১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। ভাবা যায় কত টাকা? অথচ এই টাকা হচ্ছে মধ্যবিত্তের বার্ষিক বাড়তি ব্যয়। যদি নির্দিষ্ট কতগুলো পণ্যদ্রব্য আমদানি শুল্ক ব্যতিরেকে আমদানি করে মধ্যবিত্ত ভোগ করতে পারত, তাহলে বছরে তাদের ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা বেঁচে যেত। তা হতে পারত তাদের সঞ্চয়। এই খবরটি দিয়েছে দৈনিক ইত্তেফাক। অক্টোবরের ৪ তারিখে প্রচারিত খবরটির শিরোনাম : উচ্চ শুল্কে ভোক্তার বাড়তি ব্যয় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। ভেতরের খবরে বলা হয়েছে চারটি কথা। এক. দক্ষিণ এশিয়ার উচ্চ শুল্ক হারে শীর্ষে বাংলাদেশ। দুই. দক্ষিণ এশিয়ার গড় ট্যারিফ হার ১২ শতাংশ আর বাংলাদেশে ২৬ শতাংশ। তিন. স্থানীয় শিল্প সুরক্ষার নামে ভোক্তার বাড়তি ব্যয় হলেও ফলাফল মূল্যায়ন হয় না। চার. ডব্লিউটির নীতিমালা অনুযায়ী ট্যারিফ হার কমাতে সরকারি ঘোষণার বাস্তবায়ন নেই। বস্তুত শিরোনাম এবং ভেতরের উপশিরোনামগুলো আমলে নিলে বাংলাদেশের ভোক্তাদের অর্থাত্ সাধারণ মানুষ মধ্যবিত্ত এবং নিম্নমধ্যবিত্ত প্রতি বছর কী পরিমাণ টাকার দণ্ডি দিচ্ছে তা যেমন পরিষ্কার হয় তেমনি আরো কয়েকটি জরুরি বিষয় বিবেচনার জন্য সামনে আসে। প্রকৃতপক্ষে বিষয়টির কয়েকটি পক্ষ আছে।
একটি বড়ো পক্ষ অবশ্যই ভোক্তাশ্রেণি, দ্বিতীয় পক্ষ স্থানীয় শিল্প, তৃতীয় পক্ষ নতুন উদ্যোক্তা সৃজন এবং চতুর্থ পক্ষ সরকারি রাজস্ব। বলাই বাহুল্য, চতুর্থ পক্ষটিই মনে হয় সরকারের কাছে মুখ্য বিবেচ্য বিষয়। সরকারের রাজস্ব দরকার। দরকার ক্রমবর্ধিষ্ণু হারে। অথচ দেশে করদাতার অভাব। দেশে ধনীলোক সে-ই, যারা কর দিতে পারে। তথ্য দিচ্ছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রাজস্ব বিভাগের হিসাব অনুযায়ী ধনীলোক ছিল মাত্র ১১ হাজার ৭০০ জন। এদের ধনের পরিমাণ জনপ্রতি সোয়া দুই কোটি এবং তার ওপরে। এরা কর দিয়েছেন মাত্র ৩৮৭ কোটি টাকা। ভাবা যায়, সোয়া দুই কোটি টাকার ওপরে সম্পদ আছে সারা বাংলাদেশে মাত্র ১১ হাজার ৭০০ জনের। ১৮ কোটি লোকের দেশ। ৪ কোটির ওপর লোক ট্যাক্স দিতে পারে বলে অর্থমন্ত্রী মনে করেন। সেই দেশে কত লোক কর দেয়? আর মাত্র এই কটা লোক ধনী। হাস্যকর বিষয় নয়? কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, এর বোঝা গিয়ে পড়ছে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত এবং সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। তাদেরকে এক টাকার পণ্য ক্ষেত্রবিশেষে দুই টাকার পেতে হচ্ছে। কারণ উচ্চ শুল্ক (ট্যারিফ) আর আমদানিকৃত মালের ওপরে কত রকমের কর সরকার বসাচ্ছে তার হিসাব নেই। সরকারের রাজস্ব দরকার। শুধু শুল্ক করই নয় রয়েছে মূল্য সংযোজন কর। এসবেরই বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর। এর ফলে দেশে সঞ্চয়ের পরিমাণ স্থবির বহুদিন থেকে। মানুষের আয়-রোজগার স্থবির অথচ জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে প্রতিদিন। আবার সরকার প্রত্যক্ষ কর এবং পরোক্ষ কর দুটোই আদায় করছে। সরকার আয়ের ওপরও কর নিচ্ছে। (ইনকাম ট্যাক্স) আবার ব্যয়ের ওপরও কর নিচ্ছে (ভ্যাট)। আমরা এই বোঝা বহন করে চলেছি। সুতরাং গভীরভাবে বিবেচনা করলে আমরা দেখতে পাই, ট্যাক্স সবাই দেয়। কেউ সরাসরি, কেউ পরোক্ষ।
রাজস্বের প্রশ্ন বাদ দিলে সরকারের আরেকটি যুক্তি হচ্ছে দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা। অর্থাত্ দেশে যে শিল্পায়ন হচ্ছে তাকে সহায়তা করা। এরা বিদেশি মালের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে পারে না। বিদেশি মালের ওপর উচ্চ হারে শুল্ক বসিয়ে ঐ মালের দাম চড়া না করলে দেশীয় শিল্প কুলিয়ে উঠতে পারে না। দৃশ্যত খুবই সত্য কথা। তবে মুশকিল হচ্ছে, এই কথা শুনে আসছি পাকিস্তান আমল থেকে। শিল্প যতই পুরোনো হোক, তবু তারা সাবালক হতে পারছে না। ব্যবসায়ীরা শুধু বলছেন, তারা পারছেন না। সরকারের সহায়তা চাই। বেশি শুল্ক আমদানিকৃত মালের ওপর বসাতে হবে। আবার তাদেরকে দেশে ভর্তুকি দিতে হবে। পলিসি সাপোর্ট দিতে হবে। আরো কত কী? এর ফল কী? ইত্তেফাকের খবরেই বলা হচ্ছে ফলাফল সরকার মূল্যায়ন করছে না। এর কারণ কী? ব্যবসায়ীদের চাপ, অবহেলা, গাফিলতি—আমরা এর কিছুই জানি না। তবে মনেই হয়, নানা কারণে এই কাজটি হচ্ছে না। তার ফল কী? তার ফল দুটো। প্রথমত দেশীয় শিল্প তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির কোনো চেষ্টাই করছে না। প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতাই তারা তৈরি করছে না। কাঁচামাল ব্যবহারে দক্ষতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, ব্যয়বাহুল্য পরিত্যাগ করা বিপণন দক্ষতা অর্জন করা এসবের কিছুই তারা করছে না। শুধুই রয়ে যাচ্ছে সরকারের মুখাপেক্ষী। এবং তা শিল্পবিশেষে প্রায় সবাই। সরকারও ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় ব্যবসায়ীদের কথায় কান দিচ্ছে। এখন দ্বিতীয় ফল কী? দ্বিতীয় হচ্ছে মারাত্মক। জিনিসের দাম অতিরিক্তি বেশি হলে মানুষ তা ভোগ করে না। ক্রয় করে কম। এতে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি। বাজারে চাহিদা বাড়ে না। এটা আর কেউ না বুঝুক, ব্যবসায়ীরা ভালো করেই বোঝে। তারা তখন বাজার রক্ষা এবং বাজার বৃদ্ধির জন্য ভিন্ন একটা পন্থার আশ্রয় নেয়। সরকারের ঘোষিত শুল্ক হারে আমদানি করে এক টন এবং দুই টন করে বেসরকারিভাবে শুল্ক কর না দিয়ে। তারা মালের একটা পড়তা মূল্য বের করে। এতে লাভবান দুই পক্ষই। ব্যবসায়ীরা অবশ্য লাভবান বেশি। সামান্য কিছু স্বস্তি পায় ভোক্তারা। তাদের যেখানে কিনতে হতো এক টাকায়, এভাবে মাল আমদানির ফলে এখন হয়তো কিনতে হয় ৯০ পয়সায়। এটা কোনো বড়ো স্বস্তি নয়। তবু অসহায়ের জন্য সামান্য স্বস্তি। চোরাচালান অবৈধ আমদানি, অবৈধ ব্যবসার প্রধান একটি কারণ হচ্ছে উচ্চ শুল্ক। আয়করের হার বেশি হলে মানুষ যেমন আয়কর ফাঁকি দেয় তেমনি ব্যবসায়ীরা মালের বাজার ধরে রাখতে বৈধ আমদানি এবং অবৈধভাবে আমদানিকৃত মালের মিশ্রণ ঘটায়। তারা একে পড়তা বলে। সরকার রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য, দেশীয় শিল্প রক্ষার জন্য আমদানি শিল্পের উচ্চহারকে ব্যবহার করে। কিন্তু প্রকারান্তরে সরকার শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্তই হয়। চোরাচালানকৃত মালের ওপর তো সরকার আর ট্যাক্স পায় না। এই দ্বৈরথের মধ্যে পড়েছি আমরা।
ক্ষতিকর এবং অভিজাত বা বিলাসপণ্যের একটা যুক্তিও আছে। সরকার মনে করে, বিলাসপণ্যের আমদানি নিরুত্সাহিত করা দরকার। অথবা ক্ষতিকর পণ্য আমদানি নিরুত্সাহিত করা দরকার। এটা কীভাবে সম্ভব? উচ্চ ট্যারিফ বসিয়ে বিলাসপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়া। এটা চিরায়ত একটা যুক্তি। কিন্তু বাস্তবে বাজারে দেখা যায়, নিষিদ্ধঘোষিত পণ্য যেমন বাজারে পাওয়া যায়, তেমনি পাওয়া যায় কম দরে বিলাসপণ্যও। কারণ? কারণ খুব সোজা। এসব পণ্য চোরাপথে আনা হয়। আসল কথা হচ্ছে চাহিদা ও সরবরাহ।
মালের চাহিদা থাকলে কোনো ‘দেশপ্রেমই’ মাল আমদানি বন্ধ করতে পারবে না। চাহিদা না থাকলে ভিন্ন কথা। অতএব দেখা যাচ্ছে পুরোনো যুক্তি দিয়ে বিলাসদ্রব্য আমদানি নিরুত্সাহিত করা যাচ্ছে না। একশ্রেণির গ্রাহক আছে, তারা ঐ নিরুত্সাহিত পণ্যই বেশি দামে ক্রয় করবে। বস্তুত বিদেশি পণ্যের প্রতি আমাদের আকর্ষণ সর্বজনবিদিত। আরেকটা যুক্তি আছে। সেটি নতুন উদ্যোক্তা তৈরির যুক্তি। নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য যদি দেশি বাজার তৈরি করে না দেওয়া হয়, তাহলে তারা বড়ো হতে পারবে না। প্রাথমিক অবস্থায় তাদের সুরক্ষা দিয়ে গড়ে উঠতে সাহায্য করতে হবে। মুশকিল হচ্ছে এখানেও বিপত্তি। সরকার, প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন সরকার নতুন উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বহু পদক্ষেপ নিয়েছে/নিচ্ছে। ভর্তুকির ব্যবস্থা আছে, কম সুদে ঋণ আছে। ‘ইনসেনটিভ’ আছে। কিন্তু তার পরও দেখা যাচ্ছে দেশে সেইভাবে নানা ধরনের শিল্প গড়ে উঠছে না। সবার নজর তৈরি পোশাকশিল্পের দিকে। অথচ এই শিল্পটি ওভার ক্যাপাসিটিতে ভুগছে। প্রতিদিন ছোটো ছোটো অনেক কারখানা বন্ধ হচ্ছে। অন্যদিকে গড়ে উঠছে বড়ো শিল্প। বড়ো বড়ো শিল্পের মালিকরা ঝুঁকেছেন ইকোনমিক জোনের দিকে। কিন্তু দেশে এসএমই খাতে শিল্প গড়ে উঠছে কম। যেসব গড়ে উঠছে, যে গতিতে গড়ে উঠছে তা আশাপ্রদ নয়। অথচ নতুন উদ্যোক্তা হওয়া উচিত ছিল এসব খাতেই। তাহলে দৃশ্যত দেখা যাচ্ছে যেসব কারণ দেখিয়ে উচ্চ আমাদানি শুষ্ক ধার্য করা হচ্ছে তার কোনোটাই বাস্তবায়িত হচ্ছে না। পুরোনো শিল্প দক্ষতা অর্জন করছে না। নতুন শিল্প আসছে না। এদিকে আবার বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার যে নিয়মে আমাদের শুল্ক ধার্য করা দরকার তাও হচ্ছে না। এমতাবস্থায় আমরা দাবি করি একটা জিনিস। প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্য সরকার একটা জরিপ করুক। তাহলে আমরা জানতে পারি, প্রকৃত অবস্থাটা কী? এবং সেই মোতাবেক পদক্ষেপ নেওয়া যায়।
n লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

