তিন.
প্রফেসরের দরজায় হঠাৎ ঠক্ ঠক্ ঠক্! কেউ একজন নক করছেন।
আসতে পারি, প্রফেসর রিচার্ড?
হু’জ দেয়ার? ওহ, ইন্সপেক্টর হুক! আসুন, আসুন ইন্সপেক্টর, আমি জানি আপনি আসবেন। অন্তরঙ্গ সুরে বললেন প্রফেসর কিম রিচার্ড। বললেন বটে, তবে তার মুখ দেখে মনে হয়নি যে তিনি খুব একটা খুশি হয়েছেন। বরং হুক লোকটা ঢুকবার আগেই তিনি স্বগতোক্তির মতো করে বললেন, গুড়ের গন্ধ পেয়ে পিঁপড়ে ঠিক হাজির।
প্রায় ছ’ফুট উচ্চতা, পাকা কলার মতো গায়ের রঙ, নাকের নিচে পুরু গোঁফ, গালের ডান দিকে একটা কাটা দাগ, সম্ভবত ক্ষুরের পোঁচ হবে, প্রফেসরের রুমে এমন একজন ঢুকলেন।
প্রফেসর কিম তাকে পরিচয় করিয়ে দেবার আগেই তিনি গোঁফের ফাঁক দিয়ে মুচকি হেসে বললেন, আপনি নিশ্চয়ই মিস্টার অলোকেশ রয়? প্রাইভেট ডিটেকটিভ ফ্রম বাংলাদেশ!
কথা শুনে অলোকেশের আক্কেল গুড়ুম! এই গালকাটা ব্যাটা তার পরিচয় জানলো কী করে! জ্যোতিষী নাকি! আবার মনে মনে একটুখানি খুশিও হয় অলোক। তার মানে তিনি একেবারে ফেলনা কেউ নয়! মেলবোর্ন পুলিশও তার খবর রাখে, হয়তো ডিটেকটিভ হিসেবে তাকে সমাদরও করবে। এই হলো ইন্টারন্যাশনাল এক্সপোজারের সুবিধা। দেশ পেরিয়ে বাইরেও তখন সুনাম-সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।
ইয়েস, আই অ্যাম। হ্যান্ডশেক করতে করতে বলল অলোকেশ।
হেসে ওঠে প্রফেসর বললেন, বেশ বেশ, আপনারা দেখছি একে অপরকে চেনেন। কিন্তু কী করে ইন্সপেক্টর হুক? আগে কোথাও দেখেছেন একে?
না না, মিস্টার কিম। আমি এর খোঁজে আইভান হো’র চেরি স্ট্রিটে গিয়েছিলাম। সেখান থেকেই খবর পেলাম যে উনি আপনার এখানে এসেছেন। ছোট্ট সাবার্ব হাইডেলবার্গ, এখানে সবাই সবার খবর রাখে আপনি জানেন প্রফেসর।
কিন্তু হঠাত্ আমার এই ভিনদেশি বন্ধুটিকে আপনার কী দরকার পড়লো মিস্টার হুক! বললেন প্রফেসর কিম। তিনি জানেন ওর আগমনের কারণ, তারপরও ইন্সপেক্টরকে একটু বাজিয়ে নিলেন!
হাহা করে হেসে উঠলেন ইন্সপেক্টর হুক। বললেন, দ্যাট নোজলেস ম্যান। মানে নাককাটা লোকটা। ভয়ের ব্যাপার কী জানেন প্রফেসর, লোকটা নিজের পরিচয় দিতে পারছে না। সে নাকি সব ভুলে গেছে। এমনকি, নিজের নামটাও তার মনে নেই। এমনটা কি হতে পারে! বিস্মিত ইন্সপেক্টর হুক। পুরোনাম উইনজি গ্রোভার হুক।
মনোযোগ দিয়ে দুজনের কথা শুনছেন ডিটেকটিভ অলোকেশ। তিনি এখানে স্রেফ পেপার প্রেজেন্ট করতে এসেছেন, আগবাড়িয়ে নিজের নাক না গলানোই ভালো। অলোক তখনও টেরই পাচ্ছেন না, সেই নাককাটা লোকটাকে নিয়ে তিনি কী বিষম বিপদে পড়তে যাচ্ছেন!
প্রফেসর কষা গলায় বললেন, আপনি কি এ ব্যাপারে আমার মতামত জানতে চাইছেন, নাকি নিজের মত জাহির করতে এসেছেন বলুন তো ইন্সপেক্টর হুক!
কিমের কথা শুনে মনে হল এই হুক লোকটাকে তার মোটেই পছন্দ নয়। কিন্তু তিনি পুলিশের লোক, তাই চট করে তাকে ঝেড়েও ফেলতে পারছেন না। একেই বলে ‘ডিস্টারবিং কমপ্যানিয়ন’ বা ‘আনওয়ান্টেড গেস্ট’। না গেলা যায়, না যায় ওগড়ানো।
না না প্রফেসর, আমি কেন মিছে আমার জ্ঞান জাহির করবো। আপনি কী মনে করেন কিম, এটা কি আদৌ সম্ভব! একটা লোক রাতারাতি তার নিজের নাম ভুলে গেল!
সম্ভব। ভেরি মাচ পসিবল ইন্সপেক্টর। গম্ভীরভাবে মাথা নাড়লেন প্রফেসর। বিচিত্র এই দুনিয়ায় হরেকরকম কাণ্ড ঘটে। এর কতটুকুই বা আমরা জানতে পারি, বলুন মিস্টার হুক।
এটা কি কোনো অসুখ, প্রফেসর কিম? ফের জানতে চান ইন্সপেক্টর হুক। অলোকেশ মন দিয়ে এদের কথোপকথন শুনছেন আর নিজের মগজে টুকে নিচ্ছেন। পরে হয়তো কাজে লাগবে। বস্তুত, গোয়েন্দাগিরি মানেই মন দিয়ে শোনা, যতটা সম্ভব সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ আর তারপর কগনিটিভ অ্যানালজি খাটিয়ে চোখ আর মনের বিবাদভঞ্জন, অর্থাত্ বিষয়ের গভীর ও যৌক্তিক পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা। অলোকেশ বসে বসে তাই করছেন। হুক আর কিমের বাদানুবাদ রেকর্ড করছেন মগজে।
অসুখ বললে অসুখ। ডিমেনশিয়া বলতে পারেন। যাকে বলে আংশিক বা স্বল্পকালীন মস্তিষ্ক-বিভ্রম। এটা দীর্ঘদিনের রোগের কারণে হয়ে থাকে। মানুষ তার চিন্তায়, মননে ও আচরণে অসংগ্ন হয়ে পড়ে। স্মৃতিশক্তির পাশাপাশি তার ভাবনার ক্ষমতাও হ্রাস পায়।
আর কোনো লক্ষণ বা কারণ? ফের জানতে চান ইন্সপেক্টর হুক। যেন তিনি এক সিটিংয়েই পুরো হিউম্যান সাইকো-প্যাথলজি শিখে ফেলবেন।
হতে পারে ইন্সপেক্টর হুক। এই যেমন ধরুন কারো মাথায় চোট পেলে বা কিছু কিছু ওষুধের ওভারডোজ হলে মানুষের স্মৃতিবিভ্রম ঘটে। স্বল্পকালীন মেমরি লস। এই রোগের নাম অ্যামনেজিয়া। এর জন্য কোনো দীর্ঘকালীন রোগের দরকার হয় না।
কিছু একটা বলবার জন্য আঁকুপাঁকু করছেন অলোকেশ। সেটা লক্ষ্য করে প্রফেসর বললেন, মিস্টার রয়, তুমি কিছু একটা বলবে মনে হয়!
ইয়েস মিস্টার কিম। আবার এমনও হতে পারে, কেউ হয়তো ইচ্ছে করেই ভুলে যাবার ভান করলো। যাকে বলে অ্যাক্টিং। হয়তো সে চাইছে না, পুলিশ তার পেট থেকে কথা বের করুক।
কেন, কেন, এমনটা কেন হবে? অমনি হা হা করে উঠলেন ইন্সপেক্টর হুক। সে অপরাধী হতে পারে, তাই বলে পুলিশের চোখে ধুলো দেবে! না, না, এটা কখনও হতে পারে না। হি মাস্ট স্পিক আউট, স্পিক দ্য ট্রুথ।
এমনভাবে হুক কথাটা বললেন, যেন অপরাধীরা সব ধর্মপুত্তুর যুধিষ্ঠির। এরা ক্রাইম করে বটে, তবে মিথ্যেবাদী নয়। মনে মনে হাসলেন অলোকেশ। ইনি যেতেন বাংলাদেশে, তাহলে বুঝতেন মিছেকথা, ফন্দিফিকির কত রকম ও কী কী! সেখানে মানুষ যখন তখন মিথ্যা বলে, দরকার না হলেও বলে, স্রেফ মজা নিতে। পথের দিশা জানতে চাইলে উল্টো দিক দেখিয়ে দেয়, যেনো কাউকে ঠকিয়ে বেশ খানিকটা মনোতুষ্টি পেল।
তারপর ইন্সপেক্টর হুক একটা অদ্ভুত প্রস্তাব করে বসলেন । তিনি বললেন, চলুন মিস্টার রয়, সেই লোকটার সঙ্গে এবার মিট করবেন। সে পুলিশ কাস্টোডিতে আছে। অস্টিন হসপিটালে।
কী যেন ভাবলেন অলোকেশ। এই কেসে তার মাথা গলানো কি ঠিক হবে! বোঝা যাচ্ছে, পূর্বশত্রুতাবশত কাজটা কেউ করেছে। কিন্তু অলোককে কিছু বলবার সুযোগ না দিয়েই প্রফেসর কিম বললেন, চলো মিস্টার রয়, আমিও যাবো তোমার সঙ্গে।
প্রফেসর বললেন বটে, কিন্তু অলোক যেন একা যেতে ঠিক সায় পান না। তিনি মিনমিনে সুরে বললেন, আই হ্যাভ অ্যান অ্যাসোসিয়েট। ক্যান আই কল হার?
হার? আই মিন লেডি ডিটেকটিভ? ইন্টারেস্টিং! চওড়া হাসলেন কিম। শুধুই সহযোগী, নাকি বিশেষ কেউ মিস্টার রয়! কিমের চোখের তারায় মিটমিটে কৌতুক। পুলিশ হলেও লোকটার রসবোধ প্রবল। নাইস! গুড টু সি হিম। মনে মনে ভাবলেন অলোকেশ।
শি মাস্ট বি ইওর গার্লফ্রেন্ড, মিস্টার রয়! আবারও বললেন গ্রোভার হুক।
ওর কথা শুনে অলোক না হেসে পারলেন না। বললেন, ইউ আর রাইট, কিম। শি’জ মাই উড-বি। শি’জ অ্যান আর্কিটেক্ট অলসো।
শি মাস্ট বি ভেরি প্রিটি! মাথা নাড়লেন ইন্সপেক্টর হুক।
উত্তরে অলোকেশ হাসলেন। ইন্সপেক্টর বললেন, নো প্রবলেম মিস্টার রয়। আপনি তার ঠিকানা দিন, এক্ষুণি আমি অফিসার পাঠিয়ে নিয়ে আসছি।
এরপর আর কথা চলে না। তাছাড়া সঙ্গে সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটির প্রফেসর কিম তো রয়েইছেন। এরা অতি উন্নত ও সভ্য জাতি। মিছে তাকে হ্যারাস করবেন না নিশ্চয়ই।
অস্টিন হাসপাতাল। এরা বলে কমিউনিটি মেডিকেয়ার সার্ভিস। খুব সুন্দর দেখতে হাসপাতাল, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, ছিমছাম পরিবেশ। একদম হাউকাউ নেই। রোগী কম, কিন্তু সার্ভিস অনেক। অত্যন্ত দায়িত্বশীল এখানকার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অযথা রোগীদের হয়রানি করা বা বসিয়ে রাখা কিংবা টেস্টফেস্ট করতে বলা হয় না। এই না হলে অস্টিন হসপিটাল!
রাস্তায় জ্যাম নেই। মিনিট দশেকের মধ্যেই উর্বী এসে যোগ দেয় ওদের সঙ্গে। নাককাটা লোকটা জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছে মনে হয়। অলোককে সে চিনতেই পারলো না। কোনো প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেয় না নাককাটা, হয় সে ভুলে গেছে, নয়তো অ্যাক্টিং। কিন্তু অলোকের মন বলছে, লোকটা ফেইক নয়। অর্থাত্ সে অ্যাক্টিং জানে না। তাহলে কেন সে কথা বলছে না! অ্যামনেজিয়া নাকি! তার নাম কী, কোথায় থাকে, কে তার নাক কাটলো- কিচ্ছু বলল না। অলোক শেষে একটা বুদ্ধি বাতলে দিলেন। বললেন, ইন্সপেক্টর, আপনি বরং এক কাজ করুন। ওর একটা ছবি তুলে পেপারে ছেপে দিন। মেলবোর্ন শহরের উপকণ্ঠে খুব ছোট্ট সাবার্ব এই হাইডেলবার্গ। কেউ না কেউ একে নিশ্চয়ই চেনে।
রাইট। একদম ঠিক বলেছো মিস্টার রয়। একমত হন প্রফেসর কিম। এই না হলে বেঙ্গলি ডিটেকটিভ অলোকেশ রয়! বাহবা দিলেন ইন্সপেক্টর হুক। তিনি বুঝতে পারছেন অলোকেশ কোনো এলেবেলে লোক নন, তাহলে প্রফেসর কিমের মতোন মানুষ তাকে ইনভিটেশন দিয়ে ডেকে পাঠাতেন না।
ইন্সপেক্টর গ্রোভার হুক তার এক অফিসারকে ডেকে শহরের সবকটি পত্রিকায় সরকারি খরচে নাককাটার ছবি ছাপতে বললেন। দেখে মনে হয় আহত লোকটা চায়নিজ বা ম্যাকাওয়ের নাগরিক হবে। অবশ্য সে হংকং সিটিজেন হলেও তাতে কিছু আটকায় না। চীনে, হংকং আর ম্যাকাওম্যান, দেখতে মোটামুটি একরকম।
উর্বী হাসপাতালের কেবিনের চারপাশে উঁকিঝুঁকি মারছে। যেন সে কিছু একটা খুঁজছে! কী সেটা?
অলোকেশ মনে মনে চাইছেন, নাককাটার নাকের অবস্থাটা একটু খতিয়ে দেখতে। কিন্তু কী করে দেখবেন! সেখানে মস্তবড় এক পোঁটলা বেঁধে দিয়েছে অস্টিন হাসপাতালের ডাক্তার। আঘাতের ধরন দেখেও অনেক সময় আক্রমণকারীর চেহারা বা চরিত্র বোঝা যায়। ওটা ক্ষুরের পোচ, ব্লেড, নাকি ম্যাশেট বা ভারী ছুরির আঘাত, এটুকু অন্তত জানতে পারলে হত।
প্রফেসর কিমের কাছে কথাটা খুলে বললেন ডিটেকটিভ অলোকেশ। কিন্তু এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়লেন প্রফেসর কিম। অর্থাত্ ওটা সম্পূর্ণ অস্টিন হাসপাতালের নিজস্ব এখতিয়ার। এক্ষেত্রে তিনি কোনোরকম চাপাচাপি বা জোরাজুরি করতে পারেন না। সেটা বেআইনি।
প্রফেসর কিম কিছু করতে না পারলেও অলোকের কপাল কিন্তু ভালই বলতে হবে। একটু পরে ডিউটি ডক্টর এলেন, সঙ্গে নার্স ও জুনিয়র ডাক্তারদের কয়েকজন। এরা হাতেকলমে ডাক্তারি শিখছেন। ইন্টার্ন ডক্টর বোধ হয়।
একটু পর নাককাটার নাকের ড্রেসিং হবে, তাই তার ব্যান্ডেজ খোলা হচ্ছে। মুচকি হাসেন প্রফেসর কিম। তিনি বলতে চাইছেন, একেই বলে মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। নাও মিস্টার রয়, এবার তোমার ইচ্ছে পূরণ করো।
নাককাটার নাকের অবস্থা ভয়াবহ। একেবারে গোড়া থেকে কেউ ওর নাকটা ছেঁটে দিয়েছে। কিন্তু কী মসৃণ আর নিখুঁতভাবে কাজটা করেছে! উর্বী, দেখো দেখো, নিশ্চয়ই খুব ধারালো কিছু দিয়ে ওর নাকটা কাটা হয়েছে। অলোকেশ বললেন।
উর্বীও অলোকের সঙ্গে একমত। পেশাদার কেউ কাজটা করেছে। এ ব্যাপারে প্রফেসর কিমের মনোযোগ আকর্ষণ করেন অলোকেশ। দেখুন প্রফেসর, ভালো করে দেখুন, আজেবাজে কেউ কিন্তু ওর নাক কাটেনি। খুব শার্প কোনো ব্লেড দিয়ে কাজটা করা হয়েছে। হতে পারে সার্জিক্যাল নাইফ।
কী বললে মিস্টার রয়! সার্জিক্যাল নাইফ! তার মানে সে ডাক্তারি জানে! অপরাধী একজন সার্জেন! বিস্ময় প্রকাশ করলেন তিনি।
কথাটা কিন্তু ইন্সপেক্টর হুকও শুনলেন। মাথা দোলান তিনি। ডিটেকটিভ রয় ভুল কিছু বলেননি। আমারও মনে হয় কাজটা যে করেছে, মে বি, সে একজন ডাক্তার।
ব্যথার ওষুধ পুশ করায় নাককাটা লোকটা এতক্ষণ ঘুমোচ্ছিল। ইন্সপেক্টর গ্রোভার হুক অপেক্ষা করছেন তাকে কিছু প্রশ্ন করবেন বলে। ওর ঘুম ভাঙলে নার্স তাকে একটু গরম দুধ আর সুজি খেতে দিলেন। সেটুকু বেশ চেটেপুটে খেলো নাককাটা।
ইওর নেম প্লিজ? প্রথম প্রশ্ন করলেন গ্রোভার হুক।
উত্তর না দিয়ে কোয়ালাছানার মতো চোখ পিটপিট করে তাকায় নাককাটা।
কী হল! বলো, তোমার নাম কী?
নিরুত্তর নাককাটা।
মহা মুসিবতের ব্যাপার তো। মনে মনে ভাবছেন অলোকেশ। আমাদের দেশে হলে দুই থাপ্পড়ে ঝটপট সে মুখ খুলতো। কিন্তু এখানে তো কড়াকড়ি মারামারি চলে না, অ্যারেস্ট হলেও আসামিকে নো রিমান্ড, নো ধোলাই, ওনলি জামাই আদর।
থাকো কোথায়? ফের জানতে চান ইন্সপেক্টর হুক।
এর উত্তরে প্রথমে চুপ থাকলেও পরে সে দুটো উত্তর দেয়। একবার বলে হোবার্ট, আবার বলে ক্যানবেরা। মানে হয়! তাসমানিয়ার রাজধানী হোবার্ট। অনেকটা পথ সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বা উড়ে তারপর সেখানে যেতে হয়। ক্যানবেরা তো আরো দূর। অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী।
ঠিক করে বলো, তোমার বাড়ি কোথায়! ভেতরে ভেতরে খুব চটছেন গ্রোভার হুক। কিন্তু কিছু করতে পারছেন না। একে তো সে অসুস্থ, তাছাড়া গায়ে হাত তোলা বা ধমক দেয়ায় নিষেধ আছে। কমপ্লেন হলে তার চাকরি যাবে। যা করবার আরামসে করো। মগজ খাটিয়ে। পেয়ার সে।
হোয়াট টু ডু নাউ! হাল ছেড়ে দেন ইন্সপেক্টর। প্রফেসর কিমও বেশ বিরক্ত। এ ব্যাটা কথা বলছে না কেন! মুখ ফুটে কিছু না বললে তার উপর হামলাকারীকে পুলিশ ধরবে কী করে!
অলোকেশ ইশারায় বললেন, প্লিজ বি কুল। এভাবে কিছু হবে না। পত্রিকায় ওর ছবিসহ বিজ্ঞাপনটা বেরিয়ে যাক। কেউ না কেউ তাকে শনাক্ত করবেই।
নাককাটা বারবার হাই তুলছে, তার মানে ঘুম পাচ্ছে ওর। আপাতত জেরা শেষ করে অস্টিন থেকে অফিসমুখো হবেন ইন্সপেক্টর হুক। প্রফেসর কিমেরও তাই মত। দেখি, কাল পত্রিকায় নিউজটা ছাপা হলে তার কী রিঅ্যাকশন হয়।
কিন্তু তখনই একজন সিনিয়র ডাক্তার, যিনি নাককাটার চিকিত্সার দায়িত্বে রয়েছেন, তিনি ইন্সপেক্টর হুককে নিজের চেম্বারে ডাকলেন।
কী ব্যাপার ডক্টর, এনিথিং সিরিয়াস?
ইয়েস ইন্সপেক্টর। এই পেশেন্ট, যার নামও আমরা জানি না, তার উপর অনেক অত্যাচার হয়েছে। খুব বাজেভাবে তাকে আহত করা হয়েছে।
তার মানে?
এই দেখুন তার রক্তে আমরা কীসের নমুনা পেয়েছি! ‘প্রোজ্যাক’ বা ‘জারটেক’ জাতীয় ড্রাগস। কারো শিরায় এই ওষুধ বেশি মাত্রায় পুশ করলে সুস্থ মানুষও ভুলভাল বকতে শুরু করে। চাই কি, মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এটা একরকম নারকোটিক ড্রাগস। সহনীয় মাত্রার চেয়ে অন্তত কুড়িগুণ বেশি এই লোকটার শরীরে পুশ করা হয়েছে।
ওহ, তাহলে এই কথা! এইজন্যেই সে আমার কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছিল না। তার মানে লোকটা সত্যি অসুস্থ, সে মোটেও ভান বা অ্যাক্টিং করছে না।
ডিটেকটিভ অলোকেশ এবং প্রফেসর কিম দুজনেই ঘটনাটা শুনলেন। যেই কাজটা করে থাকুক, তার মনে কুচক্র ছিল। নইলে প্রোজ্যাক বা জারটেকের মতোন ভয়ংকর ড্রাগস কেন সে ওর শরীরে পুশ করবে! কিন্তু তার মোটিভটা কী!
কেন সে এই কাজ করলো! মারতে চাইলে গুলি ছুড়ে বা গলা টিপে মারতে পারতো। তা না করে এমন অদ্ভুত উপায়ে তাকে বিবশ করে তারপর নাক কেটে নিলো! ব্যাটা পাগল নাকি!
ইয়েস মিস্টর রয়, আই থিঙ্ক তোমার অনুমান একদম ঠিক। আততায়ী লোকটা নির্ঘাত পাগল। ‘সাইকোপ্যাথ’ হবে নিশ্চয়ই।
চলবে . . .
ইত্তেফাক/আরএ
