১৫জুন, সোমবার সকালে পাকিস্তানে ভারতীয় দূতাবাসের দুই কর্মী, সুলভাদেশ পল আর দাওয়ামু ব্রাহমু হঠাত্ নিখোঁজ হয়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে ক্ষুব্ধ ভারত। রাতে দুই জনকেই মুক্তি দিয়ে পাকিস্তান জানিয়ে দেয়, একটি দুর্ঘটনায় জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে দুই জনকে ইসলামাবাদের পুলিশ আটক করেছিল। ভারতের পালটা অভিযোগ, পাকিস্তানের দাবি বানানো গল্প মাত্র।
দিন কয়েক আগে, দিল্লির পাকদূতাবাসের দুই কর্মীকে ভারত বহিষ্কার করে। এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, গোয়েন্দাগিরি ভারতীয় সেনার তথ্য পাচারের সঙ্গে এরা যুক্ত। দুই পাককর্মীকে ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক জটিলতা বেড়ে ওঠে। ইসলামাবাদ ভারতীয় দূতাবাসের শীর্ষকর্তা গৌরব আহলুওয়ালিয়াসহ বেশ কয়েক জন উচ্চপদস্থ কর্তার ওপর পরিকল্পিতভাবে কড়া নজরদারি আরম্ভ করে। এর পেছনে নাকি আইএসআই। এক দেশে নিযুক্ত আরেক দেশের কূটনীতিকদের হেনস্থা বা তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার কাঙ্ক্ষিত নয়। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের সমতুল্য অপরাধ। অতীতেও পাক-ভারতের মনোমালিন্যের তীব্রতার ছায়া আমরা দুই দেশের দূতাবাসের ওপর পড়তে দেখেছি।
পাকিস্তানি দূতাবাস প্রকাশ্যে কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে বারবার বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা কাশ্মীরের আজাদি আন্দোলনের প্রশ্নহীন সমর্থক। পাকিস্তানের মাটিতে ভারত অনুরূপ আচরণ কখনো করেনি, আড়ালে করে থাকলে, এ ব্যাপারে আমাদের মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। কাশ্মীর সীমান্তে পাকসেনার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন, যখনতখন ওপার থেকে গুলিবর্ষণ, পরিস্থিতিকে ক্রমশ জটিল করে তুলছে। এই যেমন রবিবার (১৪ জুন) রাতে জম্মুর শাতপুর-কেরনি সেক্টরে পাকিস্তানি ফৌজের গুলিতে এক জন ভারতীয় সেনার মৃত্যু, দিনচারেক আগে উরি সেক্টরে ভারতীয় মহিলার হত্যার ঘটনা শুধু উসকানিমূলক নয়, অত্যন্ত অমানবিক। পাকিস্তানি রাষ্ট্রবাদ কবে শিক্ষিত হবে, কবে আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনকে সম্মান জানাবে, লক্ষণ অস্পষ্ট। কর্মহীনতা, করোনার সংক্রমণ ও আঞ্চলিক অসন্তোষে জেরবার দেশটি সীমান্তে সেনাকে উত্তেজিত করে রেখে দৃষ্টি কি ঘুরিয়ে দিতে চায়? এতে সামাজিক ক্ষতের উপশম সম্ভব?
দেশ ভাগের সঙ্গে সঙ্গে প্রখর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মৌলানা আবুল কালাম আজাদের ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়ে উঠছে। বলেছিলেন, পাকিস্তানের ভবিষ্যত্ অন্ধকার। তার অখণ্ডতা টিকবে না। গণতন্ত্র সুনির্মল হবে না কখনো? তার ঐ বয়ানের সত্যতা আজ প্রমাণ করছে—স্বাধীনতার একদশকের মধ্যে সামরিকতন্ত্রের জবরদস্ত অনুপ্রবেশ, মুহুর্মুহু গণ আন্দোলনের দেওয়াল ভাঙার হুমকি, পূর্ববঙ্গ জুড়ে কালো মেঘের ঘনঘটা, গণহত্যা, স্বাধীনতার গণযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের প্রত্যাশিত অভ্যুত্থান—এতসব ঘটনার পরেও পাকিস্তানের রাষ্ট্রনীতি অবিবেচক হয়ে রইল। গণতান্ত্রিকতা কখনো কখনো সাময়িক স্বস্তি তৈরি করলেও তার ওপর থেকে সামরিক বাহিনীর দাদাগিরি বন্ধ হয়নি। প্রমাণ কী? নীরক্ত অভ্যুত্থান ঘটিয়ে নির্বাচিত জুলফিকার আলি ভুট্টোকে অপসারিত করে জেলে আটকে রাখা, জামায়াতে ইসলামির তখনকার প্রধান মৌলনা তোফায়েল আহমেদের ইঙ্গিতে ভুট্টোর ফাঁসি, সংবিধান বদলে নিজাম-এ-মোস্তাফা (ইসলামি শাসনতন্ত্র) চালু করার নিনাদিত প্রতিশ্রুতি, পরপর নির্বাচন বাতিল করে জিয়াউল হকের রাষ্ট্রশাসক হয়ে থাকার আমোঘ খাহেস, রহস্যময় বিমান দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু, বেনজির ভুট্টোর জনপ্রিয় সরকারকে আচমকা হটিয়ে দেওয়া, ক্ষমতায় নাওয়াজ শরিফকে নিয়ে আসা, তাকেও হটিয়ে দিয়ে মঞ্চে সামরিক কর্তা পারভেজ মোশারফের প্রবেশ, লাদাখে উসকানিমূলক যুদ্ধ—এরকম অসংখ্য ঘটনা প্রমাণ করছে, ভেতরে-বাইরে পাকিস্তানের আক্রোশ ও প্রতিশোধের স্পর্ধা অব্যাহত। যে ভুলের ওপর তাকে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন ভারত ছেড়ে করাচি ও ইসলামাবাদে আশ্রিত সামরিক-অসামরিক আমলারা—সে ভুল থেকে, সে সামাজিক বিদ্বেষ থেকে, রক্তক্ষরণ থেকে পাকিস্তানের বুঝি রেহাই নেই!
বিশ্বে আজ দুইটি রাষ্ট্র সর্বাধিক খতরনাক বলে নিন্দিত। চিহ্নিত। একটি ইসরাইল। অন্যটি পাকিস্তান। কাকতালীয় হলেও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ আর প্রতিবেশী বিদ্বেষ ইসরাইলের ক্ষমতার উত্স। তার কারিগরি দক্ষতা প্রশ্নহীন। অভ্যন্তরীণ ঐক্য পশ্চিম এশিয়ায় বিরল দৃষ্টান্ত; কিন্তু তার ভূমিকা ও অভিমুখ ভীষণ কর্কশ। অতিশয় বাণিজ্যিক ও ধ্বংসমুখর। সেমিটিক অভ্যাসের প্রাচীন পরম্পরা সে ছাড়তে পারে নি। গুন্টারগ্রাস চলচ্চিত্রকার গৌতম ঘোষ আর চিত্রকর শুভাপ্রসন্নকে তার শেষ সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, ইসরাইল নিরন্তর যেভাবে পরমাণু বোমা তৈরি করছে, মজবুত করছে তার শক্তিমত্তা, তা বিপজ্জনক। অস্ত্র তৈরির এরকম সন্ত্রাসের শেষ কোথায়?
গুন্টারগ্রাসের প্রশ্ন—তার মৃত্যুতেই কি থমকে গেল? মনে হয় না। ইসরাইলের হম্ব্বিতম্বিতে ভয়ংকরের নৃত্য থামেনি। ঠিক একইভাবে—পাকিস্তান পরমাণু বোমা দেখিয়ে হুমকি দেয় এবং সীমান্তে আকছার অঘটন ঘটিয়ে তৈরি করে স্থায়ী উসকানি। সে চায় এক প্ররোচিত ভারত। চায় তার মতোই সংক্রমিত, বিদ্বেষাচ্ছন্ন ‘ইন্ডিয়া’। বাংলাদেশ হারানোর শোক সে ভুলতে পারেনি। রগে রগে প্রতিশোধের ইচ্ছে প্রায়ই ঝলসে ওঠে। অখণ্ড কাশ্মীরকে নিজের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার স্বপ্ন তার নিছক অভ্যাস নয়, এটি তার স্মিমিত, কখনো উগ্র আকাঙ্ক্ষা। আকাঙ্ক্ষার সংক্রমণ কি ভারতকেও গ্রাস করবে?
নীতিগতভাবে ভারত শান্তিপ্রিয় দেশ। এ পর্যন্ত সশস্ত্র আগ্রাসনে, প্ররোচনা সত্ত্বেও পা দেয়নি। পাকিস্তানের সঙ্গে তার তিনটি যুদ্ধে বা শীতল মস্তিষ্কের শক্তিধর আরেক প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিরোধের লড়াইয়ে কোথাও ভারত প্রথম আক্রমণাত্মকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়নি। এটাই তার মনোবল আর শান্তিময়তার জোর। এ জোরকে কেউ যদি দুর্বলতা ভাবে বা অভ্যন্তরের রাষ্ট্রবাদিতা আর প্রজাতান্ত্রিকতার দূরত্ব মুছে দিতে অতি আগ্রহী হতে থাকে—মারাত্মক ভুল করবে। কেননা ব্যর্থ হবে। ভারত ভারতই থাকবে।
মহাভারতের সূত্র ও তত্ত্বের বিকৃতি অসম্ভব। গান্ধীজি, নেহরু, মৌলানা আজাদ মিশ্র সংস্কৃতি, মিশ্র রাজনীতির স্বপ্নের বীজতলা তৈরি করেছিলেন, বহু ত্যাগ আর বৌদ্ধিক সমন্বয় ঘটিয়ে। গড়ে তুলেছিলেন এমন একটি শক্তপোক্ত ভিত, যার ভেতরে ও বাইরে ফাটল গড়তে চাইলে গর্জে ওঠবে অসম্ভবের কণ্ঠ। এটা যে কী স্বাস্থ্যকর, রোগ উপশমের কী অসামান্য সামাজিক ওষুধ, তা যে কোনো সংকটে, ঘোর বিপর্যয়ের মুহূর্তে বারবার ভারতসত্তায় প্রমাণিত। বাবরি মসজিদের ধ্বংসকাণ্ডের অনুতাপের পরিপ্রেক্ষিতে আজকাল পত্রিকার সম্পাদককে একান্ত সাক্ষাত্কারে লালকৃষ্ণ আদবানি বলেছিলেন, সেক্যুলার ভারত কখনো তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হবে না। সত্য বানিয়ে বলেননি তিনি, মনের সত্যের তালিম সেদিন প্রকাশ করতে ভোলেননি। অবিচল নেতার বয়স বেড়েছে, বেড়েছে তার ভাবনার পরিসর। এরকম চিন্তা-বিচিন্তা ভারতের নানা প্রান্তে, সমাজের নানা স্তরে যে দীর্ঘ ছায়া ছড়াচ্ছে, তা অস্তমুখী নয়। পূর্বমুখী।
অতএব ভেতরের কিংবা বাইরের কোনো ষড়যান্ত্রিক যতই ভুল মতলব কষুক না কেন, ভারতচিন্তা—ভূতপূর্ব মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যাকে ভারতআত্মার বাণী বলতে দ্বিধা করেননি, তার বিনাশ নেই। এটাও ভারতের মনোহর নিয়তি। আমাদের সমাজ, আমাদের সুস্থ রাজনীতি, আমাদের ইতিহাসের মিশ্রধারা এই নিয়তির স ষ্টা এবং নিয়ন্ত্রক। মুখ তার স্বচ্ছ, বার্তা তার সহজিয়া। সহজকে দুরূহ, দুর্বোধ্য করা কঠিন। করোনার মতো আবিশ্ব সংকটও দেশের উচ্চতা আর বৌদ্ধিক সৌন্দয্যকে বিকারগ্রস্ত করতে পারেনি। এটাও আমাদের গর্ব। পাকিস্তান যতই উসকানি বাড়াক, যতই অন্য এক আজন্ম মিত্র দেশের রেজিমেন্টেড শক্তি তার অবস্থান বদলে ভিন্ন প্রবাহ তৈরি করার চেষ্টা করুক না কেন, আখেরে ফায়দা হবে না। জিতবে ভারতের মহত্ম।
রাষ্ট্রবাদিতা আর দেশপ্রেমের লক্ষ্য এক নয়। আলাদা। সমাজ প্রেমের বিস্তার চায়। দাবি করে বিদ্বেষের, উগ্রতার আশু অবসান। সমাজের চাপেই উগ্রতা নাশ হয়ে যায়। এই নাশ থেকে যে দুর্গন্ধ বেরোয়, নির্বিশেষ তার নিকাশ অবশ্যই দাবি করে এবং রাষ্ট্র নির্বিশেষের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হয়। এনআরসি অথবা বিভাজক নাগরিকত্ব আইনকে ঘিরে করোনা-পূর্বে তারুণ্যের এবং মহিলাদের আত্মশক্তির যে সম্মিলিত, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ আমরা দেখেছি, তা নতুন ভারতেরই প্রত্যাশিত সংকল্প। এখানে ফাঁক নেই। ফাঁদ নেই। নেই ক্ষমতামত্ততাকে প্রশ্রয় দেওয়ার কণা অনুকণার চিহ্ন। চিহ্নিত প্রতিবেশীর উসকানিও সব অর্থে ব্যর্থ।
কাশ্মীর-সীমান্তে, বাংলাদেশ হারানোর শোক থেকে ক্ষোভ থেকে প্রতিশোধের নির্গত লাভা তেমনি নিষ্ফল হবে। প্রেম আর শান্তির অভিপ্রায় যেমন নাশ করবে বহির্দেশীয়, অনাকাঙ্ক্ষিত আক্রোশকে, তেমনি ক্ষুদ্রাংশের অভ্যন্তরীণ বড়োত্ব বোধেও ঘা দিয়ে জনসত্তা বুঝিয়ে দেবে, ভারত তার চিন্তার ধারাবাহিকতাকে বজায় রাখতে ঐক্যবদ্ধ। দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
লেখক :ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক, আরম্ভ পত্রিকা
