প্রকৃতিতে শীতের আমেজ শুরু হতেই রং-বেরঙয়ের অতিথি পাখির কলতানে মুখরিত হয় চলনবিল। বিলের মাছ খেতে মওসুম জুড়েই আগমন ঘটে অসংখ্য পরিযায়ী পাখির। কিন্তু পাখিদের এমন অবাধ বিচরণে বাধা হয়ে ওঠছে স্বার্থন্বেষী পাখি শিকারিরা। খাবারের সন্ধানে উড়ে এসে শিকারির ফাঁদে ঝাঁকে ঝাঁকে আটকা পড়ছে পাখি। অথচ পাখি শিকার বন্ধে আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ করছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
পরিবেশবাদীদের দেওয়া তথ্য বলছে, বর্ষার পানি নেমে যাওয়ায় খাল-বিল, জলাশয়গুলোতে পুঁটি, খলসে, দারকে মাছের দেখা মিলছে। সেসব মাছ খাওয়ার লোভেই সাদা বক, বালিহাঁস, মাছরাঙ্গা, সারস, পানকৌরীর মতো দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির অতিথি পাখি ঝাঁকে ঝাঁকে আশ্রয় নিচ্ছে চলনবিলে। দিগন্তজোড়া উন্মুক্ত হাওয়ায় পাখা মেলে উড়াউড়ি করছে এক বিল থেকে আরেক বিলে। কিন্তু শিকারিরা কলাপাতার ঘর, বিষটোপ, পড়শিসহ নানা প্রকার ফাঁদ পেতে নির্বিচারে শিকার করছেন এসব অতিথি পাখি।
শিকারির ফাঁদ
বাঁশের খুঁটি, কলা পাতা, খেজুর ডাল বেতের পাতা। এসব উপকরণ দিয়ে বিশেষ কায়দায় তৈরি করা ফাঁদ ৬ থেকে ৭ ফুট উঁচু। ফাঁদের সামনে বাঁশের মগডালে রাখা শিকারি বক। আকাশ দিয়ে বকের ঝাঁক নির্মিত ফাঁদের ওপর দিয়ে দল বেঁধে উড়ে যাওয়ার সময় শিকারি তার শিকারি বকটিকে নাচাতে থাকেন। এক পর্যায়ে শিকারি বকটি ডাকাডাকি শুরু করলে উরন্ত বকের ঝাঁক বিশেষ ভাবে নির্মিত ঘরের (ফাঁদ) ওপর বসে। এসময় শিকারিরা ভেতর থেকে একে একে বকগুলোকে ধরে ধরে খাচায় ভরেন। চলনবিলাঞ্চলে এই ফাঁদের প্রচলনই বেশি।
আবার বড়শির মুখে মাছ গেঁথেও পাখি শিকার করা হচ্ছে। দেওয়া হচ্ছে বিষটোপও। এছাড়া বিলের ভেতর ধানের জমিতে আরাআরি করে পেতে রাখা নানা প্রকার জালেও পাখিরা আটকে যাচ্ছে।
স্থানীয় লোকজন বলেন, একশ্রেণির প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অন্ধকারে বন্দুক দিয়ে গুলি করেও পাখি শিকার করেন। নিজেরা খাওয়ার পাশাপাশি বস্তায় ভোরে সেসব পাখি বিক্রিও করা হয়। আবার অনেক সময় শিকারিরা পাখি শিকারের চাঁদা হিসেবে রাতের অন্ধকারে প্রভাবশালীদের বাড়িতে খাওয়ার জন্য পাখি পৌঁছে দেন। এভাবেই প্রতিদিন শিকারিরা চলনবিলের বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠে আসা পাখি নিধন চলছে।
সরেজমিন ঘুরে
সোমবার বেলা ১১টার দিকে দেখা গেল শিকারির জালে বন্দি প্রায় দুই শতাধিক কোয়েল পাখি। প্রকাশ্যে হাটে নেওয়া হচ্ছে বিক্রির জন্য। রাতের শেষ প্রহর থেকে সকাল আটটা পর্যন্ত শিকার করা হয়েছে এসব পাখি। কেউ কেউ হাট-বাজারে ফেরি করেও বিক্রি করছেন। প্রতিটি বক ১২০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা, বালিহাঁস ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং চাকলা পাখি ১৯০ টাকা জোড়া বিক্রি করছেন।
শিকারিদের ভাষ্য
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েক জন পাখি শিকারি জানান, বিভিন্ন এলাকার ফসলের মাঠে খুঁটি পুঁতে কলাপাতা, খেজুর ডাল দিয়ে বিশেষ কায়দায় তৈরি করা ফাঁদে পাখি শিকার করছেন। এছাড়া বিশেষ কায়দায় বিষটোপ দিয়েও এসব অতিথি পাখি শিকার করা হচ্ছে।
তারা বলেন, খুব ভোরে উঠে দলবেঁধে তারা পাখি শিকারের জন্য বিলের ভেতর বেরিয়ে পড়েন। ১০টি থেকে শুরু শতাধিক পাখিও শিকার করেন একেক জন শিকারি। শিকার করা এসব পাখির চাহিদা রয়েছে প্রথম শ্রেণির বিশেষ মহলের কাছেও। তাদের মধ্যে অনেকেই আবার রাতভর পাখি শিকার করে প্রকাশ্যেই বিক্রি করেন। দামও ভালো পান। তবে শিকারিদের বেশির ভাগই জানেন না পাখি শিকার করা অপরাধ।
পাখি শিকার রোধে কেবল পরিবেশবাদীরাই সচেষ্ট
পাখি শিকার রোধে চলনবিলের কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নিয়মিত কাজ করে। পাখি শিকার বন্ধে প্রচারণা থেকে শুরু করে শিকারির ফাঁদ থেকে উদ্ধার করে মুক্ত আকাশে উড়িয়ে দেন তারাই। সেসব সংগঠনের একটি চলনবিল জীব বৈচিত্র্য রক্ষা কমিটি। শনিবার ভোরে নাটোরের সিংড়ায় বক দিয়ে বক শিকারের অপরাধে তিন শিকারিকে কারাদণ্ড ও জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
অভিযানে সহায়তা করেন চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সদস্যরা। এ সময় চলনবিলের আগমুরশন, বামিহাল, কাকিয়ান ও পূর্বভেংড়ী বিল থেকে বক শিকারের কাজে ব্যবহূত অর্ধশত পোষা ও শিকার করা বকপাখি উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে ধানখেতে বিশেষভাবে তৈরি ১০টি ‘কিল্লা ঘর’ নামের ফাঁদ ধ্বংস করা হয়। পরে সিংড়া এসিল্যান্ডের উপস্থিতিতে উদ্ধারকৃত সবকয়টি পাখি মুক্ত আকাশে অবমুক্ত করা হয়।
চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম জানান, চলনবিলের ধানখেতগুলোতে ফাঁদ পেতে নিয়মিত পাখি শিকার করা হচ্ছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খবর পেয়ে প্রশাসনের সহযোগিতায় তারা পাখিগুলো উদ্ধার করে অবমুক্ত করা হয়। এ সময় স্থানীয় লোকজনের মধ্যে জীববৈচিত্র্য রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং করা হয়।
