মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৩, ১৭ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বঙ্গবন্ধু এক মহাকাব্যের নাম

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২০, ০৯:৩৯

জন্মদিন কিংবা মৃত্যুদিন—যে বার্ষিকীই হোক না কেন, তা আমাদের পুরোনো ঘটনা ও মানুষের কথা মনে করিয়ে দেয়। বছর ঘুরলেই দিনটি ফিরে আসে; আর তা নিয়ে আমরা স্মৃতিচারণ করি। কখনো থমকে দাঁড়াই, কখনো কান্না করি; প্রকাশ্যে কিংবা মনের অজান্তে। এরপর স্মরণসভা ও বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে পরদিন দৈনন্দিন কাজে ফিরে যাই। কিন্তু হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষেত্রেও কি তাই? নিশ্চিত নয়। কারণ, যে মানুষটির চিন্তাধারা একটি রাষ্ট্রের সংবিধানে ঠাঁই পেয়েছে; যার বক্তৃতা একটি জাতিকে স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রেরণা জুগিয়েছে। তার স্মরণ শুধু তো এক দিনের হওয়া উচিত নয়, বরং গোটা মাসের; সারা বছরের। বাঙালি করছেও তা-ই। সশরীরের বঙ্গবন্ধু নেই ঠিকই, কিন্তু কোটি মানুষের হূদয়ে প্রতিদিন-প্রতি মুহূর্তে তিনি অমর-অক্ষয়-অবিনশ্বর।

তার পরও আগস্ট আমাদের কাছে বিশেষভাবে আবেগের মাস। এ মাস এলেই আমার স্মৃতির পাতায় অনেক কথা ভেসে ওঠে। মনে পড়ে জাতির পিতার সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো। আজও কানে বাজে, অনুপ্রাণিত হই তার তেজোদীপ্ততায়। অতি আন্তরিক মানুষ ছিলেন বঙ্গবন্ধু। পরিচিত কিংবা অপরিচিতজন— সবার সঙ্গেই খুব দ্রুত সখ্য গড়ে তুলতে পারতেন। মনে পড়ে, ১৯৬৬ সালের ৮ এপ্রিল প্রথম যেদিন বঙ্গবন্ধুর সংস্পর্শ পেয়েছিলাম; সেদিনই তিনি আমাকে ‘তুই’ সম্বোধন করে কাছে টেনে নিয়েছিলেন। প্রথম সাক্ষাতেই আপন করে নেওয়ার এই যে ‘তুই’ ডাক; তা আমি ভুলিনি। জীবদ্দশাতেও ভুলতে পারব না। তিনি ছিলেন পরশপাথরের মতো। ছিলেন হাস্যোজ্জ্বলও। বঙ্গবন্ধু বলতেন—I can smile even in hell. আবার বাঙালির মুখে হাসি ফোটাতে সবচেয়ে কঠিনও হয়েছেন তিনি।

জীবনে বেশ কয়েক বার বঙ্গবন্ধুর সংস্পর্শ আমি পেয়েছি। সবশেষ পেয়েছি বঙ্গবন্ধু চলে যাওয়ার আট মাস আগে তথা ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে। বঙ্গবন্ধু তখন সারা দেশে বাকশাল গঠন করেন। উদ্দেশ্য ছিল—দলমতনির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, বাসস্থান ও চিকিত্সা নিশ্চিত করা। বলা যায়, আর্থসামাজিক মুক্তিই ছিল এর উদ্দেশ্য। এ লক্ষ্যে প্রথমে বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটি ও পরে জেলা গভর্নরসহ জেলা কমিটিগুলো গঠিত হয়। বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য হওয়ায় তিনি আমাকেও এর সদস্য করেন। পদায়ন করেন পাবনা জেলা বাকশালের যুগ্ম-সম্পাদক হিসেবে। প্রয়াত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ছিলেন জেলার সাধারণ সম্পাদক। বঙ্গবন্ধু স্বহস্তে প্রণয়ন করেছিলেন এই কমিটির তালিকা, পরে বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর মুখে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক আমার নামটি লেখার গল্প শুনেছিলাম। এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে?

যা-ই হোক, কমিটি গঠনের পর জেলা বাকশালের সম্পাদক ও পাঁচ যুগ্ম-সম্পাদক মিলে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাই। তিনি তখন ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাসায়। জাতির জনকের স্বভাব ড্রেসকোড ‘হাফশার্ট’ ও ‘লুঙ্গি’ পরেছিলেন। এটাই ছিল বঙ্গবন্ধুকে আমার শেষ দেখা। ভবনে ঢুকে প্রথমেই বঙ্গবন্ধুকে সালাম দিলাম। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম বাকশাল কমিটিতে স্থান দেওয়ায়। এ সময় অনেক কথা হলো। মানুষের কল্যাণে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি আমাদের নানা দিকনির্দেশনা দিলেন। চলে আসব, ঠিক এই মুহূর্তে ডাকলেন বঙ্গবন্ধু। বললেন, ‘কি রে, আমার সাথে তো ছবি না তুলে কেউ যায় না; তোরা কেন যাস?’ তাত্ক্ষণিক ক্যামেরাম্যান ডাকলেন। ফটোবন্দি হলাম প্রিয় মানুষটির সঙ্গে। এখানে একটু বলে রাখি, অনেক ফটোগ্রাফারই প্রশ্ন করতেন, ‘বঙ্গবন্ধু, আপনি এত ছবি তোলেন কেন?’ জবাবে তিনি বলতেন, ‘ভবিষ্যতের মানুষ যারা, ওরা বড় হয়ে দেখবে তাদের নেতা কেমন ছিল।’ আজ মনে পড়ে, সেদিন যদি বঙ্গবন্ধু নিজে ডেকে ছবি তোলার ব্যবস্থা না করতেন, তাহলে হয়তো তার সঙ্গে কাটানো শেষ মুহূর্তের এই দৃশ্যমান স্মৃতিচিহ্নটুকুও আগলে রাখতে পারতাম না।

স্বাধীনতার পর আরো কয়েক বার বঙ্গবন্ধুর সম্মুখ সাক্ষাত্ আমি পেয়েছি। ১৯৭২ সাল। আমি তখন পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি। এ সময় বন্যাকবলিত মানুষকে বাঁচাতে পাবনার কাশীনাথপুর/ নগরবাড়ীতে ‘মুজিববাঁধ’ উদ্বোধন করতে আসেন বঙ্গবন্ধু। যথারীতি জনসভার আয়োজন হলো। স্বাগত বক্তব্যের দায়িত্ব পড়ল আমার ওপর। বক্তৃতা দিলাম। ডায়াস থেকে যখন মুখ ঘুরিয়ে চলে যেতে উদ্যত হয়েছি, ঠিক তখনই বঙ্গবন্ধু আমার হাত ধরে ফেললেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দাঁড়িয়ে গিয়ে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। কপালে চুমু এঁকে বললেন—‘তুই তো ভালো বলিস! জাতির পিতার মুখে আমার বক্তৃতার প্রশংসা শুনে কী বলব, বুঝে উঠতে পারছিলাম না। পরে দুই-একটি কথা বলে স্টেজের পাশে দাঁড়ালাম।

যথারীতি অনুষ্ঠান শেষ হলো। বঙ্গবন্ধু ঢাকায় ফিরবেন, হেলিকপ্টারে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক এমন মুহূর্তে আমার কাছে জানতে চাইলেন—ঢাকা যাব কি না? আগেপাছে চিন্তা না করে রাজি হয়ে গেলাম। প্রথমবারের মতো হেলিকপ্টার ভ্রমণের সুযোগ হলো, তা-ও রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। অন্য রকম অনুভূতি। ঢাকায় হেলিকপ্টার থামল পুরাতন বিমানবন্দর তেজগাঁওয়ে। আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে ডাকলেন বঙ্গবন্ধু। নির্দেশ দিলেন, ‘ওকে (আমাকে) বাসায় নিয়ে খেতে দাও, তারপর খরচ দিয়ে পাবনা পাঠিয়ে দিয়ো।’ এই ছিল আমার প্রতি বঙ্গবন্ধুর স্নেহ-ভালোবাসা।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সদস্য, উপদেষ্টা পরিষদ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন