ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল মনোজ মুকুন্দ জম্মুতে ভারতীয় সেনাদের সীমান্ত প্রস্তুতি খতিয়ে দেখছেন সোমবার। নিয়ন্ত্রণরেখার এপারে ফৌজের অবস্থান আর তাদের বহুমুখী কৌশল সম্পর্কে সেনাপ্রধানকে অবহিত করেছেন বরিষ্ঠ সেনা আধিকারিকেরা।
লাদাখ সীমান্তে চীনের সেনা সমাবেশ হঠাত্ বেড়ে ওঠার পর থেকে জম্মু-কাশ্মীরের সীমারেখায় পাকিস্তান লাগাতার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করতে থাকে। ভারতও পালটা জবাব দেয় এবং পাকিস্তানের অন্যায় আচরণ নিয়ে প্রতিবাদ জানায়। তবু পাকিস্তানি সেনারা থামেনি। জঙ্গিদের উত্পাতও বেড়ে ওঠে। এখানে পাকিস্তানের দুটি কৌশল। করোনা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে উপত্যকার তথাকথিত ‘আজাদি’র সশস্ত্র জঙ্গিদের নতুন করে উসকে দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ‘শীতল যুদ্ধের’ পরিধি বাড়িয়ে তুলতে অনবরত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে। ভারত কূটনৈতিক স্তরে প্রতিবাদ পেশ করেছে। ইসলামাবাদ প্রতিবাদের জবাব দেয়নি। ঘরে-বাইরে তারা চুপ। কিন্তু কৌশলে অতিসক্রিয়।
২০২০ সালে, এ পর্যন্ত পাকিস্তানি ফৌজের হামলায় ১৪ জন ভারতীয় নাগরিক নিহত হয়েছে এবং পাকিস্তানি নিরাপত্তারক্ষীরা ২ হাজার ৪৩২ বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। ২০০৩ সালে দুই দেশ সীমান্ত সংঘর্ষ বন্ধ রাখার বার্তা চাউর করে আন্তর্জাতিক চাপে। ভারত সরকারের বক্তব্য, এর পরেও পাকিস্তান বিরতির শর্ত লঙ্ঘন করে অকারণে বারবার উসকানির আবহ তৈরি করছে।
পরিস্থিতির আরেক দিক, জঙ্গিরা নিরস্ত্র জনগণকে উত্ত্যক্ত করছে। পাথরবাজি আপাতত স্তব্ধ। স্তব্ধতার আড়ালে জয়েশ-ই-মহম্মদি, জামাত-এ ইসলামির ‘ফ্রন্টাল’ জঙ্গি সংগঠন হিজব-এ-মুজাহিন অতিশয় তত্পর হয়ে উঠেছে উপত্যকার উত্তর থেকে দক্ষিণের বিভিন্ন জেলায়। ২০১৮ সালে সেনা-জঙ্গির সংঘর্ষে বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর পর যে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা দেয়, তাতে হিজব-এ-মুজাহিদিনের সশস্ত্ররা কিছুদিনের জন্য আত্মগোপনে চলে যায়। তাদের হয়ে প্রতিবাদ আর বিক্ষোভ দেখাতে থাকে ছাত্র-যুবরা, প্রধানত কিছুসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ছদ্ম নেতৃত্বে। এই লেখক তখন কাশ্মীরে। কাফিউ-হরতালে উপত্যকা অবরুদ্ধ। দিনে জনচলাচলে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা। রাতে জঙ্গিদের নারা। মসজিদ থেকে, গহিন অন্ধকারে নিমজ্জিত গলি থেকে ঘন ঘন প্ররোচনা। এসব আস্ফাালন ফলপ্রসূ হয়নি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিদেশে ছিলেন। ফিরেই ঘোষণা করলেন, ‘আমরা আমাদের যুবকদের মৃত্যু মেনে নিতে পারি না। বিক্ষোভ সমাবেশে ছররা নিক্ষেপ বন্ধ করার কথা ভাবল কেন্দ্র। রাজনাথ সিং (তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে চাইছিলেন। পরে বিষয়টি চাপা পড়ে গেল। ছররা গুলির গর্জন কতটা থামল, বলতে পারে কেন্দ্র। বলতে পারে কাশ্মীরবাসী।
এই পরিস্থিতিতে বহু কাশ্মীরি তরুণের সঙ্গে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের সঙ্গে আমাদের কথা হয়। একদল সরাসরি ক্ষোভ উগরে দিচ্ছিলেন, ‘ভারত কাশ্মীরিদের চায় না। কাশ্মীরের জমি চায়।’ মধ্যমপন্থি আরেক দল, ভারতের নাগরিকত্ব নিয়ে যারা গর্বিত এবং কাশ্মীরে পাকিস্তানের হস্তক্ষেপ নিয়ে শঙ্কিত, ক্ষুব্ধ...তারা সুবিচার দাবি করেছিলেন, কিন্তু জঙ্গিদের ভয়ে মুখ খুলতে পারছিলেন না। তখন যেমন, আজও তেমনি জঙ্গিরা গোপন অভ্যাসে সংগঠিত। আজও সুবিচারপন্থি কাশ্মীরিদের মুখ বন্ধ। আজও সশস্ত্রদের তাপ-উত্তাপ বাড়ছে। দ্বিতীয়ত, পরিবেশ বড্ড বেশি দমবন্ধ। কাশ্মীরি ছাত্ররা উপত্যকা ছেড়ে বিভিন্ন এলাকায়, প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও চিনে ছড়িয়ে পড়ে। করোনা পরিস্থিতিতে নিজ ভূমিতে ফিরে এসেছে। অবরোধ আর হতাশায় ক্রমাগত মানসিক রোগের শিকার হচ্ছে। তাদের নিষ্কৃতি কোথায়? উদাসীনতার কেন্দ্রিকতা, পাকিস্তানের উসকানি, নেতৃত্বহীন রাজনীতির অস্থিরতা, হুররিয়াত কনফারেন্সের আসন্ন ভাঙন, রাজনৈতিক নেতাদের বাধ্যতামূলক গৃহবাস ইত্যাদি দুর্ভেদ্য শেকলের মতো কাশ্মীরি যুবশক্তির গলায় ঝুলছে।
’৮৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ বার কাশ্মীর সফর করেছি। পেশাগত কারণে। প্রতিবারই লক্ষ করেছি, ক্লান্তি আর অবসাদে উপত্যকা ডুবন্ত জাহাজের মতো তলিয়ে যাচ্ছে। লেখাপড়া বন্ধ। বাণিজ্য স্থবির। আয়ের সবচেয়ে বড়ো উত্স পর্যটন প্রায় রুদ্ধ। নাটক-অতিনাটকের রক্তাক্ত মঞ্চায়নের বিরতি নেই।
সংবিধানের বিশেষ রক্ষাকবচের অবলুপ্তি, রাজ্যের মর্যাদা হরণ এবং লাদাখকে বিচ্ছিন্ন করে স্বয়ংশাসিত অঞ্চলে রূপান্তরের পর যাওয়া হয়নি। তবু কী ঘটছে, কী ঘটতে পারে, তা খানিকটা আন্দাজ করা অসম্ভব নয়।
আমরা স্বাধীন কাশ্মীরি সশস্ত্র বা নিরস্ত্র আন্দোলনের সমর্থক নই। হতে পারি না। কেননা, বৃহত্তর কাশ্মীর স্বেচ্ছায় ভারতের সঙ্গে যোগ দেয়। পাকিস্তান তখন প্রথমে হামলা করে। ব্যর্থ হয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেয় এবং গণভোটের দাবি তুলতে থাকে। ভারত বিতর্কিত বিষয়টি নিরাপত্তা পরিষদে পাঠিয়ে দেয়। ভারতের হয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের মঞ্চে জবরদস্ত প্রশ্ন করেন শেখ আবদুল্লাহ এবং তখনকার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কৃষ্ণ মেনন। রাষ্ট্রপুজ্ঞ স্থায়ী সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। আন্তর্জাতিক দুনিয়া মেনে নেয়, জম্মু-কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এরকম পরিস্থিতিতে অধিকৃত কাশ্মীরের ভাগ্য শূন্যে ঝুলতে থাকে। ঐ অংশে পাকিস্তান তার কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেয়, তবু অশান্তি, গণক্ষোভ রুখতে পারেনি। বৃহত্তর কাশ্মীরের প্রবক্তা আমানুল্লাহ খান স্বেচ্ছা নির্বাসন বেছে নেন। কাশ্মীরের ভারতীয় অংশ নিয়ে দিল্লির তখনকার শাসকের আচরণও পরিচ্ছন্ন নয়। শেখ আবদুল্লাহর দীর্ঘ কারাবাস, কাশ্মীরে কংগ্রেসি শাসন কায়েম করার দুর্ভাগ্যজনক চেষ্টা এবং চাপা আগুনকে ঢেকে রাখার বিচ্যুত গণতান্ত্রিকতা বিচ্ছন্নতাবাদীদের ইন্ধন জোগায়। তবু গরিষ্ঠসংখ্যক কাশ্মীরি ভারতের প্রতি, নেহরুর প্রতি, ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি তাদের আস্থা অটুট রেখেছেন। শেখ আবদুল্লাহর মৃত্যু এবং কাশ্মীরে ফারুক আবদুল্লাহর আত্মপ্রতিষ্ঠার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে থাকে। ইন্দিরার একক ক্ষমতাময়তা, ফারুককে সরিয়ে জগমোহনের হাতে রাজ্য শাসনের ভার, জগমোহনকে কেন্দ্র করে উত্পীড়নের অভিযোগ এবং দলে দলে প্ররোচিত কাশ্মীরি পণ্ডিতদের কাশ্মীর ছাড়ার প্রবণতা কেন্দ্রের প্রতি কাশ্মীরিদের অনস্থা বাড়িয়ে তোলে। উত্তর প্রদেশে মোলায়েম সিং যাদবের আমলে বাবরি মসজিদের শীর্ষে গেরুয়া পতাকার সমাবেশ, বিতর্কিত জমিতে রামমন্দিরের শিলান্যাস এবং বাবরি ধ্বংসে কাশ্মীরদের বিশ্বাসে আরো বড়ো ফাটল তৈরি হলো। তখনই প্রধান স্রোতের (মেইনস্ট্রিম পলেটিকস) হাত থেকে রাজনীতি ছিনিয়ে নিতে জন্ম নেয় ‘হুররিয়াত কনফারেন্স’। ১৯৯৩ সালে। পাকিস্তানের ভূতপূর্ব আইএসআইয়ের প্রধান জেনারেল আসিফ স্বীকার করেছেন, হুররিয়াতের জন্মদাতা তারাই, আর তার বিচরণক্ষেত্র শ্রীনগর। একই মঞ্চে নানা সংগঠনের মুখ। প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা এজেন্ডা। সবারই নিজস্ব জঙ্গি সংগঠন রয়েছে। প্রথম দিকে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য নেতা অবশ্যই মৌলবি ফারুক। সুশিক্ষিত, রুচিসম্পন্ন তরুণ। প্রয়াত মিরওয়াইজ মৌলবি ফারুকের ছেলে। কিন্তু চাবিটি তার হাতে ছিল না। ছিল জামাত নেতা অধ্যাপক আলি শাহ জিলানির নিয়ন্ত্রণে। জিলানি তুখোড় নেতা। আপসহীন পাকিস্তানপন্থি। হিজব-এ-মুজাহিদিনের প্রতিষ্ঠাতা। পাকিস্তানে স্বেচ্ছানির্বাসিত সৈয়দ সাহাহ উদ্দিনের ‘মেন্টর’।
সালাহ উদ্দিন সম্ভবত ইদানীং পাকিস্তানের আর বিশ্বাসভাজন নন। কারণ সারেজমিনে হিজব-এ-মুজাহিদিনের নবপ্রজন্মের অতিরিক্ত আবেগতাড়িত জঙ্গিপনা তাকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। আলিশাহ জিলানির বয়স (৯১) হয়েছে। আগের কর্মক্ষমতায় ভাটার টান। তার এককালের অবিসংবাদী নেতৃত্ব হুররিয়তের ঐক্য ধরে রাখতে অক্ষম। মৌলবি ফারুক গৃহবন্দি। ইয়াসিন মালিক জনবিচ্ছিন্ন, অন্তরীণ। পাথরবাজি থেকে সন্ত্রাস হানায় জিলানির যে কোনো বিবৃতিই ছিল যথেষ্ট। সম্প্রতি তার অবস্থান নিয়ে নানা রকম প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। এসব সংগত না অসংগত, আমাদের জানা নেই। বয়সের অজুহাত দেখিয়ে সরে গেলেন। তার স্থলাভিষিক্ত আশরাফ শেরওয়াই অপরিচিত মুখ। তবে পাকিস্তানের একান্ত বিশ্বাসভাজন। সোমবার সকালে তাকে গ্রেপ্তার করেছে প্রশাসন। জিলানির পদত্যাগ আর আশরাফ শেরওয়াইয়ের নির্বাচনে হুররিয়াতে নড়বড়ে ঐক্য কতটা বজায় থাকবে, বলা মুশকিল। এখানেও পাকিস্তানের ভুল অঙ্ক বড় হয়ে উঠবে। অঙ্কের বিভ্রান্তিকর ফলাফল জঙ্গিদের নৈরাজ্যকে ভারী করবে। অস্ত্র তারা সহজে ছাড়বে না। ইসলামাবাদের ইঙ্গিতেই সশস্ত্র, দিশাহীন লড়াই চালিয়ে যাবে।
বর্ষাকাল। বরফ গলছে। বরফের তলার স্ফুলিঙ্গে জ্বালানি জোগাবে ওপারের ক্ষমতামত্তরা। ঘোষিত যুদ্ধবিরতি বারবার লঙ্ঘন করবে। সন্ত্রাসকে চাঙ্গা করার চেষ্টা চালাবে। সহজ গণিতের সহজপাঠ আমরা অনবরত দেখে যাব। দেখে যাব স্তিমিত, কখনো হঠাত্ জেগে ওঠা অসন্তোষের শিখা, উপশিখা।
লেখক :ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক, আরম্ভ পত্রিকা
