খোকাহীন ফাতেমার দৈনপীড়িত জীবন

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২০, ০৯:৪৯

"মনে কর যেন বিদেশ ঘুরে
মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে
তুমি যাচ্ছো পালকিতে মা চড়ে
দরজা দু'টো একটুকু ফাঁক করে।
আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার পরে
টগবগিয়ে তোমার পাশে পাশে। "

কিন্তু হায়! জীবন কবিতার মতো নয়।জীবনের সমীকরণ বড্ড জটিল। আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজ লোকলজ্জার ভয়ে যেটুকুও বা আগলে রেখেছে মা-বাবা কে, নিম্নমধ্যবিত্ত বা নিম্ন আয়ের  মানুষগুলো অভাব অনটনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মা -বাবার প্রতি সেটুকু  সম্মান বা ভালোবাসা তো দূরের কথা দু'বেলা দু'মুঠো ভাতও তাদের দিতে পারছে না।

কবিতায় খোকা যখন মা'কে পালকিতে নিয়ে টগবগিয়ে রাঙা ঘোড়ায় চড়ে বিদেশ যাবার স্বপ্নে বিভোর, সেই সময় বাস্তবের তথাকথিত খোকারা ঠিক যেন তার উল্টো।

জাগতিক মা পালকিতে নয় তক্তাপোশ বিছানায় ভাঙা দরোজার ওপাশে পড়ে রয় নির্বিকার।

ফাতেমা বেগম তেমনি এক হতভাগা মা। ৫ ছেলে ১ মেয়ের জননী হয়েও দিন কাটছে তার বড় অবহেলায় -অযত্নে।  ভেঙে যাওয়া নদীর পাড়ে কোনোমতে টিকে থাকা একটুখানি টিনের ছাপরা ঘরে নিস্তেজ পরে আছে এই অভাগা মা। কোনো সন্তানই রাখে না এই  বৃদ্ধা মায়ের খোঁজ- খবর।

প্রায় ৭০ ছুঁইছুঁই বয়সের ফাতেমা বেগম সারাদিন এপাড়া সেপাড়া হেঁটে যে ক'টা চাল -ডাল কুড়িয়ে পায় তাই দিয়ে চলে তার অন্নভোগ।
রোজকার মতো আজও বেড়িয়েছিলো, হাতে একটা ছরা আর কোমরে পুরনো হয়ে যাওয়া জীর্ণ কাপড়ের একটা পুঁটলি বেঁধে চাল- ডালের  সন্ধানে।
দিনশেষে ক্লান্ত ফাতেমা বেগম ঘরে ফিরেছেন ঠিকই কিন্তু বয়সের ভারে অভাবগ্রস্ত নুয়ে পড়া শরীরটা আর পারেনি ক'টা চাল ফুটিয়ে দু'টো সিদ্ধ ভাত করে নিতে।
আমাদের কথা হচ্ছিল  মাগরিবের আযানের  সময় তখনও তিনি অভুক্ত। পাশে থাকা এক প্রতিবেশী বলল,একটু উঠে বসেন,আপা আপনের ছবি তুলবে।
আমার ডান হাতটা লতার মতো জড়িয়ে উঠে বসলেন।তুই সম্বোধনে জানতে চাইলেন, আমি কোথা থেকে এসেছি আর  তার ছবি তুলেই বা কি করবো? বললাম,  তেমন কিছু করবো না, আপনার সাথে শুধু  একটু গল্প করতে চাই।

বৃদ্ধা শুরু করলেন নিজের দুঃখ ভারাক্রান্ত জীবনের সাতকাহন। স্বামী সেকেন্দার মুন্সি অনেক আগেই দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে পাঁচ ছেলে এক মেয়ের ভরসায় রেখে গেছেন স্ত্রী ফাতেমা বেগম  কে। কিন্তু কপাল পোড়া হলে যা হয়। সেই ভরসায় আজ কেবলই তেপান্তরের মাঠের মতো ধূ ধূ বালুচর। ভাত কাপড় তো দূরের কথা চোখের দেখাও দেখতে আসেনা কোনো ছেলেমেয়ে।

পাবনা জেলার বেড়া থানার মোহনগঞ্জ এর পাইকান্দি গ্রামে বন্যার অথৈ পানিতে একটা টিনের ছাপরা ঘরে একাকী জীবন কাটছে বৃদ্ধা এই মায়ের। ঘরের শিথানে সরকারি কয়েকটা বালির বস্তা ফেলে রাখা হয়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য। কিন্তু আর একটু বৃষ্টি এবং বন্যার প্রকোপ বাড়লেই যে-কোন মুহূর্তে বৃদ্ধার নামেমাত্র ঘরখানা ডুবে যাবে যমুনার অথৈ পানিতে। হয়তো একদিন ঘরে ফিরে  বৃদ্ধা দেখবে যেখানে এসে বিশ্রাম নিতো, একটু গা জুড়াতো সেই শেষ আশ্রয়টুকুও নদীতে ভেসে গেছে আর ভাগ্য যদি হয় আরও নির্মম তাহলে হয়তবা রাতের অন্ধকারে গভীর ঘুমে নিজেও ভেসে যেতে পারে বন্যার ভয়ানক আগ্রাসনে।

আচ্ছা আপনার ভয় করে না এমন ঘরে একলা থাকতে?
ভয় করে কি করবো মা।ভাসে গেলে যাবো।সরকার তো ভালো করে বালুর বস্তাও দেয় নাই মা, যাও দেহোগা (দেখো)। কোনো খাবারও পাইনা কারও কাছে। মরার মতো পরে থাহি (থাকে)।কি কবো মা, প্যাটের ছাওয়ালমিয়া( ছেলেমেয়ে) দ্যাহে না (দেখে না) সরকার কেন দেখপি (দেখবে) ক- মা?
আপনার মেয়েও খোঁজ খবর নেয় না?
মিয়াও(মেয়ে) তো গরীব। তারই চলে না।  কোনোমতে দিন পার করে। কিবা ( কেমন)করে খোঁজ লিবি ( নেবে)।
ছেলে নাতি নাতনিরা আসে না কখনো আপনাকে দেখতে?
ফাতেমা বেগম জবাব দেবার আগেই প্রতিবেশী এক লোক ঘরের মুখে দাঁড়িয়ে বলল, এর ছেলেপেলে নাতিপুতিরা খুব খারাপ।কাছেই থাকে কিন্তু কোনোদিন মা'ডার খোঁজ লেয় না। এই যে ঘরে আলো জ্বলতেছে নিমকহারাম ছেলেরা এসে মাঝেমধ্যে লাইট টাও (বাল্ব)খুলে নিয়ে যায়।
খালা আপনার মাথার উপর যে পাখাটা ঘুরছে কে কিনে দিয়েছে?
পাশ থেকে আরেক নদী ভাঙা পড়শি এসে বলল,উনিই কিনছে আপা।চায়ে চিন্তে টাকা জমায়ে  কিনছে।

"রোজ কত কি ঘটে যাহা তাহা
এমন কেন সত্যি হয়না আহা!
ঠিক যেন এক গল্প হতো তবে
শুনতো যারা অবাক হতো সবে,
দাদা বলতো,কেমন করে হবে,
খোকার গায়ে এত কি জোর আছে।
পাড়ার লোকে সবাই বলতো শুনে,
ভাগ্যে খোকা ছিলো মায়ের কাছে। "

আমিও পাড়াপড়শিদের এসব কথায় অবাক নয় হতবিহবল হয়ে গেলাম।মা পৃথিবীর সবচেয়ে আপনজন,মিষ্টি মধুর এক অনুভূতি জড়ানো ডাক।  যে মা ন'মাস সন্তান পেটে ধারণ করে,কষ্ট করে লালন পালন করেছেন সেই মা আজ বানের জলে ভেসে চলেছে অথচ পাঁচটা ছেলের কেউ তার খবর রাখে না।


দুর্ভাগা এই মায়ের খোকারা সত্যি বড় নিষ্ঠুর- নির্দয়।আমাদের চারপাশে এমন অসংখ্য খোকা রয়েছে যাদের বিবেক বোধ এবং দায়িত্ব -কর্তব্য মা বাবার প্রতি নেই বললেই চলে।


শুধু লেখাপড়া না জানা মূর্খ খোকারা  নয় শিক্ষিত বিবেকবান নামক সমাজেও এমন মানবতাহীন খোকারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। মনুষ্যত্ব তো অন্তরে বিরাজমান। সেই তথাকথিত মানুষের মনুষ্যত্ব  অনেকটা পশুত্বে রূপান্তরিত  হচ্ছে। তাই যদি না হবে তবে কেন আজও বাংলাদেশের মতো সৌহার্দপূর্ণ দেশেও বৃদ্ধাশ্রমগুলো আমাদের মা- বাবাদের শেষ বয়সের নিরাপত্তার নিবাসে পরিণত হচ্ছে।

ফাতেমা খালার সাথে কথা বলে বেড়িয়ে আসার সময় ক'টা টাকা ওনার হাতে দিতেই নেবেন না বলে আপত্তি জানালেন।আমাকে পাশে টেনে নিয়ে বললেন কেন তুই টাকা দিবি?  একবারও শুধু বললো ছেলেরা দেখে না তাকে এর বাইরে ছেলেদের সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক কথা শুনলাম না। একেই বুঝি মা হওয়া বলে!


মনে মনে ভাবলাম,যে মা সারাদিন খুদ গুর কুড়িয়ে ক'টা ভাতের জন্য রোদ বৃষ্টি ঝড় বন্যা উপেক্ষা করে এই শেষ বয়সে সারা গ্রাম ঘুরে বেড়ায় সেও আজ আমাকে তার অতিথি ভাবছে তাই আমার দেয়া টাকা নিতে আপত্তি।


পথে পথে হেঁটে বেড়ানো একজন দুখিনী মায়ের ও মনুষ্যত্ব বোধ থাকে। থাকেনা কেবল সেই মায়েরই বিবেকহীন না-মানুষ হওয়া সন্তানদের।


চারিদিকে অথৈজল। জনমানব প্রায় নেই বললেই চলে।
" ভয় পেয়েছো,ভাবছি এলাম কোথা,
আমি বলছি ভয় করোনা মা গো,
ঐ দেখা যায় মরা নদীর সেতা "

না, এমন ভরসা হয়ে  মাকে সাহস জুগিয়ে তার খোকারা বলবে না হয়তো কোনোদিনও। পৃথিবীতে সব খোকারাই  বীরপুরুষ হতে পারে না।কেউ কেউ কাপুরষও হয় বটে। এমন হাজারো ফাতেমা বেগমদের জীবন প্রতিনিয়ত নদীর পাড় ভাঙার মতো ভেঙে চলেছে কোথাও না কোথাও যার খবর আমরা জানিনা বা জানতে চাইনা।


পৃথিবী আজ কঠিন এক সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। তবুও কি থেমে আছে অন্যায় পাপ বা অনাচার?  কিছুই থেমে নেই। মানুষের ভেতর থেকে ভয় ভীতি অপরাধ প্রবণতা একবিন্দুও কমেনি। প্রকৃতিও যেন এসব বোধহীন মানুষের কাছে পরাজিত।

মানুষের জন্য মানবতার এক অপূর্ব অনিন্দ্য  সুস্থ সুন্দর জীবনের স্বপ্ন আমরা দেখতে চাই। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হোক, দেশের প্রতি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের প্রতি এমন একটা যৌক্তিক দাবী আমরা জানাতেই পারি। এসব অসহায় নিরুপায় মা- বাবাদের জন্য এমন কোনো রাষ্ট্রীয়  আইন পাস হোক যাতে দেশের প্রতিটি মা বাবা তাদের সন্তানদের কাছে অতি মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকে। নাতি নাতনি নিয়ে শেষ জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারে অনাবিল আনন্দে। কোনো মা- বাবাকেই যেন বৃদ্ধাশ্রমে যেতে না হয় অথবা ফাতেমা বেগমের মতো নিদারুণ কষ্টে দিনাতিপাত করতে না হয়।