আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তোড়জোড়ের মধ্যে নির্বাচন কমিশন বিধিমালায় সংশোধন এনেছে। অনেকগুলো সংশোধনীর মধ্যে নজর কেড়েছে জামানতসংক্রান্ত দুইটি সংশোধনী । দেশে কমবেশি ৪ হাজার ৫৮৮টি ইউনিয়ন পরিষদ আছে। প্রত্যেক ইউনিয়নের সাধারণ ওয়ার্ডসংখ্যা ৯টি করে মোট ৪১ হাজার ২৯২টি এবং নারীদের সংরক্ষিত ওয়ার্ড সংখ্যা ১৩ হাজার ৭৬৪টি। চেয়ারম্যান ও সাধারণ সদস্য আসনে প্রতিটি পদের বিপরীতে গড়ে পাঁচ জন প্রার্থী এবং নারী আসনে তিন জন করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে মোট প্রার্থী সংখ্যা পৌনে ৩ লাখের কাছাকাছি হয়ে যাবে। অরাজনৈতিকভাবে ভোট হওয়ায় অনেক সহজ সরল সাধারণ নিরীহ মানুষও প্রার্থী হতে পারেন। সেসব বিবেচনায় প্রার্থীসংখ্যা আরো বাড়লেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না ।
প্রতিটি নির্বাচনেই প্রার্থীকে একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ জামানত হিসেবে জমা দিতে হয়। এমনও না যে, সরকার ঐ জামানতের টাকা নির্বাচনের ব্যয় হিসাবে খরচ করছে। জামানতটি সম্পূর্ণই প্রতীকী। একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের ভোট পেলে প্রার্থী জামানত ফেরত পান, অন্যথায় বাজেয়াপ্ত হয় । এই জামানতের পরিমাণ খুব বেশি ছিল না। তবে এর সঙ্গে জড়িত ছিল প্রার্থীর ‘ইজ্জত কা সওয়াল'। ২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আইনের ১৩ ধারায় জামানতের পরিমাণ চেয়ারম্যান প্রার্থীদের জন্য ৫ হাজার টাকা ও সদস্য প্রার্থীদের জন্য ১ হাজার টাকা ধার্য ছিল। তার আগে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনসমূহে জামানত ছিল যথাক্রমে ৩ হাজার টাকা ও ৫০০ টাকা। ২০১৬ পরবর্তী নির্বাচনে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান প্রার্থীগণ দলীয় প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন বিধায় সঙ্গত কারণে তখন প্রার্থীসংখ্যা কম থেকেছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমিত হওয়ায় জামানতের পরিমাণ বৃদ্ধি সর্বসাধারণের জন্য পীড়াদায়ক হয়ে ওঠেনি ।
২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান সীমিত গণতন্ত্রের স্থলে উন্মুক্ত গণতন্ত্রে উত্তরণের আকাঙ্ক্ষার ফসল। ফলে মানুষের ভেতরে রাজনীতির প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। সেই আগ্রহ থেকেই অনেক বেশিসংখ্যক মানুষ আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের ভাবনাচিন্তা করছে । কিন্তু নির্বাচন কমিশন সাধারণ মানুষের এইসব প্রস্তুতির ওপর ঠান্ডা জল ঢেলে দিল । সংশোধিত বিধিমালায় কমিশন জামানতের পরিমাণ পাঁচ গুণ বাড়িয়ে চেয়ারম্যান পদে ২৫ হাজার টাকা ও সদস্য পদে ৫ হাজার টাকা করেছে। সম্ভাব্য প্রায় ৩ লাখ প্রার্থীর ভেতর অন্তত ১০ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় হাজার তিরিশেক প্রার্থী নির্ধন হওয়া স্বাভাবিক। চর এলাকায় বসবাসকারী অনেকেরই সামর্থ্য হবে না বর্ধিত জামানত দাখিলের। যারা গ্রাম ত্যাগ করে চলে গেছেন শহরে, তারা গ্রামে আসবেন নির্বাচন করতে । কমিশন সুকৌশলে গ্রামীণ স্থানীয় শাসনে শহুরে সাহেবদের নেতৃত্ব দানের একচেটিয়া সুযোগ করে দিল। সংশোধনীতে নির্বাচন ব্যয়ের সীমা দ্বিগুণ করে চেয়ারম্যান পদে ১০ লাখ টাকা ও সদস্য পদে ২ লাখ করলেও স্থানীয় নির্বাচনে অনেক প্রার্থীই কোনো টাকা খরচ না করেই ভোটারদের ভালোবাসার ভোটে জিতে যান। যেমনটি ছিলেন একদা সিলেট সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মরহুম ছইফুর রহমান। নির্বাচন কমিশন জামানতের পরিমাণ বাড়িয়ে হয়ত কমাতে পারবে প্রার্থিতা, কিন্তু সেই সঙ্গে কমিশন বাধাগ্রস্ত করল নির্বাচনে অংশগ্রহণে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ততা। এতে কালক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমাদের নির্বাচনি উৎসব, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ। ভবিষ্যতের ছইফুর রহমানদের কাছে প্রার্থিতা হয়ে যাবে দূর আকাশের চাঁদ । একদিকে দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচনের মাধ্যমে অনেক প্রার্থী হওয়ার সুযোগ তৈরি আর অন্যদিকে জামানত বৃদ্ধি পরস্পর সাংঘর্ষিক বইকি!
একই সংশোধনীতে নির্বাচন কমিশন জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার কাটমার্ক বাড়িয়েছে । আমাদের সামাজিক জীবনে একদা ১৬ সংখ্যাটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ষোলো আনায় টাকা হতো, ষোলো ছটাকে সের। সেসব লুপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চাঁদের ষোলকলা পূর্ণ হওয়ার মানেও আমরা ভুলে গেছি । আমরা এখন দশমিক যুগের মানুষ। যতই দশমিকের যুগে প্রবেশ করি না কেন, তবুও ষোলআনা সুখের জীবন খুঁজি, কারো ব্যর্থ জীবনকে বলি ষোলআনাই মিছে। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি বাঁটোয়ারা করতেও ষোল আনা ধরেই হিসাব কষি। আমাদের জীবনে এক আনা, দুই আনা, সিকি-আধুলির প্রভাব ছিল খুব বেশি। তাই হয়তো ভারতবর্ষে ভোট শুরু হওয়ার পরে হতেই ‘দুই আনা’ ভোট না পেলে তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হতো, করা হতো জামানত বাতিল। দুই আনার ভোট হিসাব করার সহজ পদ্ধতি ছিল মোট ভোটকে ৮ দিয়ে ভাগ করা আর ৮-এর নামতা মুখস্থ না থাকলে মোট ভোটের অর্ধেক, তার অর্ধেকের অর্ধেক। এমনি হিসাব বরাবর। কেউ একবার জামানত হারালে তা শুধু তার নিজের নয়, বংশের ওপরও এঁকে দেয় লজ্জার তিলক চিহ্ন । বাকি জীবনভর শুনতে হয় জামানত হারিয়েছে। সেই লজ্জাকর তিলক চিহ্নের পরিসর বড় করা খুবই কি দরকার ছিল? এখন দশমিকের যুগ, দুই আনা বা ৮ ভাগের ১ ভাগ মানে ১২.৫ শতাংশ, ইদানীংকালের অনেক সাহেবসুবোর কাছে এই ভাগের অঙ্ক বড় জটিল। জটিলই যদি, তাহলে নাহয় ১০ শতাংশ করত কিংবা ২০ শতাংশ । তা না করে জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার কাটমার্ক করা হলো ১৫ শতাংশ। কেউ এখন নামতা পড়েন না, হিসাব করেন ক্যালকুলেটরে, তা সে হতে পারে মোবাইল ফোনেও। তাহলে এই কাটমার্ক বাড়ানোর যুক্তিটা কী? যদি ৮-এর নামতা পড়তে অসুবিধাই হয়, তাহলে কার্টমার্ক ১০ শতাংশ করলে সহজেই নিরুপণ করা যেত। প্রদত্ত ভোটের এককের অংকের আগে দশমিক বসালেই বেরিয়ে যেত কাটমার্ক । এখন সেটা ১৫ শতাংশ করায় নামতা না জানা লোককে আবারও ক্যালকুলেটর টিপতে হবে আর সেই অবকাশে জামানত হারানো প্রার্থীর সংখ্যা একটু হলেও বেড়ে যাবে । ১২.৫ থেকে ১৫ না করে ২০ করলেও ভাবা যেত একপঞ্চমাংশকে কাটমার্ক করা হয়েছে । ১৫ করায় কী এমন মহাভারত উদ্ধার হবে? রাষ্ট্রের কি বিশাল লাভ হবে? নাকি দাদার হাতে কলম ছিল ছুড়ে মেরেছে, সেটা পনেরো ছুঁয়েছে? জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়া যখন কেবলই মর্যাদার প্রশ্ন, সেখানে কাটমার্ক বাড়ানোর কোনোই কারণ থাকতে পারে না । এটা শুধুই অধিকসংখ্যক মানুষকে বেইজ্জতি করার কৌশল মাত্র। স্থানীয় শাসনের নির্বাচনকে সর্বজনীন রূপ দিতে প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ ও জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার কাটমার্ক আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনা গণতন্ত্রের জন্যই মঙ্গলকর হবে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব
