বুক নেই ফেসবুকে

বুক নেই ফেসবুকে
হানিফ সংকেত: ছবি: ইত্তেফাক

অমর একুশের বইমেলা। আমা-দের প্রাণের মেলা, লেখক-প্রকাশক-পাঠকের মিলন মেলা। আনন্দের মেলা। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একটি বড়ো অংশ জুড়ে এই মেলা। বেড়েছে মেলার পরিসর, বেড়েছে বইয়ের সংখ্যা। বইয়ের সংখ্যা বাড়লেও সব বই যে মানসম্পন্ন তা হলফ করে বলা যাবে না। গল্প, কবিতা, উপন্যাসের বইয়ের সংখ্যাই বেশি।

আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য-শিল্প-সংস্কৃতির উপর গবেষণামূলক বইয়ের সংখ্যা যেমন কম, তেমনি শিশুসাহিত্য-রম্যসাহিত্যের বইয়ের সংখ্যাও আশানুরূপ নয়। আমাদের সংস্কৃতি আমাদের অহংকার। বইমেলায় এ সম্পর্কে কিছু বই থাকা প্রয়োজন যা যুব সমাজকে আমাদের শিকড় সম্পর্কে বেশি করে জানতে সাহায্য করবে। একটা সময় ছিল কবি-সাহিত্যিক না হলেও অনেকে ছড়া, কবিতা, ছোটো গল্প লিখতে চেষ্টা করতেন কিন্তু এখন তেমনটি দেখা যায় না। এখন অধিকাংশ তরুণ-তরুণীই বুক নয়, ব্যস্ত থাকে ফেসবুক নিয়ে। সুযোগ পেলেই টুক করে ফেসবুকে ঢুকে পড়েন। একটা সময় তরুণ সমাজকে বই পড়তে দেখা যেত। এখন বইয়ের স্থানে এসেছে ফেসবুক। অধিকাংশই ফেসবুক পড়ে।

প্রযুক্তির উন্নয়নের যুগে প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা অস্বীকার করা যাবে না। প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তিতে মুক্তির পথ খুঁজতে গিয়ে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা কিংবা ব্যবস্থা নেওয়ার অবস্থা সবার এক নয়। মানুষ নিয়ে সমাজ, সেই সমাজের মঙ্গলের জন্য যে যোগাযোগ সেটাই সামাজিক যোগাযোগ। সেই যোগাযোগের মাধ্যম হলো ফেসবুক। বুক লেখার চাইতে ফেসবুকে লেখার প্রতিই এখন আগ্রহ এদের বেশি। অনেকেই চমত্কার চমত্কার সব স্ট্যাটাস লেখেন। যা শেয়ার হতে হতে ভাইরাল হয়ে যায়। অথচ ফেসবুক চর্চা না করে এরা যদি শুধু লেখালেখির চর্চা করত এদের মাঝখান থেকে অনেক তরুণ লেখক বেরিয়ে আসত। ফেসবুকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এখন বুক অর্থাত্ বই অনুপস্থিত, আছে শুধু ফেস। অর্থাত্ ফেসবুকে এখন ফেস বা চেহারা দেখাবার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, কে কীভাবে নিজেকে প্রকাশ এবং প্রচার করতে পারে। বই নিয়ে ভাববার অবকাশ এদের খুব একটা নেই আর হবেও না। ভাবতে কষ্ট হয়, যখন দেখি এই মেলায় বসেই অনেকেই ইংরেজি অক্ষরে বাংলিশ ঢংয়ে স্ট্যাটাস বা ক্ষুদে বার্তা লিখছে। হয়তো বইমেলা নিয়েই কেউ দিচ্ছে কোনো স্ট্যাটাস।

আরো পড়ুন: বিজ্ঞান বইয়ে আগ্রহ কিশোর-তরুণদের

আমরা সবসময় একটি কথা বলে থাকি, বই কিনুন, বই পড়ুন, বই উপহার দিন। আমি দীর্ঘ দুই দশক ধরে আমার অনুষ্ঠানে এই বই উপহার দিয়ে আসছি। টেলিভিশনের অন্যান্য অনুষ্ঠানে ফ্রিজ, টেলিভিশন, ওভেন কিংবা স্মার্ট ফোন থাকে পুরস্কারের তালিকায়। আর আমাদের পুরস্কার একটিই-বই, সেটি বিজয়ী এবং পরাজিত সবার জন্যই। প্রতিটি অনুষ্ঠানেই আমরা দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলি, ‘আমাদের কাছে মহামূল্যবান পুরস্কার হচ্ছে বই, কোনো পুরস্কারই যার সমতুল্য নয়’। আশা করছি, বইমেলার পাশাপাশি এটা যেন পাঠকেরও মেলা হয়। পাঠকের মেলা হলেই প্রতিটি পাঠকের হাতে হাতে দেখা যাবে একটি করে বই আর প্রকাশকের মুখেও ফুটবে হাসি। গড়ে উঠবে পাঠাভ্যাস, ঘটবে শুদ্ধ ভাষার বিস্তৃৃতি, বন্ধ হবে ভাষার বিকৃতি, আলোকিত হবে সমাজ।

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x