ঢাকা মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২০, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
৩৩ °সে

সামনে ভয়ংকর দিন!

১০ জেলায় করোনার সংক্রমণ, আরো দুই জনের মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ৯ জন
সামনে ভয়ংকর দিন!
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে করোনা ভাইরাস পরীক্ষা করতে আসা রোগীদের অপেক্ষা। ছবিটি গতকালের —ইত্তেফাক

বাংলাদেশের সামনে আরো ভয়ংকর দিন আসছে। দেশ জুড়ে করোনার সুনামি বয়ে যেতে পারে। এখন থেকে মানুষকে ঘরে রাখা না গেলে আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকেরা। তাই মানুষকে ঘরে রাখতে কঠোর হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেছেন, স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে যেহেতু বলা হয়েছে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাই রোগ হওয়ার আগেই ব্যারিকেড দিতে হবে। এক্ষেত্রে মানুষকে ঘরে রাখতে অ্যাকশনে যাওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। এমনিতে সাধারণ মানুষ ঘর থেকে বের হয়ে আসছে, তার ওপর দেশের গার্মেন্টসগুলো খুলে দেওয়া হচ্ছে। এতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে।

১০ জেলায় সংক্রমণ :এ পর্যন্ত দেশের ১০ জেলার মানুষ করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন। জেলাগুলো হলো ঢাকা, মাদারীপুর, নারায়ণগঞ্জ, গাইবান্ধা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, কুমিল্লা, রংপুর, চুয়াডাঙ্গা ও কক্সবাজার। করোনা ভাইরাস পরীক্ষার আওতা বাড়ানোর পর এক দিনেই নতুন করে ৯ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছে, মৃত্যু হয়েছে আরো দুই জনের। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে আট জনে, আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৭০। দেশে গত ৮ মার্চ প্রথম করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ার পর এক দিনে নতুন রোগীর এটাই সর্বোচ্চ সংখ্যা। আক্রান্তদের মধ্যে আরো চার জন সুস্থ হয়ে ওঠায় এ পর্যন্ত মোট ৩০ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন :করোনা নিয়ে এখনো সচেতন নন দেশের বিভিন্ন এলাকার লোকজন। করোনা সংক্রমণের ভয় উপেক্ষা করে বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় জনসমাগম অব্যাহত রয়েছে। সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহলের মধ্যেও রাস্তার মোড়ে মোড়ে জটলা পাকাচ্ছে অনেকেই। সরকারি নিষেধাজ্ঞা না মেনে গ্রামের হাট-বাজারে চলছে কেনাকাটা। আবার হোম কোয়ারেন্টাইন না মেনে চলছে জুয়ার আসর, চায়ের আড্ডা ও গল্প। কোথাও কোথাও লকডাউন উপেক্ষা করেই চলছে গণজমায়েত। অনেক জায়গায় ত্রাণ বিতরণের কার্যক্রমে ব্যাপক জনসমাগমের ঘটনাও ঘটছে। ঘরের বাইরে আসা এসব সাধারণ মানুষকে বোঝাতে হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এছাড়া গার্মেন্টস খোলার ঘোষণার পর ঢাকামুখী হচ্ছে অসংখ্য মানুষ।

এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ জানান, অনেকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলছেন না। এর জন্য সামনে ভয়ংকর দিন অপেক্ষা করছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, ‘আমাদের জন্য সামনের দিনগুলো খুবই ভয়ানক। ইউক্রেনে সম্প্রতি আক্রান্তের সংখ্যা স্বল্প মাত্রায় দেখা দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সেদেশে শত শত কবর খোঁড়া হচ্ছে আর আমরা গার্মেন্টস খুলে দিচ্ছি। এর মাধ্যমে আরা উলটো পথে হাঁটছি। জনসাধারণের ঘরে থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, সবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। কিন্তু অনেকে মানছেন না।

বাংলাদেশের মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল বলেন, বিজ্ঞানের ভাষা অনুযায়ী দেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা সামনে বাড়বে। সম্প্রতি বিশ্বের যেসব দেশ আক্রান্ত হয়েছে, সেসব দেশে প্রথমে অল্প মানুষ সংক্রমিত হলেও পরে ব্যাপক হারে দেখা দিয়েছে। এটাই করোনা ভাইরাসের চরিত্র।

আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ও বিএমএর কার্যকরী সদস্য ডা. মোশতাক হোসেন বলেন, সামনে ভয়ংকর দিন আসছে, ঝুঁকি আছে। জরুরি প্রয়োজনে গার্মেন্টসগুলো খোলার প্রয়োজন হলে অবশ্যই তাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, অত্যাবশ্যকীয় ও জরুরি প্রয়োজনে গার্মেন্টস খোলা রাখা যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে গার্মেন্টসগুলো চালাতে হবে। আগের নিয়মে চালালে ঝুঁকি আছে বলে তিনি স্বীকার করেন।

এদিকে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও চিন্তিত। বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেছেন, এখন আর কোনো সমালোচনার দিকে তাকাব না, মানুষকে রক্ষা করতে হবে। যেভাবেই হোক জনগণকে ঘরে রাখতে হবে। তিনি বলেন, প্রাণঘাতী এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে জনসাধারণকে ঘরে রাখার কোনো বিকল্প নেই। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজির আহমেদ বলেন, সরকারের নির্দেশ উপেক্ষা করে যে হারে মানুষ ঘর থেকে বাইরে বের হচ্ছে তা মেনে নেওয়া যায় না। চলতি এপ্রিল মাস যেহেতু বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, তাই সবার ঘরে থাকতে হবে। বিষয়টি র্যাব গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।

অনলাইন ব্রিফিং :শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত অনলাইন ব্রিফিংয়ে দেশে করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশ থেকে ৫৫৩টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এরমধ্যে ৪৩৪টি পরীক্ষা করা হয়েছে। তিনি বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় আরো দুই জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের এক জন গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হয়েছিলেন। আরেক জন আগেই শনাক্ত হয়েছিলেন। এক জন ঢাকার বাইরে, এক জন ঢাকায়। এই দুই জনের মধ্যে এক জনের বয়স ৯০ বছর, আরেক জনের বয়স ৬৮ বছর। তারা দুই জনেই অসুস্থ ছিলেন। এক জনের হূদেরাগ ছিল, তার হার্ট স্ট্যান্টিং করা ছিল। আরেক জন এর আগে স্ট্রোক হয়েছিল। তিনি বলেন, নতুন শনাক্ত ৯ জনের মধ্যে আট জনকে আইইডিসিআর এবং এক জনের বিষয়ে ঢাকার বাইরের একটি গবেষণাগারের পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে ঢাকার বাইরে যিনি পজেটিভ এসেছেন তার নমুনা আবার আইইডিসিআরে পরীক্ষা করা হবে।

আরো পড়ুন: অবশষে বন্ধ থাকছে গার্মেন্টস কারখানা

আক্রান্ত ৯ জনের মধ্যে দুই জন শিশু যাদের বয়স ১০ বছরের নিচে। তিন জনের বয়স ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে, দুই জনের বয়স ৫০ থেকে ৬০, এক জনের বয়স ৬০ থেকে ৭০ এবং এক জনের বয়স ৯০ বছর। গত ২৪ ঘণ্টায় আরো চার জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন বলে জানান আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। এ নিয়ে সুস্থ হওয়া রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ৩০ জনে। বাকি ৩২ জনের মধ্যে ১২ জন বাড়িতে এবং ২০ জন হাসপাতালে চিকিত্সা নিচ্ছেন।

অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, এখন পর্যন্ত ৬৪ হাজার ৬৯৩ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে এবং ২৬০ জনকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ৪৬৯ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইন এবং ১২ জনকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আইসোলেশনে গেছেন ১৮ জন। ছাড়পত্র পেয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২৩ জন। বর্তমানে ৭২ জন হাসপাতালে চিকিত্সা নিচ্ছেন। এছাড়া করোনা ভাইরাসের ভয়ে রোগীদের সেবা দেওয়া থেকে বিরত থাকা বেসরকারি চিকিত্সকরা কাজ শুরু করেছেন বলে জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক।

কাওরান বাজারের নৈশপ্রহরী করোনায় আক্রান্ত

এক ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় শনিবার দুপুরে রংপুর সদর উপজেলার সদ্যপুস্করিণী ইউনিয়নের জানকি ধাপের হাট এলাকায় আটটি বাড়ি লকডাউন ঘোষণা করেছে স্থানীয় প্রশাসন। বিষয়টি নিশ্চিত করে সিভিল সার্জন হিরম্ব কুমার রায় বলেন, ঐ ব্যক্তির বয়স ৫০ বছর। তিনি ঢাকায় কাওরান বাজারের একটি সবজি বাজারে নৈশপ্রহরী হিসেবে ১০ বছর ধরে কাজ করেন। গত রবিবার ট্রাকে করে ঢাকা থেকে নিজ বাড়িতে আসছিলেন। এ সময় বগুড়ায় পৌঁছে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে বুধবার আইইডিসিআর থেকে তার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এতে তার শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়।

রাজশাহীতে নার্সসহ ১২ জন আইসোলেশন ওয়ার্ডে

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আলাদা ওয়ার্ডে এক জন নার্সসহ ১২ জনকে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে। এদের মধ্যে ছয় জন পুরুষ আর ছয় জন নারী। তাদের বেশির ভাগেরই অবস্থা উন্নতির দিকে। গতকাল সকালে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আজিজুল হক আজিজ।

অসুস্থতার তথ্য গোপন : ১৯ জন কোয়ারেন্টাইনে

চট্টগ্রামে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির বিদেশফেরত মেয়ে বাবার অসুস্থতার তথ্য গোপন করেছিলেন, এ কারণে একটি হাসপাতালের ১৮ জন স্বাস্থ্যকর্মী ও এক জন পুলিশ কর্মকর্তাকে ‘হোম কোয়ারেন্টাইনে’ যেতে হয়েছে। চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন সেখ ফজলে রাব্বী মিয়া গতকাল জানান, কোভিড-১৯ আক্রান্ত ঐ ব্যক্তি জেনারেল হাসপাতালের আইসোলেশনে যাওয়ার আগে বেসরকারি ন্যাশনাল হাসপাতালে চিকিত্সা নিয়েছিলেন। সতর্কতার জন্য ঐ হাসপাতালের ১৮ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে তিন জন চিকিত্সক রয়েছেন।

ইত্তেফকাক/এএএম

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
০২ জুন, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন