গণতন্ত্রের পথে বাধা অসহিষ্ণুতা

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৫৯

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা কঠিন এবং তাহার চাইতেও কঠিন গণতন্ত্রকে টিকাইয়া রাখা। কারণ, গণতন্ত্র কেবল ভোটের অধিকার নহে। ইহা অন্যের মতকে সম্মান করিবার শিক্ষা দেয়। ভিন্নমত সহ্য করিবার এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকিবার মন-মানসিকতা তৈরি করে। তবে দুঃখজনক সত্য হইল, আমরা গণতন্ত্র চাহি বটে; কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য শর্তগুলি মানিতে কতটা প্রস্তুত, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজিয়া দেখি না। বিভিন্ন উন্নয়নশীল সমাজের দিকে তাকাইলে দেখা যাইবে, সেইখানে গণতন্ত্র প্রত্যাশিত মাত্রায় বিকশিত না হইবার অন্যতম কারণ হইল, পারস্পরিক সহনশীলতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধার অভাব। অনেকে তুচ্ছ কারণেই আইন নিজের হাতে তুলিয়া লইতে দ্বিধা করে না। কখনো ব্যক্তিগত বিরোধে, কখনো রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে, কখনো- বা কেবল ভিন্নমত প্রকাশের কারণে একশ্রেণির মানুষ সংঘবদ্ধ হইয়া অন্যের উপর চড়াও হয়। সেই সকল সমাজে যেন জনতার সংখ্যাই ন্যায়-অন্যায় নির্ধারণের মাপকাঠি হইয়া উঠে। অথচ রাষ্ট্র পরিচালিত হয় আইন দ্বারা, জনতার খেয়ালখুশি দ্বারা নহে। আইন ভাঙিয়া ক্ষমতার দাপট দেখাইলেই পার পাওয়া যায়—এমন ধারণা কি যে কোনো সমাজের জন্যই বিপজ্জনক নহে? রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা থাকিতে পারে; কিন্তু ‘জনতা’ বিচার করিবার দায়িত্ব হাতে তুলিয়া লইবে কেন? গণতন্ত্রের কথা নাই-বা বলি, ইহা কি কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় হইতে পারে?

বিভিন্ন উন্নয়শীল সমাজে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের প্রশ্নে উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ করা যাইতেছে। ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারীদের বাসাবাড়ি কিংবা কার্যালয়ে সংঘবদ্ধ হামলা, দলবদ্ধভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রতিপক্ষের কণ্ঠ রুদ্ধ করিবার চেষ্টা চলিতেছে। এই প্রবণতা যদি স্বাভাবিক হইয়া দাঁড়ায়, তাহা হইলে গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হইতে বাধ্য। রাজনৈতিক বিরোধিতা কোনো অপরাধ নহে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকিলে তদন্ত হইবে, আদালতে তাহার বিচার হইবে; কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়কে অপরাধের অজুহাত বানাইয়া কাহারও নিরাপত্তা কাড়িয়া লওয়া কতটা সমীচীন? আইনের সুরক্ষা দুর্বল হইলে একদিন সেই ঝুঁকি যে কাহারো উপর আসিয়া পড়িতে পারে—আমরা এই ভবিতব্য কতটা আমলে লইতেছি?

গণতন্ত্র হইল ‘স্টেট অব মাইন্ড' এবং সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন একটি শালীন সমাজ। মার্কিন আইনজীবী ও সাবেক ফেডারেল বিচারক চার্লস পিকারিংয়ের বক্তব্যেও এই ধারণার প্রতিফলন রহিয়াছে। তাহার মতে, ‘সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন এমন একটি সমাজ, যেইখানে মানুষ পরস্পরের প্রতি সম্মানশীল, উদার ও সহনশীল থাকিবে।' কথাটি সহজ বটে; কিন্তু ইহার তাৎপর্য বেশ গভীর। যেই সমাজে ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসাবে দেখা হয়, সেইখানে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়িয়া উঠিবে কী করিয়া? যেই সমাজে যুক্তির পরিবর্তে পেশিশক্তি, আলোচনার পরিবর্তে হুমকি-ধমকি এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে ‘সংঘবদ্ধ জনতার চাপ' প্রভাব বিস্তার করে, সেইখানে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা বারংবার বাধাগ্রস্ত হইবে—ইহাই স্বাভাবিক।

অর্থাৎ, গণতন্ত্রের সংকট কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংকট নহে; ইহা নাগরিক মানসিকতারও সংকট। এই কারণে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে সহনশীলতার সংস্কৃতি থাকা প্রয়োজন। যাহারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন এবং যাহারা ভিন্ন দল বা মতের অনুসারী উভয়কেই এই বাস্তবতা বুঝিতে হইবে যে, প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করা গণতন্ত্রের লক্ষ্য নহে। বরং মতপার্থক্য সত্ত্বেও সহাবস্থান নিশ্চিত করিতে হইবে—ইহাই গণতান্ত্রিক রাজনীতির সৌন্দর্য। ইহার পাশাপাশি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করিতে হইবে। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় যাহাই হউক না কেন, তাহাকে আইনের আওতায় আনিতেই হইবে। অন্যথায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি কেবল বিস্তৃতই হইতে থাকিবে। যেই সমাজে মানুষ নিজের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের অধিকার কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে আতঙ্কিত থাকে, সেই সমাজে গণতন্ত্রের বিকাশ বাধাগ্রস্ত না হওয়াটাই অস্বাভাবিক।

অতএব, রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা আদর্শের ভিন্নতা থাকিবে, বিতর্ক ও সমালোচনাও থাকিবে : কিন্তু কোনো মতের ভিন্নতা যেন সংঘাতের কারণ না হয়, কোনো বিরোধ যেন আইন নিজের হাতে তুলিয়া লওয়ার উপলক্ষ্যে পরিণত না হয়, সেই দিকে খেয়াল রাখা অতীব জরুরি। মনে রাখিতে হইবে, গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের মত প্রতিষ্ঠাই নহে; বরং ভিন্নমতের অধিকার ও মর্যাদা সুরক্ষিত রাখিবার মধ্যেও নিহিত। এই সত্য উপলব্ধি করিতে না পারিলে গণতন্ত্রের কথা যতই বলা হউক, তাহার বিকাশ অধরাই থাকিয়া যাইবে।

ইত্তেফাক/এনএন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন