আয়কর :সরল মানুষের সহজ প্রশ্ন

আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০১৯, ২১:৫২

২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষ হয়েছে গত জুনে। জুলাই মাসের ১ তারিখ থেকে শুরু হয়েছে নতুন অর্থবছর ২০১৯-২০। পূর্ববর্তী অর্থবছরে যাদের বার্ষিক আয় ২ লাখ ২০ হাজার টাকা বা তদূর্ধ্ব ছিল তাদেরকেই ‘আয়কর’ দিতে হবে। ঐ বছরের কর দিতে হবে বর্তমান অর্থবছরে। আগের বছরের নাম অর্থবছর (ইনকাম ইয়ার)। আর ২০১৯-২০ অর্থবছরের সরকারি নাম ‘করবছর’ (অ্যাসেসমেন্ট ইয়ার)। এই ‘অ্যাসেসমেন্ট’ কে করবে? করবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর বিভাগ। সেই হিসাবেরই কাজ চলল সারাদেশে। অনুষ্ঠিত হলো করমেলা, ঢাকায় বড়ো করে। আর দেশের বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা শহরে করমেলা হয়েছে যথাযোগ্য প্রস্তুতির মধ্যে। এই করমেলা শুরু ২০১০ সালে বর্তমান সরকারের পূর্ববর্তী মেয়াদে। যখন করমেলার আয়োজন হয় তখন অনেকেই এই মেলার ভবিষ্যত্ সম্পর্কে ছিলেন সন্দিহান। শত হোক, পকেটের টাকা কে যায় সরকারকে দিতে। কষ্টের টাকা, রোজগারের টাকা। তার ১০ শতাংশ, ২০-২৫-৩০ শতাংশ টাকা কে যায় সরকারকে দিতে। তাছাড়া সমস্যা আছে অন্যত্র। একবার সরকারের খাতায় নাম তুললে আর রেহাই নেই। সারাজীবন পোহাতে হবে এর ধকল। কোনো সময়ে বাত্সরিক আয় নির্দিষ্ট সরকারি সীমার মধ্যে না পড়লেও ‘শূন্য রিটার্ন’ জমা দিয়ে বলতে হবে—গেল বছর কোনো আয় ছিল না। শুধু আয়-ব্যয় নয়, সরকারকে প্রতিবছর জানাতে হয় কত টাকার সম্পদ ছিল। সম্পদ যদি বাড়ে তাহলে তা কীভাবে বাড়ল তার পাইপাই হিসাব দিতে হয়। আয়ের উত্স কী, তার সাক্ষ্য-প্রমাণ কী তা দাখিল করতে হয়। কর বিভাগের মনমতো না হলে তারা এর ব্যাখ্যা চাইতে পারে। এবং এই হিসাব দেওয়ার জন্য আগে তিন মাস মাফ পাওয়া যেত—সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এখন পূর্ববর্তী আয় বছরের আয়ের ওপর কর দিতে হয় পূর্ববর্তী অর্থ বছরের পাঁচ মাসের মধ্যে—তাই ৩০ নভেম্বর হচ্ছে ‘কাটঅফ’ ডেট। এই উপলক্ষ্যেই আয়কর বিভাগের সপ্তাহব্যাপী মেলা।

মেলা এখন উত্সবে রূপান্তরিত হয়েছে। মেলার সময় আমি বেইলি রোড দিয়ে যাচ্ছিলাম রমনা পার্কের দিকে হাঁটতে। দেখি একটু পরপর হাতে করমেলা-২০১৯-এর ছাপমারা ব্যাগসমেত করদাতা। এরা নতুন না পুরোনো করদাতা তা বোঝার উপায় নেই; কিন্তু ব্যাপারটি আমার কাছে অভিনব মনে হয়েছে। মানুষ আনন্দের সঙ্গে করমেলায় যাচ্ছে হাজারে হাজারে করসেবা নিচ্ছে, রিটার্ন পূরণ করছে, টাকা জমা দিচ্ছে, হিসাব করছে। ব্যাপক উত্সাহ-উদ্দীপনার মধ্যে। বেইলি রোডের অফিসার্স ক্লাবের সামনের রাস্তায় ‘ট্রাফিক জ্যাম’। গাড়ি আর গাড়ি, মোটরসাইকেল আর মোটরসাইকেল। ‘গরিবের’ বন্ধু রিকশা তো আছেই। মেলা প্রাঙ্গণে তিলধারণের জায়গা নেই। পরে দৈনিক ইত্তেফাকের এক স্টোরি থেকে জানলাম অনেক তথ্য। সাত দিন মেলার মধ্যে ছয় দিনের খবরটি ছেপেছে দৈনিক ইত্তেফাক। এতে দেখা যাচ্ছে—ছয় দিনে ৫ লাখ ৩৯ হাজার ৯১০ করদাতা তাদের ‘কর রিটার্ন’ জমা দিয়েছেন। আয়কর আদায় হয়েছে ২ হাজার ১৬ কোটি টাকা। নতুন ‘ই-টিআইএন’ নিয়েছেন ২৬ হাজার ৮৩১ জন। সব মিলিয়ে মেলায়  করসেবা নিয়েছেন ১৫ লাখ ১২ হাজার ৫৯২ জন। বলা বাহুল্য, শেষ দিন জমা হয়েছে অনেক বেশি রিটার্ন। সরকার পাবে আরো বেশি আয়কর। সরবার মধ্যেই তাড়া— যত দ্রুত রিটার্ন জমা দেওয়া যায়। কারণ ৩০ নভেম্বর শেষ তারিখ। পরে জমা দিলে জরিমানা দিতে হবে।

এই যে ঘটনা এর দ্বারা কী প্রমাণ হয়? আমার ধারণা এর দ্বারা প্রমাণ হয়, মানুষ কর দিতে চায়। কর ফাঁকি দিতে চায় না; কিন্তু তারা চায় একটা বন্ধুসুলভ অনুকূল পরিবেশ। অনেকে ‘আয়কর রিটার্ন’ পূরণ করতেই পারেন না। এমন জটিল  ফরম তা পূরণ করা একজন সাধারণ করদাতা দোকানদারের পক্ষে সম্ভব নয়। ফরম আবার অনেক ক্ষেত্রেই ইংরেজিতে। সেজন্য তাদেরকে যেতে হয় উকিলের কাছে। উকিল সাহেবরা সাধারণভাবে করদাতাদের ‘ভয়’ দেখান— দেখান দুটো পয়সা রোজগারের তাগিদে। কর বিভাগ সম্পর্কে ভীতিপ্রদ খবর দেন। সবাই তা করেন না; কিন্তু এক-দুই জন যা করেন তা বাজারে ভেসে বেড়ায়। এই পরিস্থিতিতে রাজস্ব বিভাগ যখন করমেলার আয়োজন করে তখন সাধারণ করদাতারা তা অবলোকন করেন বেশকিছু দিন। পরে তাদের ধারণা হয়, না—রাজস্ব বিভাগ সহযোগিতাই করছে। কোনো ওজর আপত্তি ছাড়াই রিটার্ন গ্রহণ করছে। তারা নতুন নতুন জিনিসও লিখছে। বৃহত্তর ময়মনসিংহের একজন করদাতা আমাকে সম্পদের হিসাব সম্পর্কে তার ধারণাটা জানালেন। তিনি বললেন, বাঙালির হিসাব সোজা। বাত্সরিক আয় ১০ হাজার টাকা। এর থেকে খরচ ৮ হাজার টাকা। অতএব ‘সম্পদ’ সৃষ্টি হলো ২ হাজার টাকার। তিনি মেলায় এসে লিখলেন যা, এভাবে হিসাব হবে না। হিসাব হবে অন্যভাবে। কত টাকার ‘সম্পদ’ বাড়ল এ বছর পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় তার হিসাব আগে। ধরা যাক, এর পরিমাণ ১০ হাজার টাকা। এর পরে হিসাব করতে হবে ‘পারিবারিক খরচের’। ধরা যাক তা ৫ হাজার টাকা। দুইয়ে মিলে হবে ‘মোট সম্পদ বৃদ্ধি’। তার মানে ‘সম্পদ বৃদ্ধি যোগ পারিবারিক খরচ’—এই দুইয়ে মিলে হবে ‘মোট সম্পদ বৃদ্ধি’ (টোটাল অ্যাক্রিশন ইন ওয়েলথ)। তার প্রশ্ন ‘খরচ’ আবার সম্পদ হয় কীভাবে? গ্রামের মানুষ, সরল মানুষ—সহজ তার প্রশ্ন। আমি তার প্রশ্ন বোঝার চেষ্টা করেছি। তার যে যুক্তি নেই, এ কথা আমি সম্পূর্ণ অস্বীকার করতে পারিনি। তারপর বললেন খরচের ‘খাত’ সম্পর্কে। বললেন, এত ‘পাইপাই’ খরচের খাত হিসাব করে কয়জন চলে? মোট ১১  প্রকার খরচের মধ্যে একটি খরচ নেই। ‘ওষুধ ও ডাক্তার’ খরচ, হাসপাতাল খরচ। বিদেশ ভ্রমণের হিসাব খাত আছে কিন্তু কক্সবাজার বেড়াতে গেলে কত খরচ তার কোনো খাত নেই। হাসতে হাসতে এসব বলে তিনি যুক্তি দেখালেন, মেলাতেই লিখলাম গড় হিসাব দিলেই চলবে। ব্যস কেল্লা ফতে। দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি। মোট খরচ মোটামুটি বলা যায়, ভেঙে ভেঙে হিসাব করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। এসব বিষয়ে আয়কর বিভাগ যথেষ্ট উদার বলে এখন মনে হয়। আমার ধারণা, এসব কারণে মানুষ এখন সাহস পাচ্ছে করমেলায় গিয়ে রিটার্ন জমা দিতে। এতে ফল হচ্ছে একটা বিপুলসংখ্যক মানুষ নতুন করদাতা হিসেবে নাম লেখাচ্ছেন। বর্তমান সরকারের এটা একটা সাফল্যই বলা যায়। তারা মানুষের করভীতি কাটাতে পারছেন, যদিও ধীরে ধীরে। রাজস্ব বিভাগ তাই ধীরে ধীরে উপজেলা স্তরেও তাদের কার্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিচ্ছে। আমার ধারণা, বর্তমান উদার ও শিথিল পরিবেশ বজায় থাকলে আয়করদাতার সংখ্যা দিন দিন বাড়বে। বর্তমানে যারা টিআইএন (ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার) নিয়ে রিটার্ন দিচ্ছেন না, তারাও ধীরে ধীরে জালে আসবেন। মানুষ আরো সাহস পাচ্ছে অন্য কারণে। আগে সরকারি, আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা করের  আওতার বাইরে ছিলেন। মন্ত্রি-মিনিস্টাররা করের বাইরে ছিলেন। এখন তারাও করের আওতায়। ঐদিন এক কর-উকিলের কাছে গিয়ে দেখলাম, একজন অতিরিক্ত সচিব কাগজপত্র দিচ্ছেন উকিলের কাছে। তিনিও সময়মতো রিটার্ন দিতে চান। সবচেয়ে বড়ো কথা রাজস্ব বিভাগের এক নম্বর কর্তা, মানে মাননীয় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাহেব একনজর স্থাপক করেছেন। তিনি প্রকাশ্যে কত টাকা কর দিয়েছেন তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা কত কর দিয়েছেন এবং তাদের সম্পদ কত তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রিটার্ন জমা দিয়েছেন। ব্যবসায়ী শিল্পপতিসহ বিভিন্ন পেশা ও জীবিকার লোকদের মধ্যে যারা শ্রেষ্ঠ করদাতা তাদেরকে সম্মাননা দেওয়া যাচ্ছে। এসব কারণে মানুষ এখন কর দিতে আগ্রহী হচ্ছে। এসব সত্যি সত্যি দেশের জন্য উত্সাহব্যঞ্জক খবর। তবে এখানে কয়েকটি মন্তব্য করা প্রয়োজন।

দেখা যাচ্ছে, যাদেরকে দেশের বড়ো বড়ো করদাতা বলে রাজস্ব বিভাগ স্বীকৃতি দিচ্ছে, সম্মাননা দিচ্ছে তাদের মধ্যে সত্যি সত্যি ধনী, অতি ধনীর স্থান নেই। সাধারণ জর্দাওয়ালা শ্রেষ্ঠ ধনীর তালিকায় আছে। এটা উত্সাহব্যঞ্জক খবর। কিন্তু শত শত কোম্পানি, যেগুলো ঢাকা ও চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত তাদের হাজার হাজার পরিচালকের নাম শীর্ষ করদাতাদের মধ্যে পাচ্ছি না আমরা। একেক জন স্বনামধন্য চিকিত্সক রাত ১২টা-১টা পর্যন্ত হাজার-দুই হাজার টাকা দরে রোগী দেখেন, তাদের নাম ঐসব তালিকায় পাচ্ছি না। একেক জন উকিল ব্যারিস্টার মানুষের কাছে শুনি, উচ্চতর আদালতে একটা শুনানিতে ওঠার জন্য ১ লাখ ২ লাখ টাকা নেন। তাদের নাম থাকলে শ্রেষ্ঠ ধনীর তালিকায়, তাহলে কত আনন্দই-না হতো আমাদের। অনেকে এশিয়ার ধনীদের মধ্যে নাম লেখাচ্ছেন। তাদের নামও পাচ্ছি না। এভাবে যদি সবাই প্রতিযোগিতা করে ন্যায্য ‘কর’ (ট্যাক্স) দিতেন, তাহলে আমাদের ‘উন্নয়ন বাজেটের’ (এডিপি) জন্য সরকারকে ধার করতে হতো না। বস্তুত ঘাটতি বাজেটই করতে হতো না। বর্তমানে দৃশ্যমান চাকরিজীবী যারা, তারাই প্রধান করদাতা— সিংহভাগ করদাতা। বেসরকারি চাকরিজীবীরা আগে এভাবে ধরা দিতেন না। এখন রাজস্ব বিভাগ তাদেরকেও করের আওতায় এনেছে। আমার ধারণা, বর্তমান উত্সাহব্যঞ্জক অনুকূল পরিবেশ বজায় থাকলে ‘ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স’ দিনদিন বাড়বে। সরকারকে রাজস্বের অভাবে ব্যাংক থেকে ধার করতে হবে না। এই ক্ষেত্রে উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে রাজস্ব বিভাগকে। তারা যে সচেতন এবং সফল তার সাক্ষ্য হচ্ছে প্রতি বছরের করমেলা। এই স্বীকৃতি তাদের প্রাপ্য।

n লেখক :অর্থনীতিবিদ