ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন ২০২০, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
২৮ °সে

প্রথম পর্ব

জীবনানন্দের 'আট বছর আগের একদিন'

জীবনানন্দের 'আট বছর আগের একদিন'
জীবনানন্দের 'আট বছর আগের একদিন'

জীবনানন্দের আর দশ কবিতার মতো ‘আট বছর আগের একদিন’ও সরল চালু শব্দের আয়োজনে বিশিষ্ট। শব্দের অর্থ বোঝার জন্য অভিধান খুলতে হয় না, বাক্যের পদক্রম বোঝার জন্য দ্বিতীয়বার পড়তে হয় না। বোঝাবুঝির ব্যাপারটা অবশ্য ভিন্ন, এবং তার মাত্রা নির্ণয় করাও সহজ নয়। কিন্তু এ কবিতার কথাগুলো পাঠ করে গেলে কিছু ‘বুঝ’, কিছু ‘অনুভব’, কিছু ‘সিদ্ধান্ত’ মনে সঞ্চারিত হয়—সামগ্রিক বোঝাপড়ার আগেই। কথাটা আরেকটু বিশদ করা দরকার। কবিতার কিছু পংক্তি মনোহর ছবি তৈয়ার করে; কিছু পংক্তি বিশেষভাবে সাঙ্গীতিক আবেশে পাঠককে বশীভূত করে। আর শব্দের অভাবনীয় অন্বয়—কবিতার যা কুলগৌরব—তো থাকেই। ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতা এসব বৈশিষ্ট্যে বিশেষভাবে ধনী। কবিতার সামগ্রিক প্রকল্প—যদি সেরকম কিছু থেকেই থাকে—সম্পর্কে বিশেষ উদ্বিগ্ন না হয়েই এ উপাদানগুলো বিচ্ছিন্নভাবে ভোগ করা সম্ভব।

উপরে যে বৈশিষ্ট্যগুলোর কথা বলা হল, জীবনানন্দের বেশিরভাগ ‘ভালো’ কবিতার ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য। এটা আসলে তাঁর কবিভাষারই মূল স্বভাব, যে ভাষায় কয়েক দশক ধরে বুঁদ হয়ে আছেন বাঙালি কবি-পাঠক, অথচ ভাষাটির কুললক্ষণ সম্ভবত আজও জুতমতো বিশ্লেষিত হয় নাই। ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতা দুই জায়গায় বিশেষভাবে আলাদা। এক. কবিতাটি কাহিনিধর্মী। কাহিনিরেখা অনুসরণ করা যায় বা অন্তত অনুসরণের আমন্ত্রণ আছে, এমন কবিতা জীবনানন্দ-সমগ্রে খুব বেশি নাই। দুই. কবিতাটি সুস্পষ্টভাবে এক দার্শনিক সমস্যা তুলেছে, এবং কাব্যিক আয়োজনের সীমা লঙ্ঘন না করেই কিছু সিদ্ধান্তও জানিয়েছে। ‘মানুষ আত্মহত্যা করে কেন?’ এ জাতীয় প্রত্যক্ষ সওয়াল জীবনানন্দের মতো ‘মননশীল’ কবির কাব্যেও খুব সুলভ নয়। আর এ কবিতার সিদ্ধান্ত জানানোর পদ্ধতিও আলাদা। তাহলে সাকুল্যে কথাটা দাঁড়াচ্ছে এই: সরল-সাঙ্গীতিক-চিত্রময় ভাষায় ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতা একটি কাহিনি বর্ণনা করেছে; সেই কাহিনিতে একটি দার্শনিক সমস্যা ‘যথাযথ’ মাত্রায় চিহ্নিত হয়েছে, অথচ কবিতায় ‘কাব্যময়তা’র টান পড়েনি। সামগ্রিকভাবে বয়ানরীতির কোন কোন গুণে এটা সম্ভবপর হল, তার খোঁজখবর নেয়াই বর্তমান রচনার লক্ষ্য।

২. উচ্চারণভঙ্গির দিক থেকে এ কবিতার সুস্পষ্ট তিন ভাগ। প্রথম ভাগটি শুরু হয়েছে বেশ নাটকীয়ভাবে—আচানক এক অপঘাত-মৃত্যুর খবর দিয়ে। খবরটা অন্যদের কাছ থেকে পাওয়া। ‘শোনা গেল’ কথাটা পরিষ্কারভাবে জনশ্রুতির ইশারা দেয়, যদিও পরের অংশের অনুপুঙ্খ বিবরণীর নিশ্চয়তা ঠিক জনশ্রুতিতে সম্ভব নয়। এ এমন এক মানুষের বয়ান, যে কিনা অনুসন্ধানী প্রতিবেদকের ঔৎসুক্যে আর সক্রিয়তায় পুরো ঘটনার তদন্ত করেছে। এই আত্মহত্যা সম্পর্কে লোকে যা বলে, জনমানুষের মনে যেসব প্রশ্ন-কৌতূহল-সিদ্ধান্ত বিস্ময় ও রহস্যময়তার সঙ্গে মিশে গিয়ে আমজনতার ভাষ্য হিসাবে জারি আছে, তাকে পরম মূল্য দিয়েই বিবরণীটি তৈরি হয়েছে। কিন্তু কবি কথাগুলো নিপুণভাবে সম্পাদনা করেছেন। নিজের ঝোঁক বা পক্ষপাত গোপন করেননি। বলা যায়, দশের এক হয়েই তিনি নিজ দায়িত্বে কথাগুলো উপস্থাপন করেছেন। তাতে নিজের স্বর এতটাই প্রভাবশালী হয়েছে যে, দ্বিতীয় পর্বে যাওয়ার আগে কথাগুলো যে কথক-কবির একান্ত নয় তা মনোযোগেই আসে না।

দ্বিতীয় ভাগটি নিজেকে আলাদা করে নিয়েছে ‘শোনো’ অনুজ্ঞাবাচক ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। শব্দটিকে আলাদা পংক্তির মর্যাদা দেয়ায় পরের তুলনামূলক লম্বা পংক্তির ‘কোনো’র সঙ্গে দারুণ এক অন্তমিলের সাঙ্গীতিকতা পাওয়া গেছে; কিন্তু একই সঙ্গে আলাদা পংক্তির আলাদা অবস্থান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বয়ানধারায় তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে। কথক-কবি এবার নিজের জিম্মায়, নিজের জবানিতে, নিজের কথা বলবেন। বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এ অংশে দুটি ভিন্নতা পাওয়া যায়: অংশটি বিশ্লেষণাত্মক এবং মন্তব্যপ্রবণ। দুটি প্রায় সমান, প্রায় একই গড়নের স্তবক আছে এ অংশে। প্রথমটিতে নৈর্ব্যক্তিক বিবরণীর চেয়ে আত্মহন্তা ব্যক্তির বাস্তবতা প্রাধান্য পেয়েছে। দ্বিতীয় স্তবকে আছে সামান্য বিবরণ, যদিও শেষ পর্যন্ত তা ওই ব্যক্তির পরিণতিতে গিয়েই থেমেছে। দুই স্তবকের শেষ তিন পংক্তি যে একই, আমরা পরে দেখব, তা মোটেই কাকতালীয় নয়।

ছোট দুই স্তবকের শেষ অংশে কবি হাজির হয়েছেন ‘আমি’ হয়ে। ‘আমি’ অবশ্য আগেও আছে। তবে আড়ালে। উত্তম পুরুষের ক্রিয়াপদে। দ্বিতীয় অংশে আছে ‘আমাদের’। দুই বার। শব্দটি ঘোষিতভাবেই আত্মহন্তা ব্যক্তিসহ পুরা মানবসমাজকে কবির প্রকল্পের অংশ করে নেয়। কিন্তু তৃতীয় অংশের ‘আমি’ স্পষ্টতই আলাদা। প্রথম দুই অংশের ‘আমি’ বা ‘আমরা’র ধারাবাহিকতায় এই ‘আমি’কে পাঠ করা মুশকিল। জীবনানন্দের কবিতায় শেষ পংক্তিগুচ্ছ সাধারণত ধারাবাহিকতা রক্ষা করেই শেষ হয়। ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার শেষাংশ বাহ্যত ধারাবাহিক, কিন্তু অন্তর্গত মেজাজে বিপরীত আর শ্লেষাত্মক।

৩. আত্মহত্যার প্রতি এই কথক-কবির দৃষ্টিভঙ্গি কেমন? এক কথায় বলা মুশকিল। আত্মহন্তার পরিণতি প্রকাশের জন্য যে শব্দগুচ্ছ ব্যবহৃত হয়েছে, আলঙ্কারিকতার যে ধরনের এনতেজাম করা হয়েছে, তাতে অনুমোদনের চিহ্ন নাই। এই বিবরণীতে প্রাধান্য পেয়েছে ‘লাশকাটা ঘর’। বিবরণীটিকে ‘বাস্তববাদী’ বলা যায় না। যদি ওই ব্যক্তির পরিবার-পরিজন থেকেই থাকে, এবং পরিজনের সঙ্গে সে ‘প্রেম’ বা ‘আশা’র মতো স্বাভাবিক সম্পর্কে সম্পর্কিত থাকে, তাহলে মৃত্যুর পর আবেগ-অনুভূতির কিছু প্রকাশ হওয়ার কথা। কবি তার ধারে-কাছেও যান নাই। লাশটিকে সোজা নিয়ে তুলেছেন লাশকাটা ঘরে। কবিতাটি যে শুরু হয়েছে লাশকাটা ঘরে, তা দৈবচয়ন নয়। অর্থাৎ এমন নয় যে, শুরু করার অনেকগুলো বিকল্প থেকে কবি যাচ্ছেতাইভাবে একটিকে বেছে নিয়েছেন। বরং এই মৃতের পরিণতিবাচক যে ইমেজ অন্তত বার দুয়েক ব্যবহৃত হয়ে কবিতাটির ভাবগত কাঠামোর একাংশ নির্মাণ করেছে, এ নির্বাচন তার সঙ্গেই সঙ্গতিপূর্ণ। ইমেজটিতে কবি প্লেগগ্রস্ত ইঁদুরের উপমা এনেছেন:

রক্তফেনামাখা মুখে মড়কের ইঁদুরের মতো ঘাড় গুঁজি

আঁধার ঘুজির বুকে ঘুমায় এবার;

কোনোদিন জাগিবে না আর।

বোঝাই যাচ্ছে, এ বিবরণ লাশকাটা ঘরে রাখা লাশের ‘বাস্তব’ বিবরণ নয়। বরং গভীর বাস্তবতা প্রকাশক এক্সপ্রেশনিস্ট ছবি। আত্মহত্যার পরিণতি সম্পর্কে কবির অনুমোদনহীন মনোভাবের বিকট প্রকাশ ঘটেছে এই ছবিতে। অন্যত্র এ ছবিটিই একটু অন্যভাবে ব্যবহৃত হয়েছে:

মর্গে কি হৃদয় জুড়োলো

মর্গে—গুমোটে

থ্যাঁতা ইঁদুরের মতো রক্তমাখা ঠোঁটে!

ততক্ষণে প্রকৃতির আর মনুষ্যেতর প্রাণীর গভীর জীবনতৃষ্ণার একরাশ উদাহরণ দেয়া হয়ে গেছে। বিপরীতে স্থাপিত হয়েছে এক জীবনবিমুখ ব্যক্তি। তার উদ্দেশ্য ছিল—হয়ত—মরে গিয়ে বাঁচা। কিন্তু উপরের বাঁকাহাসিমাখা ছোট্ট পংক্তি তিনটি পরিষ্কার সাক্ষ্য দেয়—অন্তত কথক-কবির বিবেচনায়—সে লক্ষ্য হাসিল হয় নাই।

তার মানে এ নয়, এই নিপুণ কথক লোকটির মুক্তিলাভের উদ্যমকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন। বরং ঘটেছে তার উল্টো। এই শোচনীয় পরিণতির কথা লোকটির অজানা ছিল না। তবু একগাছা দড়ি হাতে সে এগিয়ে যায় মরণের দিকে। তার মানেই হল, তার ‘মানবীয় পরিস্থিতি’ জীবন চালিয়ে নেয়ার উপযোগী ছিল না। পরম যত্নে ও কুশলতায় কবি এই পরিস্থিতির ভাষ্য তৈয়ার করেছেন।

তিন দফায়। কবিতাটির যে তিন অংশের কথা আগে বলা হয়েছে, তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই পরিস্থিতি বর্ণিত হয়েছে। প্রথমাংশের বর্ণনা কতকটা অনিশ্চিত মেজাজের, আর রহস্যময়। বলা হয়েছে, লোকটি হয় বহুদিন নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছিল, অথবা এইমাত্র ঘুম থেকে জেগে পঞ্চমীর চাঁদের আলোয় ‘ভূতে’র মন্ত্রণায় আত্মহত্যার প্ররোচনা পেয়েছে। যে মন্ত্রণা বস্তু-পৃথিবী অথবা যুক্তির দুনিয়া থেকে পাওয়া নয়, যে অনুভবের জন্ম ব্যক্তির বোধ-বোধির অতল গভীরে, সেই বিমূর্ততা ছবিতে মূর্তিমান হয়েছে ভূতের কারসাজিতে। ভূত আছে এবং নাই; ভূত দেখা যায় এবং দেখা যায় না। যে ব্যক্তি আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে, এবং দৃশ্যত—আমরা পরে দেখব—কোনো কারণ ছাড়াই, তার মন ভূতগ্রস্ত তো বটেই। কিন্তু জীবনানন্দ কথাটা বলেন ছবি বানিয়ে। ছবিতে বস্ত-দুনিয়ার কায়দা-কানুন অক্ষুণ্ণ রাখেন। বাস্তবের যুক্তি অনাহত রেখেই ছাড়িয়ে যান চেনাজানা বাস্তবের সীমানা। যেমন ভূত দেখার ইনতেজাম করলেন তিনি জ্যোৎস্নায়, যাকে রহস্যময় আলোজনিত বিভ্রম ভাবার যথেষ্ট সুযোগ আছে; আর জ্যোৎস্না মিলিয়ে যাবার পর আমদানি করলেন নতুন বিস্ময়:

চাঁদ ডুবে চলে গেলে—অদ্ভুত আঁধারে

যেন তার জানালার ধারে

উটের গ্রীবার মতো কোনো-এক নিস্তব্ধতা এসে।

‘অদ্ভুত’ কথাটা কর্তার মনোভঙ্গির দিক থেকে পাঠযোগ্য, কিন্তু এর বস্তু ও বাস্তব গুণও উপেক্ষণীয় নয়। এইমাত্র জ্যোৎস্নায় গত হয়েছে, রেশ এখনো মিলিয়ে যায়নি; সে রেশের অবশেষ আঁধারের রূপকে করে তুলতে পারে বিভ্রমময়। এই বিভ্রমে মূর্তিমান হতে পারে বিমূর্ত ‘নিস্তব্ধতা’—উটের গ্রীবার বেশে। জীবনানন্দের এই বিখ্যাত উপমা নিয়ে অনেক কথা বলা হয়েছে। এখানে শুধু নিস্তব্ধতায় প্রাণযোগের কথা বলতে চাই। সশব্দ হয়ে ওঠার কথা বলতে চাই। [তুলনীয়: শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে।] এই নিস্তব্ধতা চলে এবং বলে। লোকটির অন্তরের সপ্রাণ অস্তিত্ব মরণের বার্তা নিয়ে আসে। দ্বিতীয় অংশে লোকটির আত্মহত্যাকালীন পরিস্থিতির যে পরিচয় আছে তা মেজাজের দিক থেকে নিশ্চিত, কিন্তু খুব যে স্পষ্ট তা বলা যাবে না। বিবরণীটিতে সাধারণীকরণের ঝোঁক পরিষ্কার:

অর্থ নয়, কীর্তি নয়, স্বচ্ছলতা নয়—

আরো এক বিপন্ন বিস্ময়

আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে

খেলা করে;

আমাদের ক্লান্ত করে;

এ ব্যক্তি, দেখা যাচ্ছে, সে গোত্রের যারা অস্তিত্বের গভীরে বিপন্নতা বোধ করে, যাদের অপ্রতিরোধ্য ক্লান্তির ভার বইতে হয়। কবিতার তৃতীয় অংশ সাক্ষ্য দেয়, মানুষমাত্রই এ বিপন্নতা, এ ক্লান্তির অংশীদার নয়। কেউ কেউ এই দুর্বহ নিয়তির ভাগিদার হয়। ওই নিয়তির দায় মেটাতে গিয়েই অর্থহীন পরিণতি মেনে নিতে বাধ্য হয়। লাশকাটা ঘরে প্লেগগ্রস্ত ইঁদুরের পরিণতি মেনে নিয়ে সে হয়ত অধিকতর শোচনীয় জীবিতদশার সাথে আপসরফা করে। তার আত্মহনন তখন শুধু বৈধই হয় না, প্রয়োজনীয়ও হয়ে ওঠে।

৪. দেখা যাচ্ছে, এ কবিতার পক্ষ-বিপক্ষ শুধু জোরালোই নয়, প্রয়োজনীয়ও বটে। এই বৈপরীত্যের—দ্বন্দ্বমূলকতার—ভাবগত দিক আছে, শৈলীর দিকও আছে। বিশেষভাবে উল্লেখ করা দরকার, পুরো কবিতার শরীরী ও অন্তরের প্রতিভা দাঁড়িয়ে আছে এই দ্বন্দ্বমূলক উপস্থাপনার বিচিত্র বিন্যাসের ভিতে। প্রথমে শরীরী প্রতিভার দিকে নজর দেয়া যাক।

প্রথম স্তবকেই আমরা পঞ্চমীর চাঁদ ডুবে যাওয়ার সংবাদ পাই। আট বছর আগের ওই ‘দিন’টি অমাবস্যার হতে পারত, এমনকি পূর্ণিমারও। চাঁদের বা দিনের আলোয় আত্মহত্যা বিশেষভাবে না-জায়েজ নয়। তবে এ কবিতায় কাজটা গলায় দড়ি দিয়ে করার বিশেষ দরকার ছিল। উদ্বন্ধনে মৃত্যু হলে শরীর বিকৃত হয়। কবি মৃতদেহের ইমেজে যে বীভৎস কারুণ্য ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন, তার জন্য এ ধরনের বিকৃতি সম্ভবত সহায়ক হয়েছে। ঘোর গ্রামে অশ্বত্থ গাছের ডালে ঝুলে পড়ার জন্য অন্ধকারের আড়াল দরকার হওয়ার কথা। কবি বেছে নিয়েছেন এমন তিথি যখন জ্যোৎস্নার ‘ভূত’ আর ‘প্রধান আঁধার’ দুইই পাওয়া যায়। এ কবিতায় দুটিই নিঃশেষে ব্যবহৃত হয়েছে।

চাঁদ ডুবে গেলে পরে ‘মরিবার সাধ’ হওয়াকে আলো-আঁধারের প্রথানুগ ব্যবহার বলা যায়। তবে এ ব্যাপারে স্থির সিদ্ধান্ত নেয়ার উপায় নাই। জীবনানন্দের অন্য অনেক কবিতার তুলনায় এ কবিতা কম বর্ণিল। সাদা-কালো ছবিই বেশি। এর মধ্যে সোনালি রঙের ব্যবহার আছে দুবার: ‘সোনালি রোদের ঢেউয়ে উড়ন্ত কীটের খেলা ...’ এবং ‘জোনাকির ভিড় এসে সোনালি ফুলের স্নিগ্ধ ঝাঁকে ...’। দুটিই মনোরম ছবি। গ্রাম-বাংলার নিত্য অভিজ্ঞতার সাপেক্ষে ছবি দুটি খুবই বাস্তবসম্মত, আবার উপস্থাপনার সরল মুনশিয়ানায় দারুণ কাব্যিক। আমাদের জন্য এখানে জরুরি তথ্য হল, রঙিন দুটি ছবিতেই আলোক উজ্জ্বলতা জীবনের জয়গান প্রচার করেছে। আলোর এ ব্যবহার শুধু কাব্যজগতেই প্রথাগত নয়, দৈনন্দিন ভাষার জগতেও সুলভ। কিন্তু জীবনানন্দ এরকম সরল সমীকরণে ভাবতে দেন না। বরং চিন্তার এ ধরনের সরল কোনো সূত্র যদি জমে উঠতে চায়, তাকে বিস্রস্ত করে দিয়েই এগিয়েছে কবিতাটির বয়ান। লোকটি চাঁদ-ডোবা অন্ধকারে মৃত্যুর নিস্তব্ধতা দেখেছে, আর জ্যোৎস্নায় দেখেছে ভূত—এ দুই তথ্যই সরল কোনো সমীকরণের সম্ভাবনা শেষ করে দেয়। তবে ছকটি জটিলতর হয়ে উঠেছে অন্ধকারে জীবনোল্লাস প্রকাশের দুই আয়োজনে মধ্য দিয়ে। একটি আয়োজন মশাকে ঘিরে। মশারির বাধা ডিঙানোর জন্য মশাদের সামষ্টিক সংগ্রাম উপস্থাপিত হয়েছে আঁধারে সংঘটিত জীবনের আলো হিসাবে। অন্য উদাহরণটি পেঁচার। আমরা পরে দেখব, পেঁচার দৃষ্টান্ত কবিতাটিতে নির্মিত বাস্তবতা ও যুক্তি-উপস্থাপন-শৈলীর অনন্য নমুনা হিসাবে পাঠযোগ্য। আপাতত বলা যাক, চাঁদ-ডোবা অন্ধকার ওই ব্যক্তির জন্য মরণের বার্তা বয়ে আনতেও পারে, অন্য অনেক অস্তিত্বের জন্য স্থবিরতার কারণ হতে পারে, কিন্তু পেঁচার জন্য তা সর্বার্থেই আশার স্মারক। আলো পেঁচার শত্রু—এই সাধারণ সত্য কবিতার আর-আর আবহের সঙ্গে মিলিয়ে নির্মিত হয়েছে বৈপরীত্যের তাৎপর্যপূর্ণ ছবি।

অন্তরের সত্যের দিক থেকেও কবিতাটির উপস্থাপনা গভীরভাবে দ্বন্দ্বমূলক। প্রথম চার স্তবকে মৃত্যুর ফিরিস্তি শেষ করেই কবি প্রবেশ করেছেন জীবনোল্লাসের তালিকায়। এখানে পেঁচা, ব্যাঙ, মশা, মাছি, ফড়িং, অশ্বত্থ গাছ আর জোনাকির কথা আছে। প্রতিটি ছবিই প্রাত্যহিক বাস্তবের নিপুণ বিবরণী। নির্বাচিত জুতসই বিশেষণের প্রয়োগে ছবিগুলো বিচিত্র ‘বিকীর্ণ জীবনে’র কথা বলে। জীবনানন্দের কবিতার একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য এই—তিনি অবলম্বন করেন নিত্যদিনের বাস্তব, আবিষ্কার করেন বাস্তবের সূক্ষ্মতম বৈশিষ্ট্যজ্ঞাপক সত্য, আর আবিষ্কৃত ওই বিশেষ থেকে পৌঁছান সার্বিক সিদ্ধান্তে। এরকম সার্বিক সিদ্ধান্তজ্ঞাপক একটি মন্তব্য এই:

যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের—মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা

এ পংক্তির ‘ফড়িং’ ও ‘দোয়েল’ বিপুল-সংখ্যক প্রাকৃতিক উপকরণ ও মনুষ্যেতর প্রাণীর ডাকনাম মাত্র; আর ‘মানুষ’ কথাটা আত্মহন্তা ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য থেকে পাওয়া সার্বিক সত্তা। যে বৈপরীত্য আর দ্বন্দ্বমূলকতার ঢঙে আগের বিবরণীটি তৈরি হয়েছে, সিদ্ধান্তবাক্যটিও নির্মিত হয়েছে সে একই ঢঙে। জীবনানন্দের কবিতায় ড্যাশের প্রাচুর্যের অন্যতম প্রধান কারণ ‘বিশেষ’কে উপস্থাপনার চাপ। তিনি সিদ্ধান্ত নিতে চান যৌক্তিকভাবে, অভিজ্ঞতাবাদীদের মতো বিপুল তথ্য-উপাত্ত থেকে। তাই উদ্ধৃত তথ্য-উপাত্তের পাশে রেখে দেন ড্যাশের নীরবতা, যা না-বলা সমধর্মী অনেক তথ্যের প্রতিনিধিত্ব করবে। যখন বলা হয়, ‘নারীর হৃদয়—প্রেম—শিশু—গৃহ—নয় সবখানি’, তখন আসলে পরের সিদ্ধান্তের জন্য একটা ভিত্তিবাক্য তৈয়ার হয়। এ ভিত্তিবাক্যের নামশব্দ চারটি ভিত্তিহীন নয়। ওগুলো এসেছে কবিতার আগের অংশের বয়ান থেকে। কিন্তু তবু সার্বিক সিদ্ধান্তের জন্য উপাদান চারটিকে কবি যথেষ্ট মনে করেননি। প্রতিটির ডানে ড্যাশ বসিয়ে তৈরি করেছেন পরিসর, যেখানে সমধর্মী অনেক অকথিত উপাদান নৈঃশব্দ্যের মধ্যে অবস্থান করে।

বাকী অংশ আগামীকাল . . .

ইত্তেফাক/আরএ

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
০৬ জুন, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন