যুদ্ধের আঁচ, সমাজে অস্থিরতা

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৩০

সমগ্র বিশ্বই যেন আজ যুদ্ধের আগুনে উত্তপ্ত। এক প্রান্তে সংঘাত তো, অন্য প্রান্তে ঘনীভূত রাজনৈতিক অস্থিরতা; কোথাও জ্বালানিসংকট, কোথাও মূল্যস্ফীতি, কোথাও আবার কর্মসংস্থানের সংকোচনের অভিঘাতে পৃথিবী যেন এক অদৃশ্য অস্থিরতার বলয়ে আবদ্ধ হইয়া পড়িয়াছে। বিশ্বায়নের এই যুগে পৃথিবীর এক প্রান্তে সংঘাতের দামামা বাজিলে তাহার অভিঘাত আর সেই ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না। খাদ্য, জ্বালানি, বাণিজ্য, পরিবহন ও অর্থ—বাজারের মাধ্যমে তাহা হুহু করিয়া বহু দূরের দেশেও পৌঁছাইয়া যায়। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গিয়াছে, সংঘাত ও অস্থিতিশীলতায় আক্রান্ত অর্থনীতিগুলিতে মাথাপিছু আয়, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্যের পরিস্থিতি অন্য উন্নয়নশীল অর্থনীতির তুলনায় দ্রুত অবনতি ঘটিয়া থাকে।

বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক অভিঘাতের বাহিরে নহে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে এমন সকল ঘটনা ঘটিতে দেখা যাইতেছে, যাহা একটি সুস্থ ও শৃঙ্খলিত সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের। থানার ভিতরে সংঘর্ষ, আসামি ছিনাইয়া লওয়ার চেষ্টা, হাসপাতাল-ক্লিনিকে হামলা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট, রাস্তাঘাটে নিরাপত্তাহীনতা, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য প্রভৃতি সকল কিছু মিলাইয়া জনমনে নিরাপত্তাহীনতার বোধ ক্রমশ বাড়িতেছে। এইরূপ পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পেশাদারিত্বের সহিত দায়িত্ব পালন করিলেও সমাজের চলমান অস্থিরতাকে দীর্ঘ মেয়াদে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয় না। বর্তমানে আমরা কি ইহাই প্রত্যক্ষ করিতেছি না?

এই অস্থিরতার পিছনে বৈশ্বিক যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক অভিঘাত যে বড় ভূমিকা রাখিতেছে, তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। ইউক্রেন যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলিতে বিঘ্ন সৃষ্টি হইবার ফলে বিশ্ববাজারে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য ও সরবরাহের উপর চাপ সৃষ্টি হইয়াছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও একই কথা বলিতেছে; তাহাদের দাবি হইল, যুদ্ধজনিত জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি বিশেষ করিয়া নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশসমূহকে অধিকতর ঝুঁকির মধ্যে ফেলিতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে, মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য, দুর্বল বিনিয়োগ ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অভিঘাত মোকাবিলাই এখন অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্লেষকরাও বারবার সতর্ক করিয়া যাইছেন যে, অর্থনৈতিক চাপ দীর্ঘস্থায়ী হইলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়া যাইবে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হইবে, পারিবারিক চাপ বৃদ্ধি পাইবে। তবে সবচাইতে বড় অভিঘাত হইল, এই সকল প্রবণতার ফলে ‘সামাজিক ধৈর্য’ ক্ষয় হইয়া যাইতে পারে; তুচ্ছ ঘটনাও রূপ লইতে পারে বড় সংঘাতের। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রয়োজন এমন একটি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যেইখানে অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার, স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান ও সামাজিক সম্পৃক্ততা এবং নাগরিকদের আস্থার পরিবেশ একসঙ্গে নিশ্চিত হয়।

উন্নত দেশসমূহ এই ধরনের পরিস্থিতিতে কেবল আইন প্রয়োগ করিয়াই বসিয়া থাকে না, বরং সংকটের অভিঘাত হইতে নাগরিকদের রক্ষা করাকেও তাহারা রাষ্ট্রের দায়িত্ব মনে করে। সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাকে টিকাইয়া রাখা, জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহের বিকল্পব্যবস্থা তৈরি প্রভৃতি নানাবিধ সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করিয়া তাহারা সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখিবার চেষ্টা করেন। বিশ্বব্যাংকের পরামর্শও ইহাই। অর্থাৎ, এই অস্থিরতা কীভাবে শেষ হইবে—এই প্রশ্নের উত্তর একদিনে মিলিবে না! কারণ, বৈশ্বিক যুদ্ধবিগ্রহ থামিলে ও তাহার অর্থনৈতিক ও সামাজিক রেশ দীর্ঘদিন থাকিতে পারে। আর ইহার জন্য কৃচ্ছ্রসাধনের পাশাপাশি প্রয়োজন বিচক্ষণ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। সর্বোপরি ধৈর্য ধারনের কোনো বিকল্প নাই।

অতএব, সংকট যত গভীরই হউক, মানুষের মনে যদি নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও ভবিষ্যতের আশা ফিরাইয়া দেওয়া যায়, তাহা হইলে অস্থিরতার এই সময়ও অতিক্রম করা সম্ভব। কেবল পুলিশ বাড়াইয়া কিংবা অভিযান পরিচালনা করিয়া একটি অস্থির সমাজকে দীর্ঘ মেয়াদে স্থিতিশীল রাখা যায় না। বরং ইহার জন্য প্রয়োজন এমন একটি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যেইখানে নাগরিকদের আস্থার পরিবেশ নিশ্চিত হয়। মনে রাখিতে হইবে, একটি ভয়ভীতিমুক্ত সমাজ কেবল অর্থনীতিকে সচলই রাখে না, ইহা মানুষের বিবেককেও শান্ত রাখে। আজিকার পৃথিবীতে সেই শান্ত বিবেকেরই যেন অধিক প্রয়োজন।

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন