তাহে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া অবস্থানের তুলনায় বেশি দৃঢ়। তখন মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, মক্কা চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলার জবাবে পাকিস্তানের সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে কোনো আলোচনা হচ্ছিল না। তবে প্রয়োজন হলে পাকিস্তান ব্যবস্থা নেবে বলে জানানো হয়েছিল।
গত ৭ আগস্ট পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান ও সৌদি আরব দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছিল।
তবে দুই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ কার্যকরী বিধান প্রকাশ করা হয়নি। ফলে হামলার ক্ষেত্রে ঠিক কী ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
সৌদি আরবে পাকিস্তানের এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আরব নিউজ জানিয়েছে, গত মে মাসে পাকিস্তান প্রায় ৮ হাজার সেনা, জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানের একটি স্কোয়াড্রন, ড্রোন এবং এইচকিউ-৯ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সৌদি আরবে মোতায়েন করে।
সৌদি আরব সম্প্রতি পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও মিসরসহ কয়েকটি মিত্র দেশের কাছে সহায়তা চেয়েছে। হুথিদের ধারাবাহিক হামলায় সৌদির ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সরঞ্জামের ওপর চাপ বাড়ার পর এই অনুরোধ করা হয় বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছে। তবে নতুন করে সামরিক সহায়তার বিষয়ে কোনো দেশ প্রকাশ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কি না, তা তখনও জানা যায়নি।
রিয়াদ পাকিস্তানের কাছে অতিরিক্ত সেনা, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণের অনুরোধ করেছে কি না এ প্রশ্নের জবাবে আহমেদ শরিফ চৌধুরী বিষয়টি নিশ্চিত করেননি।
পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা সৌদি আরবের জন্য প্রতিরক্ষা নিশ্চয়তার আওতায় পড়বে কি না, সে বিষয়েও তিনি স্পষ্ট কোনো মন্তব্য করেননি। ২০২৫ সালের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরের পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছিলেন, প্রয়োজন হলে সৌদি আরবকে পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা দেওয়া হতে পারে। তবে পরে রয়টার্সকে তিনি জানান, চুক্তিতে পারমাণবিক অস্ত্র ‘আলোচনায় নেই’।
এদিকে সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের অবসানে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে ইসলামাবাদ। একই সঙ্গে হুথিদের হামলা বন্ধে ইরানের প্রভাব কাজে লাগানোর জন্য তেহরানকে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে বার্তা দেওয়া হয়েছে।
বুধবার পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। তবে ওই আলোচনায় হুথিদের হামলার বিষয়টি সরাসরি উত্থাপিত হয়েছিল কি না, তা জানানো হয়নি।
পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্র বলেন, আঞ্চলিক সংকটের একটি ‘আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধান’ খুঁজতে দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য কর্মকর্তারা আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সূত্র: আরব নিউজ

