বেড়া যখন খেত খায়

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩০

মাদকাসক্তি ও মানসিক রোগ আমাদের সমাজের এমন দুই সংকট, যাহা পরিবারকে বিপর্যস্ত করে, ব্যক্তির জীবনকে বিপন্ন করে এবং সমাজের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করে। এই সংকট মোকাবিলায় মাদকাসক্তি ও মানসিক পুনর্বাসনকেন্দ্রগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাদকাসক্ত ও মানসিক রোগী লইয়া পরিবার যখন অসহায় হইয়া পড়ে, তখন মাদকাসক্তি ও মানসিক পুনর্বাসনকেন্দ্রগুলিই শেষ আশ্রয়স্থল বলিয়া বিবেচিত হয়; কিন্তু সেই আশ্রয়স্থলই যদি ভয়, নির্যাতন ও সমস্যার অগ্নিতে ঘি প্রদানের স্থানে পরিণত হয়, তাহা হইলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হইবে-তাহা বলাই বাহুল্য। মোহাম্মদপুরে এক মানসিক রোগীকে হাতকড়া পরাইয়া জোরপূর্বক বাসা হইতে তুলিয়া লইবার ঘটনায় একটি রিহ্যাব সেন্টারের দুই কর্মী আটক হইবার ঘটনা সেই ভয়াবহ বাস্তবতারই একটি সতর্ক সংকেত।

কোনো অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসার জন্য কোথাও নেওয়া এবং একজন মানুষকে অপরাধীর মতো হাতকড়া পরাইয়া জোর করিয়া আটক করা এক বিষয় নহে। রোগী উত্তেজিত বা আক্রমণাত্মক হইলেও তাহাকে সামাল দেওয়ার জন্য প্রশিক্ষিত জনবল, চিকিৎসাবিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি এবং প্রয়োজনীয় আইনগত কাঠামো থাকা আবশ্যক। বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মী নিজের সিদ্ধান্তে হাতকড়া ব্যবহার করিতে পারেন না। অথচ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হইতে কিছু ক্ষেত্রে হাতকড়া ব্যবহারের কথা স্বীকার করা হইয়াছে। ইহা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নহে, রোগীর অধিকার ও মানবিক মর্যাদা সম্পর্কে ভয়াবহ অবহেলার ইঙ্গিত। তবে সমস্যার গভীরতা আরো বিস্তৃত। অনেক রিহ্যাব সেন্টারে অভিজ্ঞ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট এবং প্রশিক্ষিত কাউন্সেলরের পর্যাপ্ত উপস্থিতি নাই। রোগীর আচরণ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেওয়া হয় অনভিজ্ঞ কেয়ারটেকারদের হাতে। ফলে চিকিৎসার পরিবর্তে শাস্তি, কাউন্সেলিংয়ের পরিবর্তে ভয় দেখানো এবং থেরাপির পরিবর্তে শারীরিক নিয়ন্ত্রণের পথ বাছিয়া লওয়া হয়। একজন মাদকাসক্ত মানুষ সম্পূর্ণত অপরাধী নহে, তাহার চিকিৎসা ও পুনর্বাসন প্রয়োজন। মানসিক রোগীও তাহার অসুস্থতার জন্য অপরাধী নহেন। এই মৌলিক সত্যটি রিহ্যাব ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন।

আরো উদ্বেগের বিষয় হইল, কোথাও কোথাও পুনর্বাসনের নামে রোগীকে দীর্ঘদিন জোরপূর্বক আটকাইয়া রাখা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা এবং পরিবারের নিকট হইতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রহিয়াছে। চিকিৎসার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির পরিবর্তে কেবল আবদ্ধ রাখাকে যদি চিকিৎসা মনে করা হয়, তাহা হইলে রোগী সাময়িকভাবে মাদক হইতে দূরে থাকিলেও সুস্থ জীবনে ফিরিবার প্রয়োজনীয় মানসিক সক্ষমতা অর্জন করিবেন না। ফলে রিল্যাপসের ঝুঁকি থাকিয়াই যায়। পুনর্বাসনের অর্থ কেবল মাদক হইতে দূরে রাখা নহে। ইহার অর্থ রোগীকে এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাহাতে তিনি সমাজ ও পরিবারের মধ্যে নিরাপদে ফিরিয়া যাইতে পারেন। এই অবস্থায় রিহ্যাব সেন্টারগুলির জন্য কঠোর লাইসেন্সিং, নিয়মিত পরিদর্শন এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা জরুরি। প্রতিটি কেন্দ্রে কতজন চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী ও প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর আছেন, কী ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়, রোগীকে কীভাবে ভর্তি ও ছাড়পত্র দেওয়া হয়, অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা কী-এই সকল তথ্য নিয়মিতভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। রোগীকে শারীরিকভাবে নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আইনগত সীমা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্ধারিত প্রোটোকলও স্পষ্ট করিতে হইবে। একই সঙ্গে রোগীর অধিকার রক্ষার জন্য স্বাধীন অভিযোগ ব্যবস্থাও থাকা দরকার। পরিবারের সদস্যদের অর্থের বিনিময়ে রোগী সমর্পণ করিয়া নিশ্চিন্ত হইয়া বসিয়া থাকিলে চলিবে না। রাষ্ট্রকেও কেবল লাইসেন্স দেওয়ার দায়িত্ব পালন করিয়া থামিয়া গেলে চলিবে না। নিয়মিত নজরদারি, আকস্মিক পরিদর্শন এবং অনিয়মের ক্ষেত্রে দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করিতে হইবে।

রিহ্যাব সেন্টার চিকিৎসাকেন্দ্র, কারাগার নহে। প্রতিষ্ঠান মানুষকে অন্ধকার হইতে আলোর দিকে ফিরাইবার দায়িত্ব লইয়াছে, তাহাদের নিজেদের আচরণেই যদি অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়-তাহা হইলে তাহা সমূহ বিপদের। রোগীকে রক্ষা করিবার যেই বেড়া, সেই বেড়াই যদি খেত খাইতে শুরু করে, তাহা হইলে প্রথম কাজ হইল বেড়াটিকেই পরীক্ষা করা। পুনর্বাসনব্যবস্থার সংস্কার এখন সেই জরুরি কাজগুলির একটি।

ইত্তেফাক/এএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন