সড়ক দুর্ঘটনা লইয়া আর কত লিখিতে হইবে?

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩০

সড়ক দুর্ঘটনা লইয়া আমরা কত সম্পাদকীয় লিখিয়াছি, কতবার সতর্ক করিয়াছি, কতবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছি, তাহার হিসাব রাখা কঠিন। প্রতিবারই দুর্ঘটনার পর তদন্ত, প্রতিকারের আশ্বাস এবং নিরাপদ সড়ক গড়িবার অঙ্গীকার উচ্চারিত হয়। কিছুদিন পর আবার কোনো সড়কে ঝরিয়া পড়ে প্রাণ, কোনো পরিবারে নামে শোকের অন্ধকার। সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় আরেকটি প্রতিবেদন, আরেকটি সম্পাদকীয়। কিন্তু মৃত্যুর মিছিল থামে না। প্রশ্ন জাগে, আমাদের এই লেখালেখি, সতর্কবাণী ও দাবি কি কেবল কাগজের পাতাতেই সীমাবদ্ধ থাকিয়া যাইবে?

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান সেই প্রশ্নকে আরো তীক্ষ্ণ করিয়া তুলিয়াছে। গত ১৩ বৎসরে সারা দেশে ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাইয়াছেন ১ লাখ ২৫ হাজার মানুষ। আহত হইয়াছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন। ইহারা কেবল পরিসংখ্যান নহেন। প্রত্যেকের সহিত জড়িত ছিল একটি পরিবার, কিছু স্বপ্ন, বাঁচিয়া থাকার আকাঙ্ক্ষা। সেই জীবনগুলির অধিকাংশই কি একটু দায়িত্বশীলতা, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং পরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রক্ষা করা সম্ভব ছিল না?

গত বৃহস্পতিবার ছিল জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবস। এইবারের ছিল প্রতিপাদ্য, 'নিরাপদ সড়ক, সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ'। নিরাপদ সড়ক ছাড়া সমৃদ্ধির এই প্রত্যয় অর্থবহ হইতে পারে না। অথচ দিবসটি পালনের আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি প্রশ্ন উঠিতেছে, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলির বাস্তবায়ন কত দূর? সরকার সড়ক নিরাপত্তা আইন, ২০২৬-এর খসড়া প্রস্তুত করিয়াছে। প্রস্তাবিত আইনে ডিমেরিট পয়েন্ট, পুনরায় আইন লঙ্ঘনে দ্বিগুণ জরিমানা এবং দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের বিনা মূল্যে জরুরি চিকিৎসার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিধানের প্রস্তাব রহিয়াছে। তবে আইন প্রণয়নই শেষ কথা নহে। আইনের প্রয়োগে শৈথিল্য থাকিলে কঠোর বিধানও কাগজে বন্দি থাকিবে।

রাজধানী ঢাকার পরিস্থিতি বিশেষভাবে ভয়াবহ। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী-২০২০ সাল হইতে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ঢাকায় ১ হাজার ৮৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হইয়াছেন ১ হাজার ৩৮৪ জন। নিহতদের ৮০ শতাংশেরও অধিক পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহী। পথচারীদের জন্য রাজধানীর সড়ক যে কতখানি বিপজ্জনক, তাহা এই পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে সড়কের দৈর্ঘ্য ২ হাজার কিলোমিটারের অধিক, অথচ ফুটপাত রহিয়াছে মাত্র ৬০০ কিলোমিটারের মতো। তাহার উপর অধিকাংশ ফুটপাতের দখল ও চলাচলের অনুপযোগিতা মানুষকে মূল সড়কে নামিতে বাধ্য করিতেছে। পথচারীর নিরাপদে চলাচলের অধিকার যেখানে নিশ্চিত হয় না, সেখানে দুর্ঘটনার দায় কেবল তাহার অসচেতনতার উপর চাপানো যায় না।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণেও সমস্যার কাঠামোগত দিকগুলি স্পষ্ট হইয়াছে। যানজটের পর সংকেত ছাড়িলে আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা, বাসের রেষারেষি, পথচারীদের জন্য পৃথক সংকেতের অভাব এবং রাতে ভারী যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াইতেছে। তাহার সহিত যুক্ত হইয়াছে ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অনুমোদনহীন চলাচল এবং লাইসেন্সবিহীন চালক। অর্থাৎ সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য যাহাদের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব, তাহাদের কার্যকারিতাও প্রশ্নের মুখে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ব্যাপকতাও উপেক্ষা করা চলে না। ২০২৫ সালে ২ হাজার ৪৯৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হইয়াছেন ২ হাজার ৯৮৩ জন। দ্রুতগতি, হেলমেট ব্যবহারে অনীহা, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং প্রশিক্ষণের ঘাটতি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। মানুষের জীবন কোনো সংখ্যা হইতে পারে না। সড়কে নিরাপদে চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে আর কবে পালিত হইবে?

ইত্তেফাক/এএম