তর্জনগর্জনেই ইরানের আত্মতৃপ্তি

তর্জনগর্জনেই ইরানের আত্মতৃপ্তি
ফাইল ছবি

বিশ্বের অন্যতম ঐতিহাসিক সভ্যতা ইরানি সভ্যতা। ফার্সি জাতিরা তুর্কি থেকে দিল্লি শত শত বছর ধরে তাদের জানান দিয়েছে। আন্দোলন সংগ্রাম যেন ইরানিদের রক্তে প্রবাহিত। ইরানিরা নিজেদের হযরত ইমাম হোসেনের বংশধর ও ‘শহিদদের জাতি’ বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করে। বিশ্বের বর্তমান অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা ও ভারসাম্য কূটনীতির এই সময়ে আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যস্ত ইরান। কেন ইরানের এই সামরিক তর্জন-গর্জন !

আড়াই হাজার বছরের পুরনো শাহ বংশের শাসনের অবসান ঘটিয়ে যে বিপ্লব আয়াতোল্লাহ খোমেনিরা এনেছিলেন, তার প্রতি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল। বিপ্লবের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইসলামি শাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন। বিপ্লবের পরপর নিজেদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে অভ্যন্তরীণ চোরাগুপ্তা হামলায় হারায় ইরান। বিপ্লবের প্রায় ৪০ বছর পর গত বছরের এই সময়ে ইরানের আরেক সূর্য সন্তান জেনারেল কাশেম সোলাইমানিও নিহত হয় বিদেশি চোরাগুপ্তা হামলায়। সম্প্রতি একই কায়দায় ইরানের পরমাণু বিজ্ঞানী ফাখরিজাদকে হারায় তেহরান। জেনারেল সোলাইমানিকে হত্যার পর ইরানের পক্ষ থেকে সামরিক মহড়া ও যে কোনও মুহূর্তে হামলা, ‘ভয়ংকর প্রতিশোধ’ নানা তর্জন গর্জন তোলা হয়েছিল। কিন্তু ইরানকে কেন্দ্র করে থাকা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের ১০ মার্কিন সামরিক ঘাঁটির ৬৫ হাজার সৈন্যের ঘুম হারাম করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনি ইরান।

কিন্তু ইরানের পক্ষে পালটা আরও কিছু কি করার আছে! ইসলামি বিপ্লবের পর দীর্ঘ আট বছর প্রতিবেশী ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। গত দুই দশক ধরে পরমাণু কর্মসূচির অভিযোগে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় পড়ে মার্কিনবিরোধী গরম বক্তৃতা দিয়ে বিশ্ব মিডিয়ায় শিরোনামে থেকেছে তেহরানের নেতারা।আফ্রিকার দেশসমূহেও যখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের জোয়ার চলছে তখনো কোণঠাসা ইরানের অর্থনীতি। মার্কিন অবরোধের মুখে তেল-গ্যাসের ন্যায্যমূল্য তুলতে পারছে না তেহরান। নিজ দেশে সামরিক ঝনঝনানির পাশাপাশি আঞ্চলিক অনেকগুলো যুদ্ধে জড়িয়ে আছে ইরান। ইরাকের শিয়া ভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও প্যারামিলিটারি বদর অর্গানাইজেশনকে অর্থায়ন করে ইরান। ইয়েমেনের হুতিবিদ্রোহী, লেবাননের হিজবুল্লাহ ও সিরিয়ার আসাদ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে অর্থ, অস্ত্র ও সৈনিক যোগান দিতে হয় ইরানকে।

ইরানে বিপ্লবের পরও তৎকালীন সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে অপ্রতিরোধ্য ও মুসলিম বিশ্বের নেতা সৌদি আরব ইরানের দিকে সম্পর্কের হাত বাড়িয়েছিল। কিন্তু ইরান বিপ্লবে ও আপসহীনতায় থাকতে চেয়েছে। এই আপসহীনতা ইরানকে ধীরে ধীরে আঞ্চলিক শত্রু বেষ্টিত ও সামরিক নির্ভর একটি দেশে পরিণত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন রাডারের বাইরে চলে যাওয়া শাসক ইরাকের সাদ্দাম হোসাইন ও লিবিয়ার মুয়াম্মর গাদ্দাফিকে শায়েস্তা করতে পেরেছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সিরিয়া ও ইরানকে কাবু করতে পারেনি। এছাড়া আর আত্মতৃপ্তি নেই ইরানের। যে ইউরোনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রকল্পের অভিযোগে ইরানের ওপর দশকের পর দশক ধরে অবরোধ সে সমৃদ্ধকরণের কোনও সফলতাও এখনো দেখল না ইরানের জনগণ। যুদ্ধ ও সামরিক এই দামামা অসহায়ত্ব বাড়াচ্ছে ইরানি জনগণেরও। ৮ কোটি জনসংখ্যা ও প্রায় ৫০০ বিলিয়ন জিডিপি অর্থনীতির ইরানের গত পাঁচ বছর ধরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি রয়েছে নিম্নমুখী। ২০১৯ সালে মুদ্রাস্ফীতি ছুঁয়েছিল ৪১ শতাংশ এ। সম্প্রতি দ্বিতীয় বড় রপ্তানি বাজার ভারতের সঙ্গে চাবাহার বন্দর নিয়ে বিরোধে গেল তেহরান। সম্প্রতি কাতার- সৌদিবিরোধ নিষ্পত্তি করে নিয়েছে। নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও ইয়েমেন যুদ্ধের সমাপ্তি ও ইরানের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। ইরানের সামনে ভারসাম্যনীতি গ্রহণের একটা সুযোগ আসছে। একটা বিষয় পরিষ্কার, জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে না পারলে বিপ্লব বা বিজয় হয়ে যাবে একটি উত্তেজনাকর অতীত গল্প।

লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, সাউথ এশিয়ান (সার্ক) বিশ্ববিদ্যালয়, নয়াদিল্লি

ইত্তেফাক/এসআর

Nogod
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত