রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতে প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২১, ২১:৩৫

করোনা মহামারির ভেতরেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল প্রশংসনীয়। এছাড়াও মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, বেকারত্ব এবং দারিদ্র্যের হার কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সফল হতে পেরেছে। জাতিসংঘের বেঁধে দেওয়া শর্ত পূরণ করার মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে অবস্থান নিতে যাচ্ছে। এখন বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত দাঁড়িয়েছে ৫০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। অথচ ৫০ বছর আগে বৈদেশিক মুদ্রার স্বল্পতার কারণে আমদানি ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হয়েছে। উল্লেখ্য, যে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত যত বেশি, সে দেশ অর্থনৈতিকভাবে তত শক্তিশালী। এখন বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে দুটো কারণে— ১) রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং ২) রেমিট্যান্সের প্রবাহ।

বাংলাদেশ সরকার আগামী ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত করতে চায়। এজন্য সরকার ইতিমধ্যে অনেকগুলো পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। মনে রাখা প্রয়োজন যে, কোনো দেশের আয় বৃদ্ধি না পেলে কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায় না। পরিকল্পনাগুলো শুধু কাগজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। শুধু রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকলে চলবে না। রপ্তানি এবং রাজস্ব আয়ের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত মোটেই সন্তোষজনক নয়। সরকারের রাজস্ব আয় আশানুরূপ না হওয়ায় জাতীয় বাজেটের ঘাটতি পূরণ করতে বৈদেশিক উত্স থেকে ঋণ নিতে হয়। সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে মাথাপিছু বিদেশি ঋণের পরিমাণ এখন ৪৬০ ডলার, অর্থাত্ ৩৯ হাজার টাকা। প্রতিবেদনে আরো বলা হয় যে, মোট বিদেশি ঋণের পরিমাণ ৭৮.০৪ বিলিয়ন ডলার, যা মোট জিডিপির প্রায় ২২ শতাংশ। ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো  রপ্তানি এবং রাজস্ব আয় আশানুরূপ বৃদ্ধি না পাওয়া। এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কীভাবে রপ্তানি আয় এবং নতুন নতুন রপ্তানি বাজার সৃষ্টি করা যায়, সেটা নিয়ে ভাবতে হবে। ২০২০-২০২১ অর্থবছরের হিসাব মতে, ৩৫৩ বিলিয়ন ডলারের নমিনাল জিডিপি নিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৭তম বৃহত্ অর্থনীতি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪০.৫৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করা হয়। কিন্তু ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে এসে মোট রপ্তানি হয় ৩৩.৭ বিলিয়ন ডলারের। অনেকটা কমে গেছে।

সত্য যে, করোনা মহামারির মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয় হলেও কিছুদিন আগে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম এ অবস্থান কেড়ে নেয়। এর প্রধান কারণ হলো ভিয়েতনাম নতুন নতুন বাজার সৃষ্টি করতে এবং রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য আনতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়াও, অনেক কারণ রয়েছে। এ বছরের ১৮ জুলাই এক ইংরেজি দৈনিকের খবরে বলেছে যে, বাংলাদেশ সরকার ২০২১-২০২২ অর্থবছরের মধ্যে ৫১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করবে। এটা অর্থনীতির জন্য খুবই ভালো খবর। কিন্তু এ পরিকল্পনার জন্য আগে থেকে  কী কোনো বাড়তি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? জরুরি বিষয় হলো, রপ্তানির জন্য নতুন বাজার সৃষ্টি করা এবং সেই সঙ্গে রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য আনা। এটা করতে না পারলে প্রতিযোগিতামূলক বাজার থেকে বাংলাদেশ অচিরেই ছিটকে পড়বে।

২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে ৪০.৫৩ বিলিয়ন ডলারের যে পণ্য রপ্তানি করা হয় তার বেশিরভাগ গেছে ১০টি দেশে। অর্থাত্ প্রায় ৭১ শতাংশ পণ্য ১০টি দেশে রপ্তানি করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৬.৯৬ শতাংশ, জার্মানিতে ১৫.২৩ শতাংশ, যুক্তরাজ্যে ১০.২৯ শতাংশ, স্পেনে ৬.৩ শতাংশ, ফ্রান্সে ৫.৪৭ শতাংশ, ইতালিতে ৪.০৫ শতাংশ, জাপানে ৩.৩৭ শতাংশ, কানাডায় ৩.৩১ শতাংশ, নেদারল্যান্ডে ৩.১৫ শতাংশ, পোলান্ডে ৩.১৪ শতাংশ এবং অন্যান্য দেশে মাত্র ২৮.৭৩ শতাংশ পণ্য বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি করা হয়। এই চিত্র থেকে বলা যায় যে, রপ্তানি বাজার সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তার প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো থেকে এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। প্রতি বছর ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে থাকে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহতম অর্থনীতির দেশ চীনে পণ্য রপ্তানিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে পিছিয়ে। চীন প্রতি বছর সারা বিশ্ব থেকে ২২০০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে থাকে। সেখানে বাংলাদেশ থেকে আমদানি করে মাত্র ৮০০ মিলিয়ন ডলারের। বাংলাদেশ থেকে চীনে যে ৯৮ ধরনের পণ্য রপ্তানি করা হয়, তার মধ্যে ৬০ শতাংশ তৈরি পোশাক। অর্থাত্, রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য নেই বললেই চলে।

সম্প্রতি একটি ইংরেজি দৈনিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালে ভিয়েতনাম থেকে চীনে পণ্য রপ্তানি করা হয় ৭৮.৪৭ বিলিয়ন ডলারের, থাইল্যান্ড থেকে ৪৮.১০ বিলিয়ন, ভারত থেকে ২০.৮৬ বিলিয়ন, মিয়ানমার থেকে ৬.৩৪ বিলিয়ন, পাকিস্তান থেকে ২.১২ বিলিয়ন, কম্বোডিয়া থেকে ১.৫০ বিলিয়ন এবং বাংলাদেশ থেকে মাত্র ০.৭৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করা হয়। চীন থেকে বাংলাদেশি রপ্তানি পণ্যের ওপর ৯৭ শতাংশ শুল্কমুক্ত সুবিধা দিলেও বাংলাদেশ এখনো পর্যন্ত পুরোপুরি এই সুবিধা ভোগ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এক খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন যে, বাংলাদেশ যদি চীনের মোট আমদানির ১ শতাংশ অংশীদার হতে পারে তাহলে বাংলাদেশ ২৫ বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারবে। যদি চীনের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করা যায় তাহলে দুই দেশই অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে। বলা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশের রপ্তানি-জিডিপি অনুপাত ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। যেখানে ২০১২ সালে রপ্তানি-জিডিপি অনুপাত ছিল ২০.১৬ শতাংশ এটা এখন হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১৫.৩২ শতাংশ ( ২০১৯ সালে)। 

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কারেন্ট অ্যাকাউন্ট (চলতি হিসাব)-এর অবস্থান জানতে পারলে রপ্তানির বিষয়ে ভালো ধারণা পাওয়া যাবে। ১৯৮০ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত কারেন্ট অ্যাকাউন্ট উদ্বৃত্ত ছিল ১৪ বছর ধরে এবং কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতি ছিল ২৭ বছর ধরে। কারেন্ট অ্যাকাউন্ট উদ্বৃত্ত দ্বারা বোঝায় যে, একটা দেশের সঞ্চয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রপ্তানি আয়ের ওপর নির্ভরশীলতা। অন্যদিকে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতি দ্বারা বোঝায়, দেশটি আমদানি-নির্ভর হয়ে পড়েছে। এ থেকে স্পষ্ট জানা যায় যে, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আমদানি-নির্ভর অর্থনীতি ছিল। রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতি না হতে পারলে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। একমাত্র নির্মাণাধীন অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার মাধ্যমে বাংলাদেশকে  রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত করা সম্ভব। এছাড়াও, মুক্তবাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে রপ্তানি আয় বাড়ানো সহজতর হবে। ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে চলে গেলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কর্তৃক দেওয়া জিএসপি (শুল্কমুক্ত) সুবিধা থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত হবে। এ কথা মাথায় রেখে রপ্তানি আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকারের নীতিনির্ধারকদের পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

n লেখক :অর্থনীতি বিশ্লেষক