কৃষ্ণচুড়ার অভিমান :নিষ্প্রভ ও ম্লান বসন্তকাল

আপডেট : ৩১ মার্চ ২০২১, ২১:৩৬

৩০ মার্চ, ২০২১ পড়ন্ত বিকেলে সংসদ ভবনের লেকের পাড়ে হাঁটছিলাম। বিজয় সরণির পশ্চিম প্রান্ত থেকে গণভবন পর্যন্ত সারি সারি কৃষ্ণচুড়া কালের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যার বৈজ্ঞানিক নাম ‘ডেলোনিক্স রেজিয়া’। চমত্কার উজ্জ্বল সবুজ রঙের পাতা এবং অগ্নিঝরা কৃষ্ণচুড়া ফুল সৌন্দর্য ও সুবাস দিয়ে চারদিক আলোকিত ও বিমোহিত করে রাখে। উক্ত প্রজাতি ফ্যাবেসি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। উক্ত প্রজাতির আদি নিবাস আফ্রিকার মাদাগাস্কার জঙ্গলে। অতঃপর আফ্রিকার অন্যান্য দেশ, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ও টেক্সাস, চীন, হংকং, তাইওয়ান, ভারত, বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

বৃক্ষ ছাড়া পৃথিবীতে অন্য কোনো জীবনের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। আমরা যদি প্রত্যেকেই নিজ নিজ বাড়ির আঙিনায় বা ছাদে বৃক্ষ রোপণ ও নিয়মিত পরিচর্যা করি, তাহলেই আমাদের দেশ ভয়াবহ বায়ুদূষণ ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে পারে। ১৮ মার্চ, ২০২১ ঢাকায় বায়ুদূষণের সূচক ছিল একিউআই ৩৬৭, দিল্লিতে ৩৫৮, লাহোরে ২১৫। ১৮ মার্চ, বায়ুদূষণের সূচকে বিশ্বের শীর্ষে ঢাকা, দ্বিতীয় অবস্থানে নয়াদিল্লি, তৃতীয় অবস্থানে লাহোর। ২১ মার্চ, ঢাকায় একিউআইয়ের সূচক ২৭৩, বায়ুদূষণের সূচকে বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থানে ঢাকা। একিউআই সূচক ৫০ থেকে ১০০-এর মধ্যে থাকলে বাতাসের মান নিরাপদ বলে বিবেচিত হয়। একিউআই সূচক ১০০-১৫০ অতিক্রম করলে বিশেষভাবে শিশু, অসুস্থ ব্যক্তি, বয়স্কসহ প্রত্যেকেই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারে। কিছু প্রভাবশালী নির্বোধ-অর্বাচীন ও অর্থলিপ্সু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সুন্দরবন, ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান, মধুপুরের বন ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চল উজাড় করে হাজার হাজার ব্রিকফিল্ডের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে, যা আমাদের জন্য ভয়াবহ বায়ুদূষণ এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

বৃক্ষ, তরুলতা আমাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও উপকারী বন্ধু। কেননা, এরা আমাদের প্রশ্বাসের নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ এবং আমাদের জন্য অক্সিজেন সরবরাহ করে থাকে। পৃথিবীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় বিশ্বের ধনী ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো এবং সমগ্র মানব জাতির উচিত যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া। প্রতি বছর নিয়মিত বৃক্ষরোপণের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ অতিব জরুরি।

ঋৃতুরাজ বসন্তের শেষ প্রান্তে ও গ্রীষ্মের রৌদ্রকরোজ্জ্বল প্রকৃতিতে ধরা দেয় অগ্নিঝড়া কৃষ্ণচুড়া। লেকের পাড়ে হাঁটার সময় আমার পুত্র আমাকে জিগ্যেস করল, বাবা কোথায় কৃষ্ণচুড়া ফুল? অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখলাম একটি গাছেও ফুল নেই। প্রায় সব কৃষ্ণচুড়াগাছের পাতা সবুজ। প্রকৃতিকে নিষ্প্রভ ও ম্লান মনে হয়। তাহলে প্রকৃতি কি আমাদের ওপর বিরূপ?

করোনা ভাইরাসের ভয়াবহ তাণ্ডবে পৃথিবীর ১৩ কোটি মানুষ আক্রান্ত এবং ২৮ লাখ মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। মানবকুলের অকালমৃত্যুতে বৃক্ষরাজি শোকাহত ও মর্মাহত। তাদের প্রতি সহমর্মিতা, সমবেদনা ও বুকভরা আর্তনাদ প্রকাশপূর্বক নীরব নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

প্রায় দুই যুগ ধরে সংসদ ভবন এলাকা ও চন্দ্রিমা উদ্যানে মর্নিং বা ইভিনিং ওয়াক করে থাকি, এমন দৃশ্য কখনো চোখে পড়েনি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, পাখিরা উড়ে যাচ্ছে আপন আপন নীড়ে। কোকিলের কুহুকুহু ডাক আমাদের বিমোহিত করে। সূর্যের শেষ রশ্মিটুকু জানান দিচ্ছে অস্তমিত যাবে।

ফুল ফুটুক আর না ফুটুক, আজ বসন্ত। বসন্ত কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতি, প্রৌঢ় সবার মনেই দোলা দেয়, আন্দোলিত করে ও শিহরণ জাগায়। ঋতুরাজ বসন্ত আমাদের অতীত জীবনের দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা মুছে দিয়ে আমাদের জন্য সুখ-শান্তি এবং করোনামুক্ত পৃথিবীর বার্তা বয়ে নিয়ে আসুক।

কয়েক দিন পরেই হয়তো ফুলে ফুলে ভরে যাবে কৃষ্ণচুড়াগাছ। ডালে ডালে কোকিলের ঝাঁক। ফুলে ফুলে মৌমাছিরা মধু আহরণে ব্যস্ত হয়ে উঠবে। পাশে হয়তো দাঁড়িয়ে থাকবে রাধাচূড়া, শিমুল ও পলাশ। রূপ, রং ও সুগন্ধময় কৃষ্ণচুড়ার মুগ্ধতায় যুগলদের পদচারণে ভরে যাবে লেকপাড় ও চন্দ্রিমা উদ্যান। অনেকেই হয়তো আনমনে গুনগুন করে গাইতে থাকবে উপমহাদেশের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী কিশোর কুমারের জনপ্রিয় সেই গান, ‘এই সেই কৃষ্ণচুড়া, যার তলে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ, হাতে হাত, কথায় যেত হারিয়ে’।

n লেখক :প্রাক্তন সাংগঠনিক সম্পাদক, জাতীয় চার নেতা পরিষদ