আমরা যারা মধ্যবিত্ত পর্যায়ের পরিবারগুলো লিড করছি তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম অনেকটাই গৎবাঁধা। দিনের শুরুটা যেমন চিন্তা দিয়ে তেমনি শেষটাও কাটে চিন্তার মধ্যেই। মাস শেষে পাওয়া নির্দিষ্ট বেতন দিয়ে কীভাবে পার করা যাবে সেই ভাবনা পুরো মাসজুড়েই বয়ে বেড়াতে হয়। আবার এলিট শ্রেণিদের ভাবনাগুলো অন্যরকম। তাদের সুখের বিস্তৃতি মধ্যবিত্তদের চেয়ে অনেকাংশেই কম। যেমনটা বাইরে থেকে আমরা লক্ষ্য করি বিষয়টা আদৌ সেরকম নহে। তারা পরিচালনা করেন মধ্যবিত্তদের। এজন্য চিন্তা তাদেরও থাকে। মাসশেষে কর্মজীবীদের বিশাল অঙ্কের মাইনে যে এই এলিট শ্রেণির লোকদেরই দিতে হয়।
সেদিক চিন্তা করলে এদেশের নিম্নবিত্তরা সবচেয়ে বেশি সুখী। তাদের চিন্তার পরিসর সীমিত। অনেকটা ছবিতে দেখা কলা বিক্রেতা চাচার মত। নাম মজনু মিয়া। রেলস্টেশন এলাকায় কলা বিক্রি করেন। সারাদিন কলা বিক্রি করে যা আয় হয় সেটা দিয়ে চলে তার প্রাত্যহিক জীবন। কোনো দুশ্চিন্তা নেই তার চেহারায়। সেটা আয়েশি ভঙ্গিমায় সিগারেট টানা দেখলেই ধারণা করা যায়।
ঘড়ির কাটা রাত ৮টা ৩৫ মিনিট। ট্রেনের অপেক্ষায় প্ল্যাটফর্মে অবস্থান করছি। হঠাৎ মাথায় একটি খালি টুকরি নিয়ে প্ল্যাটফর্মে বসে পড়লেন। হাতে একটি না জ্বালানো কয়েলও আছে। মজনু মিয়া জানে, সারাদিনের ক্লান্ত শরীর যখন প্ল্যাটফর্মের কনক্রিটের ঢালাইয়ের উপর এলিয়ে দেবেন ঠিক তখনই অবিবেচক শত্রু মশা তার ঘুম কেড়ে নেবে। আর সেজন্যই হাতিয়ার কয়েল তার ভরসা।
জানেন! মজনুর টুকরিতে খুব বেশি কিছু নেই। দুটি সারের খালি ছালা, কোমরে একটি ঘামছা আর পরনে লুঙ্গি আর শার্ট। এটাই তার সংসার। সে তার সংসার সঙ্গে নিয়েই ঘুরে। কথায় আছে, ‘যেখানে রাত সেখানেই কাত’। তাহলে আর কীসের ভাবনা!
মজনু মিয়া কারো দিকে তাকাচ্ছে না। রাতের প্ল্যাটফর্মে অনেক যাত্রীই অপেক্ষমাণ ট্রেন ধরবে বলে। শুরুতে মাথার টুকরিটাকে উল্টিয়ে রেখে তার উপরই প্রতীকী বালিশ তৈরি করলেন গায়ের শার্ট তৈরি। আর অবিশিষ্ট থাকা লুঙ্গিটাই মজনুর বিছানা। সারের ছালার উপর সেটা বিছিয়ে শুয়ে পড়লো বাদশাহি ভঙ্গিতে। পায়ের নিচের মশা নিরোধক কয়েলখানা জ্বালিয়ে কোমর থেকে বের করলো আকিজ বিড়িটা। সেই জ্বালানো বিড়িতে কী টান...! মনে হচ্ছে, দিনশেষে জমানো সুখটা যেনো প্রতিটি টানে টানে অনুভব করছে।
এরকম বহু মজনু দেশের আনাচেকানাচে রয়েছে। তাদের কোনো দুঃখ নেই। করেইবা কী লাভ? উচুশ্রণিরা এদের দুঃখ বুঝে না। তাই তাদের ভাবনা ‘মিললে রুটি না মিললে রোজা’র মতই।
এ মজনুরাই দেশের খাঁটি রত্ন। এরা ভালো থাকুক। আমার ট্রেন চলে এলো। চল্লোম, আবার দেখা হতেও পারে!
লেখক: নাজমুল হোসেন, সাংবাদিক।
ইত্তেফাক/বিএএফ
