ডাকসু ভিপি নুরকে নিয়ে কী হচ্ছে?

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:১৭

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর সহসভাপতি নুরুল হক নূরকে নিয়ে বিশেষ কোনো প্লট তৈরির কোনো পরিকল্পনায় কি কোনো পক্ষ মনোযোগী হয়েছেন? তাকে ব্যবহার করে কিংবা তাকে দিয়ে বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য সাধনের কোনো পরিকল্পনা কি কোনো মহলের রয়েছে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘লাশ’ ফেলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত ও অস্থিতিশীল করার কোনো অপচেষ্টা কি করা হচ্ছে? তার সঙ্গে বামপন্থি ছাত্রসংগঠনগুলোর ঐক্য কি বিশেষ কোনো তাত্পর্য বহন করছে? লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে তার বার্তা বিনিময়ের যে খবর শোনা যাচ্ছে, তা কি শুধুই রটনা, না ‘যা রটে তার কিছু না কিছু তো বটে’!

নূরের ওপর একের পর এক হামলা এবং এখন আবার উলটো তার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দেওয়ার ঘটনাগুলোকে খুব স্বাভাবিক বা নির্দোষ বলে মেনে নেওয়া যায় না। অযথা হামলা-মামলা করে কারো জনপ্রিয়তা কমানো যায় না। নুর যদি সাধারণ ছাত্রদের হয়ে কথা বলে, তার প্রতি যদি সাধারণ ছাত্রদের সমর্থন থাকে, তাহলে অন্যদের মনে তাকে নিয়ে যতই ‘জ্বলুনি’ থাক না কেন, তাতে নুরের কোনো ক্ষতি হবে না। নুরের ভেতরে যদি ‘বারুদ’ না থাকে তাহলে বাইরে থেকে যত উত্তাপই দেওয়া হোক না কেন, তার ‘বিস্ফোরণ’ ঘটবে না। নুর যদি কোনো ‘ষড়যন্ত্র’ করে থাকে, কোনো বেআইনি কাজে জড়িয়ে থাকে, তার তথ্যপ্রমাণ যদি উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের হাতে থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়াই হবে উত্তম পন্থা। গায়ের জোরে নুরকে মোকাবিলা করার নীতি বা কৌশল থেকে সরে না আসলে ছাত্রলীগকে পরে আরো বেশি পস্তাতে হবে। নুর যে যে কারণে ছাত্রপ্রিয় সেই বিষয়গুলোতে ছাত্রলীগকে অভ্যস্ত হতে হবে। মেরে, ভয় দেখিয়ে তাকে যে দমন করা যাবে না— সেটা অন্তত এতদিনে সবারই বোঝা উচিত।

নুর এখন আর একা নেই। তার একটি সংগঠন হয়েছে। বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। তার সংগঠন এখনো কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড় হয়নি। তবে তার একটি সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। তার জনপ্রিয়তার ওপর ভর করে অন্য নানা পক্ষ তার সঙ্গী হবে বা হচ্ছে। সরকারবিরোধী সব শক্তিই নুরের ওপর সওয়ার হতে চাইবে। ডাকসু ভিপির পদটি তার দখলে, এটা মনে রাখতে হবে। এই পদের একটি আলাদা ভার আমাদের দেশে আছে। ডাকসুর সব ভিপি খ্যাতি পাননি—এটা যেমন সত্য, তেমনি এটাও সত্য যে ডাকসু ভিপি চাইলে ‘ইতিহাস’ তৈরিতে ভূমিকা রাখতেও পারেন। নুরের এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক নীতি-আদর্শ আছে বলে মনে হয় না। তবে সরকারপক্ষ তাকে বিরোধী শিবিরে ঠেলে দিয়েছে। তিনি নেতা হতে চান, তা স্পষ্ট। নেতা হওয়ার সিঁড়ি তিনি খুঁজছেন। অনেকেই মই বাড়িয়ে দেবেন। তারেক রহমানও দিতে পারেন। নুর কোনো মইয়ে চড়বেন, দেখার বিষয় সেটাই। ১২টি ছাত্রসংগঠন মিলে ঢাবি ক্যাম্পাসে যে সন্ত্রাসবিরোধী ঐক্য গড়ে তুলেছে সেটা নুরের জন্য একটি পজিটিভ দিক। এই জোট ‘সন্ত্রাস-দখলদারিত্ব মুক্ত নিরাপদ গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাস’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। এই ১২ সংগঠনের মধ্যে নুরুল হক নুরের বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদও আছে।

ছাত্রলীগ ও তাদের সমর্থকরা প্রচার করে যে নুর জামায়াত-শিবিরের লোক। নুর যে কোটা সংস্কারের আন্দোলন থেকে উঠে এসেছেন, সেই আন্দোলনে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে অসম্মানজনক স্লোগান উচ্চারিত হয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন সময় নুরের পক্ষে জামায়াত-শিবির হয়তো অবস্থানও নিয়েছে। তবে এসব ঘটনা কতটুকু সংগঠিত, আর কতটুকু স্বতঃস্ফূর্ত সে প্রশ্ন করাই যায়। কোটা সংস্কার আন্দোলনে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদেরও অংশগ্রহণ ছিল। নুরকে নিজেদের পক্ষে রাখার কোনো চেষ্টা কি ছাত্রলীগ করেছিল? তার মধ্যে যে নেতৃত্ব দেওয়ার গুণ ও সম্ভাবনা আছে, এটা ছাত্রলীগের কারো চোখে পড়ল না কেন? ডাকসু নির্বাচনে নুর ভিপি পদে প্রার্থী হওয়ার আগে ছাত্রলীগের তন্দ্রা কাটেনি। আর তার বিজয়ের পর ছাত্রলীগ হাত কামড়াতে শুরু করেছে। কোনো অনিয়ম করে, কারচুপির আশ্রয় নিয়ে নুর ভিপি পদে জিতেছেন, সেটা বলার কোনো সুযোগ নেই। শিবিরের পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে নুর জিতেছেন, এটা যদি বলা হয়, তাহলে তার দায় কিন্তু ছাত্রলীগের ওপর গিয়েই বর্তাবে। ছাত্রলীগের কঠোর নিয়ন্ত্রণে থাকার পরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির প্রভাব বিস্তার করল কীভাবে—এ প্রশ্নের জবাব ছাত্রলীগকেই তো দিতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় বামপন্থি ছাত্রসংগঠনগুলো নুরের সঙ্গে আছে। ছাত্র ইউনিয়নসহ বামপন্থি সংগঠনগুলোকে শিবির-সমর্থক বলে প্রচার করলে তা খুব হালে পানি পাবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া যা কিছু সরকারবিরোধী তার সবগুলোর সঙ্গে জামায়াত-শিবির-বিএনপি ট্যাগ এঁটে দেওয়ায় এখন এটা এর মধ্যেই কার্যত তামাশায় পরিণত হয়েছে। তবে নুরকে নিয়ে একসঙ্গে চলার আগে বাম সংগঠনগুলোর উচিত হবে তার সম্পর্কে আরো জানা-বোঝা।

নুরের ব্যাপারে ছাত্রলীগও ঠিক পথে হাঁটছে বলে মনে হয় না। তাকে পিটিয়ে আহত করে হাসপাতালে পাঠানোর পর তার বিরুদ্ধেই একাধিক মামলা দেওয়ার ঘটনার কেউ প্রশংসা করবে না। এভাবে তাকে হয়রানি করা যাবে, তার গতিবিধি হয়তো নিয়ন্ত্রণও করা যাবে কিন্তু তাতে ছাত্রলীগের প্রতি সাধারণ শিক্ষার্থীদের সমর্থন কিংবা আস্থা—কোনোটাই বাড়বে না। আক্রান্তের প্রতি সবাই সাধারণত একটু বেশি সহানুভূতিশীল হয়ে থাকে।

গত ২২ ডিসেম্বর দুপুরে ডাকসু অফিসে ভিপির কক্ষে ঢুকে নুর ও তার কিছু সমর্থকের ওপর প্রথম হামলা চালানো হয় মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ নামের একটি সংগঠনের ব্যানারে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি তার সঙ্গে ‘বহিরাগত’দের নিয়ে ডাকসু ভবনে গিয়েছিলেন। ডাকসুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছাড়া কেউ যেতে পারবে না, এমন কোনো বিধিনিষেধের কথা আগে শোনা যায়নি। ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুরের যেহেতু একটি সংগঠন আছে, সেহেতু সেই সংগঠনের নেতাকর্মীরা তার সঙ্গে ডাকসু অফিসে যাবেন, এটা কোনো অস্বাভাবিক বিষয় হতে পারে না।

দুই দফা হামলায় নুর ও তার সমর্থকরা মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। বিষয়টি উদ্বেগজনক ও নিন্দনীয়। নুর ডাকসুর নির্বাচিত ভিপি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ডাকসু ভিপির পদটি খুব মামুলি ব্যাপার নয়। ডাকসুকে বলা হয় বাংলাদেশের দ্বিতীয় পার্লামেন্ট। নূর প্রচলিত কোনো ছাত্রসংগঠনের নেতা নন। তিনি কোটাবিরোধী আন্দোলনের ভেতর দিয়ে জনপ্রিয় হয়েছেন। কোটাবিরোধী আন্দোলনের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন বা বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু ঐ আন্দোলন যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সমর্থন পেয়েছিল, তা নিয়ে তো বিতর্ক করার সুযোগ নেই। তাকে একাধিকবার হামলার শিকার হতে হয়েছে। কিন্তু গ্রামের একটি সাধারণ পরিবার থেকে আসা নুর হামলা-মামলার ভয়ে পিছু হটেননি। তার অদম্য সাহস তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে ‘হিরো’ বানিয়েছে। ডাকসু নির্বাচনে তাকে পরাজিত করা যায়নি। তার এই নেতা হয়ে ওঠাটা ছাত্রলীগের পছন্দ হয়নি। ধারে না পেরে তাকে ভারে মারার কৌশল নিয়েছে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের এই কৌশল যে ভুল, তা একটু বিলম্বে শাসক দল ও দলের প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুঝতে পেরেছেন। নুরের ওপর বারবার হামলা যে সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলছে, এটা দলের আর কেউ কেন এতদিন বুঝতে পারেনি, সেটা এক বড়ো প্রশ্ন।

গায়ের জোরে সাময়িকভাবে ভিন্নমত দমন করা গেলেও তার সুদূরপ্রসারী ফল ভালো হয় না। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সব মানুষ এক দল, এক মতের হয় না, হতে পারে না। সবাইকে কেন সরকারের প্রশংসা করতে হবে? আবার সেই প্রশংসা কেন জোর করে আদায় করতে হবে?

আন্দোলন-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে নূর সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন করেছেন। তিনি তো গায়ের জোরে বা অন্য কোনো প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে নেতা হননি। ছাত্রলীগের কোনো নেতা বা কর্মী কেন তার মতো হতে পারলেন না? ছাত্রদের আস্থা ছাত্রলীগের প্রতি অটল নেই কেন? নূরকে ‘শত্রু’ বানানোর আগে তাকে মিত্র হিসেবে পাওয়ার কী কী চেষ্টা ছাত্রলীগ করেছিল তা জানা দরকার।

এর আগে গণজাগরণ মঞ্চের ইমরান এইচ সরকারের উত্থান এবং পতন আমরা দেখেছি। ইমরানের ভুলভ্রান্তি, ত্রুটিবিচ্যুতি থাকতে পারে। কিন্তু তিনি যে কাজটি করেছিলেন তা কি এতই অবহেলার ছিল? কেন আমরা বা আমাদের মূলধারার রাজনীতি নতুন নেতৃত্ব তৈরি বা ধরে রাখতে পারছে না, তা ভাববার সময় এসেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন নুরের ওপর হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের তিন নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু হামলার সঙ্গে ছাত্রলীগের যারা জড়িত ছিলেন, তাদের কাউকে এখনো আইনের আওতায় আনার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আমরা আশা করি, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পালিত হবে। অন্যায়কারীকে প্রশ্রয় না দেওয়ার নীতি শাসক দলকে কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। নুর ও তার সমর্থকদের ওপর হামলাকারীদের আইনের আওতায় আনলে সরকারের কোনো ক্ষতি নেই। বরং এতে সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। নুরের ওপর মারমুখী না হয়ে ছাত্রলীগকে নুরের মতো ছাত্রপ্রিয় বা ছাত্রবান্ধব সংগঠন হতে হবে। ভয় দেখিয়ে জয় করার কৌশল পরিত্যাগ না করলে ক্ষতি শুধু ছাত্রলীগের নয়, সরকারেরও। নিজের ভালো না বোঝার নির্বুদ্ধিতা ছাত্রলীগ পরিহার করবে—এ আশা আমরা করতেই পারি।

n লেখক :জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক