সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশের জরিপের ফলাফল নিয়ে এক সংবাদ চোখে পড়ল মঙ্গলবার। আর তারপর আগ্রহী হয়ে দেখলাম তাদের করা 'Child Perception Survey on COVIDE 19: Impact on Children' শীর্ষক জরিপের উদ্দেশ্য এবং ফলাফল। কিন্তু দেশের বাকী মানুষের মতই আমার মনেও বিষয়টা নিয়ে উকি দিয়েছে বেশ কিছু প্রশ্ন। যে কোন গবেষক এই পূর্ণ জরিপ দেখলে তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরির পাশাপাশি কিছুটা বিভ্রান্ত হবেন। শুধু গবেষকেরাই নয়, এই জরিপ ও তার ফলাফল বিভ্রান্ত সৃষ্টি করছে সাধারণ মানুষের মনেও।
প্রথমত, নমুনায়ন নিয়েই গবেষণার সততা সম্পর্কে আমার মনে প্রশ্ন ওঠে। নমুনায়ন বা sampling সম্পর্কে যাঁর সাধারণ ধারনাও রয়েছে তিনি বুঝবেন যে পুরো দেশের শিশুদের homogeneous বা এক শ্রেণিভুক্ত ধরলেও অন্তত ৩৮৪ টি নমুনা লাগবে। ১০-১৮ বছর বয়সী শিশুদের মধ্য থেকে মাত্র ১২১ জন শিশুকে ফোনের মাধ্যমে প্রশ্ন করে গবেষক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তিনটি গুচ্ছে ভাগ করে ৩ গুণ বেশি নমুনা হবার কথা তা না হয়ে কমে গেলো কী করে? আর সে কারণেই প্রথম ধাপেই গবেষণাটি তার বিশ্বস্ততা হারিয়েছে বলে আমি মনে করি।
দ্বিতীয়ত: গবেষকের রিপোর্ট অনুযায়ী তথ্য সংগ্রহের জন্য গবেষক শহরের বস্তি এলাকা, চা বাগান এবং বঞ্চিত গ্রামীণ অঞ্চলের (কোন তথ্যের ভিত্তিতে কোন কোন অঞ্চলকে গবেষক বঞ্চিত বললেন তার কোন ব্যাখ্যা রিপোর্টে উল্লেখ নেই)। অর্থাৎ পুরো দেশের শিশুদের ৩ টি cluster বা গুচ্ছে ভাগ করেছেন আর সেই তথ্যকে সাধারণীকরণ বা generalise করেছেন। যা কোনভাবেই দেশের সার্বিক শিশুদের অবস্থা হতে পারে না।
তৃতীয়ত: প্রতিষ্ঠানটি দাবি করছে গবেষকের করা প্রশ্ন শিশুবান্ধব ছিল। 'শিশুটি পরিবার থেকে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার কিনা?' ফোনের মাধ্যমে সরাসরি করা এই প্রশ্ন কতোটা শিশুবান্ধব তা আমার কাছে বড় প্রশ্ন।
চতুর্থত: শিশুদের কাছ থেকে ফোনে পাওয়া তথ্য আসলে কতোটা নির্ভুল? ফোনটি কে এনে শিশুর হাতে দিলো বা শিশুর সামনে তখন কেউ দাঁড়িয়ে ছিলো কী? সেটাও তথ্যের নির্ভুলতা যাচাইয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট এলাকার সরকারি সংস্থা যারা ত্রাণকার্যে নিয়োজিত তাদের সঙ্গে শিশুদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের সত্যতাও যাচাই করা হয়নি অর্থাৎ cross check করা হয়নি।
পঞ্চমত: 'শিশুটি ত্রাণ পেয়েছে কী?' এটি কি নির্ভুল প্রশ্ন? শিশুর নামে কখনো ত্রাণ ইস্যু হয়? শিশুর পরিবার ত্রাণ পেয়েছে, নাকি পায়নি; এটি কি শিশু সবসময় জানতে পারে? অথবা তথ্যটি সঠিক কিনা তা কি যাচাই করা হয়েছে?
ষষ্ঠত: গবেষকের প্রশ্ন এবং শিশুর জবাব অনুযায়ী ৬৭ ভাগ পরিবারের আয় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে । ৬৪ ভাগ শিশু ফোনে জবাব দিয়েছে যে তাদের ঘরে তীব্র খাদ্য ঘাটতি আছে এবং ৮৭ ভাগ পরিবারের কাছে সরকার বা বেসরকারি কোন তরফ থেকে কোনরকম সাহায্য সহযোগিতা পৌছায়নি। তাহলে ২ মাসের মতো সময় না খেয়ে তারা বেঁচে আছে কী করে? এরকম গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য প্রতিষ্ঠানটি কোনরকম যাচাই না করে প্রচার করে দিলো? এতো রীতিমতো শুভংকরের ফাঁকি। এবং এই তথ্য থেকেই প্রাপ্ত ফলাফলকে সংগঠনটি পুরো দেশের ফলাফল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন!
একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের একটি জাতীয় পর্যায়ের গবেষণায় এরকম অসংগতি গবেষণার উদ্দেশ্য নিয়ে কেবল প্রশ্নই নয় জনমনে প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করছে। সেভ দ্য চিলড্রেনের কাছ থেকে আরো গুণগত মানসম্পন্ন গবেষণা ও জরিপ ফলাফল আশা করছি।
আরো পড়ুন: করোনা: ৬৪ ভাগ শিশুর মতে কঠিন খাদ্য সঙ্কটে আছে তাদের পরিবার
লেখক: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং গবেষক।
ইত্তেফাক/আরএ
