স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটাল যোগাযোগের আসল লক্ষ্য কি রোগী পাওয়া, নাকি আস্থা তৈরি করা?

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৫

আজ একজন মানুষ যখন কোনো স্বাস্থ্যতথ্য জানতে চান, তখন তার প্রথম গন্তব্য অনেক সময় হাসপাতালের কাউন্টার নয়, তার হাতের মোবাইল ফোন। একটি সার্চ, একটি ভিডিও, একটি ওয়েবসাইট, একজন চিকিৎসকের পরিচিতি কিংবা একটি স্বাস্থ্যবিষয়ক পোস্ট—এসবের মধ্য দিয়েই হাসপাতালের সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় তৈরি হতে পারে। তাই আমার দৃষ্টিতে, স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটাল যোগাযোগ এখন শুধু প্রচারের মাধ্যম নয়; এটি রোগীর সঙ্গে একটি সম্পর্কের প্রথম দরজা।

প্রশ্ন হলো, এই যোগাযোগের মূল লক্ষ্য কী? শুধু রোগী পাওয়া, নাকি আস্থা তৈরি করা?

আমার কাছে দুটিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান যখন মানুষের প্রয়োজন বুঝে সঠিক তথ্য দেয়, সহজ ভাষায় স্বাস্থ্যবিষয়ক বিষয় ব্যাখ্যা করে এবং প্রয়োজনের সময়ে সঠিক জায়গায় পৌঁছাতে সাহায্য করে, তখন সেই যোগাযোগ থেকেই আস্থা তৈরি হয়। আর আস্থা তৈরি হলে একজন মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সেই প্রতিষ্ঠানের সেবা সম্পর্কে আগ্রহী হন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও কার্যকর স্বাস্থ্য যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্যতা, সহজ ভাষা, প্রাসঙ্গিকতা, সময়োপযোগিতা এবং মানুষের করণীয় স্পষ্ট করার ওপর গুরুত্ব দেয়।

স্বাস্থ্যসেবার ডিজিটাল যোগাযোগের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—এটি মানুষের কাছে তার প্রয়োজনের মুহূর্তে পৌঁছাতে পারে। কেউ হয়তো উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে জানতে চাইছেন, কেউ সন্তানকে নিয়ে উদ্বিগ্ন, কেউ কোনো পরীক্ষার অর্থ বুঝতে চাইছেন, আবার কেউ একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের বিষয়ে জানতে চাইছেন। প্রত্যেকের প্রয়োজন আলাদা। তাই সবার জন্য একই ধরনের বার্তা তৈরি করলেই ভালো যোগাযোগ হয় না।

আমার অভিজ্ঞতায়, ভালো ডিজিটাল যোগাযোগ শুরু হয় একটি সহজ প্রশ্ন দিয়ে—মানুষটি এখন কী জানতে চাইছেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারলে কনটেন্টও বদলে যায়। তখন শুধু “আমাদের সেবা আছে” বলা হয় না; বরং বলা হয়, “আপনার প্রয়োজন হলে কীভাবে সঠিক তথ্য পাবেন”, “কোন লক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত”, “কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন” কিংবা “চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলার আগে কী তথ্য প্রস্তুত রাখতে পারেন”।

এখানেই ডিজিটাল যোগাযোগের সঙ্গে ব্র্যান্ডের সম্পর্ক তৈরি হয়।

একটি ব্র্যান্ড শুধু লোগো, রঙ বা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তৈরি হয় না। প্রতিটি যোগাযোগের অভিজ্ঞতা ব্র্যান্ডকে তৈরি করে। একজন মানুষ যখন কোনো হাসপাতালের ওয়েবসাইটে গিয়ে সহজে তথ্য পান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর পান, চিকিৎসকের তথ্য সহজে খুঁজে পান কিংবা প্রয়োজনীয় নির্দেশনা সময়মতো পান—তখন তার মনে প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি হয়।

এই ধারণাই ধীরে ধীরে আস্থায় পরিণত হতে পারে।

তবে স্বাস্থ্যসেবায় আস্থা তৈরি করার জন্য শুধু সুন্দর উপস্থাপন যথেষ্ট নয়। তথ্য হতে হবে সঠিক, ভাষা হতে হবে সহজ এবং বক্তব্য হতে হবে দায়িত্বশীল। স্বাস্থ্যতথ্যের পরিমাণ যত বাড়ছে, মানুষকে সঠিক তথ্য বেছে নেওয়ার সক্ষমতাও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্য-সাক্ষরতার ক্ষেত্রে তথ্য খুঁজে পাওয়া, বোঝা, মূল্যায়ন করা এবং ব্যবহার করার সক্ষমতাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে।

তাই আমি মনে করি, একটি হাসপাতালের ডিজিটাল কনটেন্টের সাফল্য শুধু কতজন দেখেছেন, কতজন ক্লিক করেছেন বা কতজন যোগাযোগ করেছেন—এগুলো দিয়ে পুরোপুরি বোঝা যায় না। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই যোগাযোগ মানুষের জন্য কতটা অর্থবহ ছিল।

একটি পোস্ট হয়তো হাজার হাজার মানুষ দেখলেন। কিন্তু যদি সেই পোস্ট একজন মানুষকে তার স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন করে, একজন পরিবারকে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে উৎসাহিত করে অথবা কাউকে সঠিক স্বাস্থ্যতথ্য খুঁজে নিতে সাহায্য করে—তাহলে তার মূল্য শুধু সংখ্যায় মাপা যায় না।

অবশ্যই ডিজিটাল যোগাযোগের সঙ্গে ব্যবসায়িক ফলাফলও গুরুত্বপূর্ণ। একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের জন্য রোগীর কাছে পৌঁছানো, সেবা সম্পর্কে জানানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা গ্রহণের সুযোগ তৈরি করা স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর সম্পর্ক তৈরি হয় তখনই, যখন ব্যবসায়িক লক্ষ্য এবং মানুষের প্রয়োজন একে অপরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

আমার কাছে এখানেই Digital, Brand এবং PR একসঙ্গে কাজ করে।

Digital মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করে। Brand সেই অভিজ্ঞতার একটি ধারাবাহিক পরিচয় তৈরি করে। আর PR মানুষের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করে। তিনটি আলাদা কাজ মনে হলেও, মানুষের কাছে এগুলো আলাদা নয়। তার কাছে সবকিছু মিলেই একটি প্রতিষ্ঠান।

আগামী দিনে স্বাস্থ্যসেবার ডিজিটাল যোগাযোগ আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক হবে। মানুষ শুধু তথ্য দেখতে চাইবে না; নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রাসঙ্গিক তথ্য পেতে চাইবে। প্রযুক্তি সেই সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, মানুষের প্রয়োজন বোঝা, সহজ ভাষায় কথা বলা এবং বিশ্বাসযোগ্য তথ্য দেওয়া—এই মৌলিক বিষয়গুলোই গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। WHO-র ডিজিটাল স্বাস্থ্য কৌশলেও মানুষকে কেন্দ্র করে, আস্থাভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তাই আমার কাছে স্বাস্থ্যসেবার ডিজিটাল যোগাযোগের প্রশ্নটি “রোগী পাওয়া নাকি আস্থা তৈরি করা”—এভাবে দেখার প্রয়োজন নেই। বরং সঠিক যোগাযোগের মাধ্যমে মানুষের প্রয়োজন বোঝা, তাকে উপকারী তথ্য দেওয়া, একটি ভালো অভিজ্ঞতা তৈরি করা এবং সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আস্থা তৈরি করাই হলো দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।

কারণ একজন মানুষ হয়তো আজ একটি স্বাস্থ্যতথ্যের জন্য আপনার কাছে এসেছেন। কিন্তু আপনি যদি তাকে সঠিক তথ্য, সহজ যোগাযোগ এবং একটি ইতিবাচক অভিজ্ঞতা দিতে পারেন, তাহলে সেই যোগাযোগ আজকের প্রয়োজনের বাইরে গিয়ে আগামী দিনের সম্পর্কও তৈরি করতে পারে।

স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটাল যোগাযোগের সবচেয়ে বড় সাফল্য তাই শুধু মানুষকে কাছে আনা নয়; মানুষকে এমন একটি অভিজ্ঞতা দেওয়া, যাতে সে মনে করে—এই প্রতিষ্ঠান আমার প্রয়োজন বোঝে, আমাকে গুরুত্ব দেয় এবং আমার পাশে আছে।

লেখক: হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর, এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রাম

ইত্তেফাক/এনএন