সম্ভাবনার নতুন দ্বার ‘হাওর পর্যটন’

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:১০

প্রাকৃতিক নৈসর্গ ও অফুরন্ত বহুমাত্রিক সৌন্দর্যের লীলাভূমিখ্যাত বাংলাদেশ। বাংলাদেশের প্রতিটি পরতে পরতে রয়েছে পাহাড়, পর্বত, নদী-নালা ও হাওরের নির্মল ও সজীব উজ্জ্বলতার ছোঁয়া। প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি হাওরের প্রতিটি ক্ষণ পর্যটকদের কাছে উপভোগ্য। হাওর অঞ্চলের সবুজের সমারোহ ও সাগরসদৃশ বিস্তীর্ণ জলরাশির অপরূপ মহিমা দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের মুগ্ধ করে। মৌসুমি ফসল ও প্রকৃতির নবরূপ এবং হাওর অঞ্চলের মানুষের প্রকৃতিবান্ধব সরলতায় ভরপুর ব্যস্ত জীবন-জীবিকার চিত্র এখন গ্রামীণ পর্যটন উন্নয়নের এক নতুন ধাপ। হাওর পর্যটন  বিগত এক দশক আগেও বাংলাদেশের পর্যটনে এতটা আকর্ষণ ছিল না। মানুষ এখন প্রকৃতিমুখী এবং গ্রামমুখী। প্রকৃতি ও গ্রামের সম্মিলিত সন্নিবেশ তদুপরি বিস্তীর্ণ জলরাশির সৌন্দর্য হাওয়া পর্যটনের আকর্ষণ।

ষড়ঋতুর বাংলাদেশে বর্ষায় হাওরের নৈসর্গিক রূপে বৈচিত্র্যে প্রকৃতিপ্রেমীদের আকর্ষণ করে। অসংখ্য ভ্রমণপিপাসু মানুষ মানসিক প্রশান্তি ও বিনোদনের জন্য হাওরের আঁকেবাঁকে ঘুরে বেড়ায় সবুজের সমারোহ ও সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য। বর্ষায় হাওরের দখিনা বাতাস, শনশন শব্দে পাল তুলে চলে নৌকা এবং বিকালের পড়ন্ত রোদের দৃশ্যপট যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা ছবির মতো জলতরঙ্গ। রাতের অনন্য সৌন্দর্য চাঁদের আলো আর ঢেউয়ের জিকিমিকি হূদয়ে দাগ কাটে। কুপিবাতি দিয়ে ডিঙি নৌকায় জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য এবং জলরাশির ছন্দ পর্যটক আকর্ষণের অনন্য উপাদান। ইতিমধ্যে হাওর পর্যটনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আর্থসামাজিক উন্নয়ন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রাখছে।

কিশোরগঞ্জের হাওরের মিঠাপানির একক ‘ওয়াটার বডি’ যেখানে শ্রাবণের দমকা বাতাস গর্জে ওঠে জলরাশি ও সবুজের সমরোহে স্বপ্নিল রূপে সজ্জিত হয় হাওর অঞ্চল। বর্ষায় ‘অস্ট্রেলিয়া, শুকনায় নিউজিল্যান্ড’ নামে খ্যাত কিশোরগঞ্জের নিকলী হাওর আসলে নান্দনিক সৌন্দর্য আরো বেশি। টাঙ্গুয়ার হাওর গোধূলিলগ্নে দৃশ্য পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্ জলাভূমি ও দর্শনীয় স্থান। জীববৈচিত্র্যের মধ্যে অন্যতম হলো বিভিন্ন প্রজাতির পাখি শীতকালে সুদূর সাইবেরিয়া থেকে আগত পরিযায়ী পাখির আবাস এই হাওরে যা ইতিমধ্যে দেশীয় পর্যটকদের আকর্ষণ করেছে।

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি জেলার ৪৮টি উপজেলা নিয়ে গঠিত বিস্তীর্ণ এই হাওরাঞ্চলের আয়তন প্রায় ২৪ হাজার বর্গকিলোমিটার। বিশাল এই হাওর বাংলাকে কেন্দ্র করে আমাদের পর্যটনশিল্প সমৃদ্ধ হতে পারে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সমাগমে। টাঙ্গুয়ার হাওর প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত হাওর বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি। তবে এটি স্থানীয় মানুষের কাছে ‘নয়কুড়ি কান্দার ছয়কুড়ি বিল’ নামে পরিচিত।  সমগ্র হাওরাঞ্চল পর্যটকদের কাছে এক স্বপ্নের ঠিকানা জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যময়তার বিচারে ট্যুরিজমে দেশের সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান। জলের কিনারায় বিশ্বের তাবত্ পর্যটনশিল্প গড়ে ওঠায় পর্যটনশিল্পের প্রাচীনতম ইকো ট্যুরিজম এবং গ্রামীণ পর্যটন উন্নয়নে সর্বোত্কৃষ্ট তীর্থক্ষেত্র এখন হাওরাঞ্চল। প্রতিনিয়ত আহ্বান করছে অফুরন্ত পর্যটন সম্ভাবনার দুর্নিবার হাতছানিতে। মূলত প্রকৃতি সাজিয়েছে উদার নীড়ে তার সৃষ্টিকে। প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার মতো এখানে রয়েছে পর্যটকদের চিত্তাকর্ষণে যত সব উপজীব্য, যা ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে হয়ে উঠেছে রূপকন্যার স্বপ্নপুরীতে।

হাওরে পর্যটক বা মানুষের অবাধ পদচারণা বেশি দিনের নয়। অথচ পর্যটনশিল্পে হাওর প্রাচীনতম হলেও চরম অবহেলায় অনুন্নত সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার দরুন এতদিন রয়ে গেছে মানুষের দৃষ্টির বাইরে।  হাওরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ যাতে বাধাগ্রস্ত না হয় সেটা মাথায় রেখেই কামালপুর গ্রাম হতে নিকলী উপজেলার মরিচখালি পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার উড়াল সেতুসহ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সংযোগ সড়ক হিসেবেও অভূতপূর্ব উন্নয়ন সূচিত হতে যাচ্ছে, এ ছাড়া সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার মধ্যকার সংযোগ স্থাপনে সাড়ে ১৩ কিলোমিটার উড়াল সেতুসহ ১৯০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করার সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। এভাবে অবকাঠামোগত উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলে আর্থসামাজিক উন্নয়নসহ পর্যটনশিল্প সমৃদ্ধ হবে হাওরাঞ্চল।

হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পর্যটকরা নৌকায় বসে বিস্তীর্ণ নীল জলরাশির মায়ায় যেমনি ডুব দিতে পারেন, তেমনি রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা পেতে সাঁতার কাটতে পারেন নির্দিষ্ট স্থানগুলোতে। সংস্কৃতিপ্রেমীদের কাছে রাতের চাঁদের আলোর নিচে নৌকায় বসে স্বাদ নিতে পারেন বাউল ও মরমি কবি-সাধকদের গানের সুর তুলে কিংবা হাওরের শীতল হাওয়া ও পূর্ণিমার আলোয় রাত্রী যাপন করে অনুভব করতে পারেন মানসিক প্রশান্তি। বর্ষাকালে হাওরের কোল ঘেঁষে থাকা সীমান্ত নদী, পাহাড়, পাহাড়ি ঝরনা, হাওর-বাঁওড়ের হিজল, নলখাগরা বনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নানান প্রজাতির বনজ, জলজপ্রাণী আর হাওরপাড়ের বসবাসকারী মানুষের জীবন-জীবিকার নৈসর্গিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হওয়ার মতো খোরাক মিলবে পর্যটক ও দর্শনার্থীদের এবং হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পাখির মিলনমেলা ও সবুজের সমারোহ শীতের মৌসুমে গড়ে ওঠা চোখ জুড়ানো সৌন্দর্যে মনপ্রাণ ছুঁয়ে যাবে পর্যটকদের।

হাওরাঞ্চলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ইকো-ট্যুরিজমের তাত্পর্য বা গুরুত্ব ধরে রাখতে গেলে সর্বোপরি পরিবেশগত বিপন্নতা ঠেকাতে গেলে যোগাযোগের পাশাপাশি ইকোলজিক্যাল বা পরিবেশগত তথা জলবায়ুর অভিঘাত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা ব্যবস্থাপনা, পানি সম্পদ ব্যবহার, জীববৈচিত্র্য ও জলাশয় সংরক্ষণসহ আর্থসামাজিক, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক ও মানবসম্পদ উন্নয়নসহ কৃষিবিমা চালু ও সরকারি বিভিন্ন সাহায্য-সহায়তা, ত্রাণ-অনুদানে সুষম বণ্টন-ন্যায্যতা নিশ্চিত করা অতীব জরুরি।

হাওর পর্যটন বিকাশে যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এ হাওরে সরকারি ও বেসরকারিভাবে যথাযথ উদ্যোগ এবং পরিকল্পনার অভাবে পর্যটন বিকাশে কোনো ধরনের অগ্রগতি হয়নি। সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা গেলে সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের এ হাওরগুলো দেশের অন্যতম পর্যটন ক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে। হাওর পর্যটন উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক নৌকা, পর্যটকদের জন্য খাওয়া-থাকার ব্যবস্থা, বিশ্রাম নেওয়ার স্থান ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। যা দেশের পর্যটনশিল্প বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকার পাশাপাশি হাওরবাসীর জন্য বিকল্প আয় সৃষ্টি, হাওরের পরিবেশ উন্নয়ন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে অনন্য ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণার মাধ্যমে সংকট উত্তরণের পথ খুঁজে বের করে সমৃদ্ধ দেশ গঠনে অনবদ্য অবদান রাখতে পারে। হাওর পর্যটনকে জনপ্রিয়করণে ব্যাপক প্রচার ও প্রকাশনা দরকার। অনলাইনভিত্তিক প্রচারণার জন্য ফেসবুক, ইউটিউব এবং ওয়েবসাইট ভূমিকা রাখতে পারে। হাওরের পর্যটন খাতকে সরকার গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করলে দুই ঋতুতেই (বৃহদার্থে) বিরাট অর্থকরী ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে হাওরাঞ্চল। গবেষণার মাধ্যমে সংকট উত্তরণের পথ খুঁজে বের করে সমৃদ্ধ দেশ গঠনে হাওর পর্যটন হতে পারে অন্যতম ক্ষেত্র।

n লেখক :চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়