অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল ২০২১-২০২২ অর্থবছরের জন্য প্রণীত বাজেটকে ব্যবসাবান্ধব হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি আরো বলেছেন, বাজাটে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ইস্যুটিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের অনেকেই চলতি অর্থবছরের জন্য বাস্তবায়নাধীন বাজেটকে বাস্তবধর্মী ও সময়োপযোগী বলে আখ্যায়িত করেছেন। করোনাকালীন অবস্থায় বাজেট প্রণয়ন ছিল সত্যি কঠিন ব্যাপার। অর্থমন্ত্রী সেই কঠিন কাজটিই অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন। বাজেটে যেসব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তার বেশ কিছু অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং অর্জনযোগ্য নয়। বিশেষ করে চলতি অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ, যা গত অর্থবছরের তুলনায় ১ শতাংশ কম।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, বাংলাদেশ চলতি অর্থবছরে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে। তবে সেটা কোনোভাবেই ৫ শতাংশের বেশি হবে না। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এবারের বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ। আগের বছর এটা ছিল ৬ শতাংশ। আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী একটি দেশের বাজেট ঘাটতি মোট জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত সহনীয় বলে মনে করা হয়। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জিত না হলে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ আরো কিছুটা বেড়ে যেতে পারে। সেই অবস্থায় সরকারকে বাজেট ঘাটতি মেটানোর জন্য বর্ধিত হারে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। সরকার যদি ব্যাংক-ব্যবস্থা থেকে বর্ধিত হারে ঋণ গ্রহণ করে, তাহলে বিনিয়োগ পরিস্থিতির আরো কিছুটা অবনতি ঘটতে পারে। অর্থমন্ত্রী বাজেটকে ব্যবসাবান্ধব বাজেট বলেছেন। এর জন্য বেশ কিছু খাতে করের হার কমানো হয়েছে। তবে শুধু করের হার কামালেই দেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি হয় না। ব্যবসাবান্ধব পরিবশ সৃষ্টি করতে হলে সবার আগে ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচকে উন্নতি সাধন করতে হবে। কিন্তু ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচকে বাংলাদেশ এখনো তলানীতে পড়ে আছে।

কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (বিডা) নির্বাহী পরিচালক বলেছিলেন, ২০২১ ইজ অব ডুয়িং বিজনেসে বাংলাদেশের অবস্থান ডাবল ডিজিটে নামিয়ে আনা হবে। কিন্তু কিছুদিন আগে তিনি স্বীকার করেছেন, এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব নয়। ২০১৭ সালে ইজ অব ডুয়িং বিজনেসে আমাদের অবস্থান ছিল ১৭৭। অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়ে ২০১৯ সালে ১৬৮তে অবস্থান করে। তার অর্থ হচ্ছে, এখনো আমাদের ওপরে অবস্থান করছে ১৬৬টি দেশ। ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নত করা না গেলে কোনোভাবেই বিনিয়োগ বাড়ানো যাবে না। বাস্তবায়নাধীন বাজেটে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর অবকাশ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে কাজটি করা হয়েছে তা হলো, করপোরেট ট্যাক্স কমানো হয়েছে। ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাগণ বরাবরই করপোরেট ট্যাক্স কমানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ও তালিকাবহির্ভূত উভয় শ্রেণির কোম্পানির ক্ষেত্রে করের হার আড়াই শতাংশ করে কমানো হয়েছে। তালিকাভুক্ত কোম্পনির করের হার ২৫ শতাংশ থেকে আড়াই শতাংশ কমিয়ে সাড়ে ২২ শতাংশে নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে তালিকাবহির্ভূত কোম্পানির করের হার ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৩২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এই করের হার কমানোর ফলে মূলত দেশের বড় কোম্পানিগুলো লাভবান হবে। তারা আগের তুলনায় কম কর দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবে। তালিকাভুক্ত এবং তালিকাবহির্ভূত কোম্পানির করের হার কমানোর ফলে কী পরিমাণ রাজস্ব কম হবে, সে সম্পর্কে কোনো পরিসংখ্যান দেওয়া হয়নি।
ঢালাওভাবে করের হার কমানোর কারণে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ অনেকটাই কমে যাবে। কিন্তু কর আদায়জনিত শূন্যতা কীভাবে পূরণ করা হবে, সে সম্পর্কে কোনো দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর হারের সঙ্গে তালিকাবহির্ভূত কেম্পোনির কর হারের ব্যবধান ১০ শতাংশ। এটা আরো বাড়ানো দরকার ছিল। তালিকাভুক্ত কোম্পানির করের হার যদি আরো কমানো হতো, তাহলে শেয়ারবাজারের বাইরে থাকা কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারত। তবে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিসিএসই) সম্প্রতি এসএমই খাতের কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার অনুমতি দিয়েছে। ইতিমধ্যে এ ধরনের দুটি কোম্পানিকে শেয়ার রিলিজ করে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের জন্য অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এটি একটি ভালো উদ্যোগ হতে পারে। কারণ এত দিন যারা বড় কোম্পানি, মূলত তারাই পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারত।

এসএমই সেক্টরের ভালো ভালো কোম্পানিকে যদি পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে বাজারের অবস্থা ভালো হবে। এ ছাড়া এসএমই উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সংগ্রহের জন্য ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে না। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা এসব কোম্পানিতে তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ বিনিয়োগে লাভবান হতে পারবেন। আগামীতে এসএমই খাতের উদ্যোক্তারা তাদের প্রাথমিক পুঁজির জন্য শেয়ারবাজারে শেয়ার ছাড়তে পারবেন।
বাজেটে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কর অবকাশ-সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগে নারী উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠানের টার্নওভার যদি ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত হতো, তাহলে তাদের কোনো ট্যাক্স প্রদান করতে হতো না। চলতি অর্থবছরের বাজেটে তা ৭৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা এখন ১৬ কোটি ৯১ লাখ। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই নারী। নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রেখে কখনোই কার্যকর ও টেকসই উন্নয়ন সাধিত হতে পারে না। নারীদের অনেকের মধ্যেই উদ্যোক্তা হওয়ার প্রচণ্ড সম্ভাবনা রয়েছে। প্রয়োজন শুধু তাদের সার্বিক সহযোগিতা করা। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের মালিকানাধীন প্রকল্পের জন্য পুঁজির জোগান নিশ্চিত করতে হবে।
গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জারিকৃত এক সার্কুলারের মাধ্যমে এসএমই সেক্টরের সংজ্ঞা পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। কটেজ অ্যান্ড মাইক্রো ইন্ডাস্ট্রিজকে অঙ্গীভূত করে এসএমই সেক্টরের নতুন নামকরণ করা হয়েছে কটেজ, মাইক্রো, স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ (সিএমএসএমই)। এর ফলে যারা অতি ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের উদ্যোক্তা, তাদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ আহরণের পথ প্রশস্ত হয়েছে। আগে অতিক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের উদ্যোক্তারা ব্যাংক বা অন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের সুবিধা পেত না। তাদের এনজিও অথবা গ্রামীণ মহাজনের কাছে ধরনা দিতে হতো।
এছাড়া মন্ত্রিপরিষদের সাম্প্রতিক এক সভায় নারী উদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন ঋণদানের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। এ দুটি পদক্ষেপ অতিক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের উদ্যোক্তা, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। কিন্তু আইনি সংস্কার সাধন করা হলেও এগুলো এখনো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। নারী উদ্যোক্তাদের ব্যাংকঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা জটিলতায় পড়তে হয়। ব্যাংক নারী উদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন ঋণদানের ক্ষেত্রে মোটেও আগ্রহী নয়। তারা নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ না দিতে পারলেই যেন বর্তে যায়। ব্যাংকারদের এই নেতিবাচক মনোভাব কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। সিএমএসএমই খাতের উদ্যোক্তা, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাগণ যাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঋণ পেতে পারেন তার উদ্যোগ নিতে হবে।
করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় সিএমএসএমই খাতের বিকাশ ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। একমাত্র এই খাতের উদ্যোক্তারাই ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্যবিমোচনে ভূমিকা রাখতে পারেন।
*লেখক :অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক।

