কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের তৈরি এমন এক প্রযুক্তি, যাহা মানুষের সামর্থ্যকে বহুগুণ বাড়াইয়া দিতে পারে। ইহা রোগ নির্ণয় করিতে পারে, উৎপাদন বাড়াইতে পারে, শিক্ষা ও গবেষণাকে সহজ করিতে পারে, প্রশাসনিক কাজের গতি বাড়াইতে পারে। কিন্তু একই প্রযুক্তি যদি অপরাধী, সন্ত্রাসী কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী শক্তির হাতে পড়ে, তাহা হইলে বিপদের মাত্রাও অভূতপূর্ব হইতে পারে। মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের সাম্প্রতিক সতর্কবার্তাটি এই কারণেই গুরুত্বের সহিত বিবেচনা করা প্রয়োজন। গেটস বলিয়াছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে এমন ঘটনা ঘটিতে পারে, যাহাতে ১০০ কোটি মানুষের প্রাণহানি ঘটার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হইতে পারে। সংখ্যাটি ভয়াবহ। কিন্তু সংখ্যাটিকে ভবিষ্যদ্বাণী হিসাবে গ্রহণ না করিয়া সতর্কতার একটি চরম উদাহরণ হিসাবে দেখা অধিক যুক্তিসংগত। আসল প্রশ্ন হইল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কতটা শক্তিশালী হইতে পারে এবং সেই শক্তি কার হাতে থাকিবে। গেটসের বক্তব্যের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত ‘কিল সুইচ' নহে, প্রযুক্তির অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রযুক্তির মধ্যেই নির্মাণের দাবি। কারণ, কোনো বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার পরে সেই যন্ত্র বন্ধ করিবার ব্যবস্থা থাকিলেই যে নিরাপত্তা নিশ্চিত হইবে, তাহা নহে। তখন হয়তো ক্ষতি ইতিমধ্যেই ঘটিয়া গিয়াছে। অতএব এআই ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণ, তথ্য ব্যবহারের ধরন, অস্বাভাবিক আচরণ এবং সম্ভাব্য অপব্যবহার শনাক্ত করিবার সক্ষমতা শুরু হইতেই গড়িয়া তুলিতে হইবে।
বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলির জন্যও ইহা কঠিন চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশের জন্য সমস্যাটি আরো জটিল। কারণ প্রযুক্তির উন্নয়ন যাহারা করিতেছে, নিরাপত্তার মানদণ্ড নির্ধারণের ক্ষমতাও মূলত তাহাদের হাতেই। অথচ প্রযুক্তির ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার হইতে পারে এমন দেশগুলির হাতে সেই প্রযুক্তির ওপর পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ থাকিবে না। বাংলাদেশে এআইয়ের অপব্যবহারের সম্ভাব্য ক্ষেত্র কম নহে। ব্যাংকিং ও আর্থিক ব্যবস্থায় সাইবার হামলা, পরিচয় চুরি, ভুয়া অডিও-ভিডিও তৈরি, প্রতারণা, তথ্য চুরি, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় আক্রমণ এবং বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটানোর মতো ঝুঁকি ক্রমেই বাড়িতে পারে। বিশেষত দক্ষ প্রযুক্তিবিদ ও অপরাধী চক্রের মধ্যে প্রযুক্তিগত ব্যবধান কমিয়া আসিলে ছোট একটি গোষ্ঠীও এমন ক্ষতি করিতে পারে, যাহা অতীতে বৃহৎ সংগঠন ছাড়া সম্ভব ছিল না। এইখানে আরেকটি বিপদ রহিয়াছে। উন্নয়নশীল দেশ সাধারণত নূতন প্রযুক্তির ভোক্তা হয়, নির্মাতা নহে। ফলে বিদেশি এআই ব্যবস্থার উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হইলে তথ্যের নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং জাতীয় অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ লইয়াও প্রশ্ন উঠিবে। আমরা যদি প্রযুক্তি ব্যবহার করি, কিন্তু তাহার ঝুঁকি বুঝিবার মতো নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি না করি, তাহা হইলে ভবিষ্যতে নির্ভরশীলতার নূতন একটি স্তর তৈরি হইতে পারে।
সুতরাং আমাদের এখনই কয়েকটি বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, এআই ব্যবহারের জন্য সুস্পষ্ট জাতীয় নিরাপত্তা ও নৈতিক কাঠামো প্রণয়ন করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, ব্যাংক, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, স্বাস্থ্য ও সরকারি তথ্যভান্ডারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় এআই-নির্ভর সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়িয়া তুলিবার উদ্যোগ গ্রহণ আবশ্যক। তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে এআই নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং অ্যালগরিদমিক ঝুঁকি বিষয়ে গবেষণা বাড়াইতে হইবে। সবচাইতে বড় কথা, এআইকে কেবল উন্নয়নের হাতিয়ার হিসাবে দেখিলে চলিবে না। ইহা ক্ষমতারও একটি নূতন অবকাঠামো। সেই ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্ব, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতাও প্রয়োজন।
মানুষের তৈরি বুদ্ধিমত্তা যদি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলিয়া যায়, তাহা হইলে বিপদ প্রযুক্তির মধ্যে যতটা, মানুষের অসতর্কতার মধ্যেও ততটাই। অতএব এখনই লাগাম টানিবার অর্থ প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা থামানো নহে। অর্থ হইল, প্রযুক্তি যত দ্রুত এগোবে; নিরাপত্তা, আইন, গবেষণা ও মানবিক নিয়ন্ত্রণকেও তত দ্রুত আগাইয়া লইতে হইবে। এই প্রস্তুতিতে দেরি করিবার সুযোগ বাংলাদেশের মতো দেশের আরো কম।
