ভাষাসৈনিকদের নামে সড়কের নামকরণ, জানে না অনেকেই

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২১:৪০

রাবেয়া বেবী

ভাষাসৈনিকদের অবদানকে সম্মান জানাতে ধানমন্ডির ১৪টি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে ১৪ জন ভাষাসৈনিকের নামে। কিন্তু এলাকার অনেকেরই জানা নেই নামগুলো। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর জানান, ১০টি সড়কের নামকরণ হয়েছে ভাষাসৈনিদের নামে। অথচ সিটি করপোরেশন থেকে ১৪টি সড়কের নাম ভাষাসৈনিকদের নামে হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়। কোনো বাড়ি কিংবা অফিসের ঠিকানায় নামগুলো ব্যবহার হয় না। সিটি করপোরেশনের ট্যাক্সের চিঠির ঠিকানায় সড়কের নাম ভাষাসৈনিকদের নামে উল্লেখ থাকলেও বিদ্যুত্, গ্যাস ও পানির বিলে এ সড়কের কেবলই নম্বর উল্লেখ থাকে। থাকে না ভাষাসৈনিকদের নামের প্রকৃত নাম। বিষয়টি নিয়ে কথা বললে সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রচারণার অভাব, দায়িত্বহীনতা এবং অসচেতনতার জন্যই ভাষা সৈনিকদের নামে সড়কের নামকরণ বিষয়টি অজানাই রয়ে গেছে। অথচ নামকরণ করা হয় ২০০৮ সালে।

সড়কের প্রবেশ মুখে শ্বেতপাথরে নামফলক বসিয়ে যে ভাষাসৈনিকের নামে সড়কের নাম রাখা হয়েছে তার সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত ও নামকরণের বছর উল্লেখ করা হয়েছে। নামকরণ সীমাবদ্ধ শুধু এই ফলকেই। অথচ সিটি করপোরেশন রীতিমতো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে প্রকৃত নাম ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে। তবে ধানমন্ডি এলাকার বিভিন্ন সড়ক ঘুরে বিভিন্ন বয়সের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের অনেকেই সড়কের প্রকৃত নাম জানেন না। বাড়ি ও অফিসের ঠিকানায় দেখা যায় না ভাষাসৈনিকের নামে সড়কের নামের ব্যবহার। কেবল বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল’ অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স (বিলিয়া)-এর ঠিকানায় ‘ভাষাসৈনিক এম এ মতিন’ সড়ক দেখতে পাওয়া যায়। এই সড়কেই আছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা। সেখানেও নেই সড়কের প্রকৃত নাম।

ধানমন্ডি ৭ নম্বর রোড ‘ভাষাসৈনিক মো. আব্দুল মতিন’-এর নামে নামকরণ করা এ সড়কের। এই সড়কের একটি বাড়ির গাড়িচালক শাহিন। তিনি কখনোই নাকি শোনেননি এই সড়কের নাম। এই এলাকায় চাকরি তার তিন বছর চলছে। মিল্টন রহমান নামে আরেক জন জানান, ১০ বছর যাবত্ বাস করছেন ৮-এ সড়কে। অথচ জানেন না সড়কের নাম ‘ভাষাসৈনিক গাজীউল হক সড়ক’ নামকরণ করা হয়েছে। বিষয়টি তেমনভাবে প্রচার করা হয়নি বলেই তাদের জানা নেই বলে মনে করেন মিল্টন। আনোয়ার খান মেডিক্যাল কলেজের এমবিবিএস পঞ্চমবর্ষের শিক্ষার্থী সোয়েব ওমর। ক্লাস না থাকলেই কলেজের উলটো দিকে গলির চায়ের দোকানে চা পানকালে আড্ডা দেন। চায়ের দোকান ‘ভাষাসৈনিক গাজীউল হক সড়ক’ নাম ফলকের সামান্য দূরে অবস্থিত। কিন্তু এই পাঁচ বছরেও নাকি তার চোখে পড়েনি নাম ফলক। তারা একে ৮ নম্বর সড়ক বলেই জানেন। ‘ভাষাসৈনিক মোহাম্মদ সুলতান সড়ক’ ধানমন্ডি ৩ নম্বর সড়কের প্রকৃত নাম। এখানে বাস করে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাদিয়া ও তার পরিবার। নাদিয়ার মা জানান, তারা এলাকায় পাঁচ বছর ধরে বাস করেন। সড়কের প্রকৃত নামের কথা তারও জানা নেই। তাদের বিদ্যুত্ বিল, গ্যাস বিল, পানির বিলে কোথাও ব্যবহার হয় না ভাষাসৈনিকের নামে নামকরণকৃত সড়কের নাম।

এদিকে জানা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ভাষাসৈনিক কাজী গোলাম মাহবুব সড়ক স্থানীয়ভাবে ধানমন্ডি-৯ ও ১০ নম্বর সড়ক নামে পরিচিত। ধানমন্ডি-৮ নম্বর সড়কের প্রকৃত নাম ভাষাসৈনিক গাজীউল হক সড়ক। ধানমন্ডি-৭ নম্বর সড়কের নাম ভাষাসৈনিক এম এ মতিন সড়ক। পর্যায়ক্রমে ধানমন্ডি-৬ নম্বর সড়ক ভাষাসৈনিক আবুল কালাম শামসুদ্দিন সড়ক। ধানমন্ডি-৫ নম্বর সড়ক-ভাষাসৈনিক আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ সড়ক। ধানমন্ডি-৪ নম্বর সড়ক ভাষাসৈনিক অলি আহাদ সড়ক। ধানমন্ডি-৩ নম্বর সড়ক ভাষাসৈনিক মোহাম্মদ সুলতান সড়ক। ধানমন্ডি ৯ এ সড়ক ভাষাসৈনিক তোয়াহা সড়ক। ধানমন্ডি-১ নম্বর সড়ক ভাষাসৈনিক ডা. গোলাম মওলা সড়ক। ধানমন্ডি-১৫ নম্বর সড়কের প্রকৃত নাম ভাষাসৈনিক বিচারপতি আব্দুর রহমান চৌধুরী সড়ক। রোড-১২- ধানমন্ডি, ভাষাসৈনিক অধ্যাপক সুফিয়া আহমেদ সড়ক। রোড-১৩ ধানমন্ডি, ভাষাসৈনিক অধ্যাপক সাফিয়া খাতুন সড়ক। রোড-৫/এ, ধানমন্ডি ভাষাসৈনিক কামরুদ্দীন আহমদ সড়ক এবং রোড-৪/এ, ধানমন্ডি, ভাষাসৈনিক শওকত আলী সড়ক নামে নামকরণ হয়।

 ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর রফিকুল ইসলাম বাবলা ইত্তেফাককে বলেন, ‘এখানে ১০টি সড়ক ভাসাসৈনিকদের নামে নামকরণ করা হয়। নাম ফলকগুলো অনেক বছর হয়েছে বলে ময়লা আবর্জায় নোংরা হয়ে মানুষের চোখের আড়ালে চলে গেছে। আমরা ফলকগুলো পরিষ্কার করে মানুষের সামনে আনার দায়িত্ব পালন করছি।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘সিটি করপোরেশন থেকে সব ধরনের ট্রেড লাইসেন্সে ভাষাসৈনিকদের নামে নামকরণ করা সড়ক উল্লেখ করা হয়। হোল্ডিং ট্যাক্সও এই নামের ঠিকানা থেকে গ্রহণ করা হয়। ভাষাসৈনিকদের শ্রদ্ধা জানাতে সিটি করপোরেশনও নামগুলো পরিচিতি করতে কাজ করছে। তবে এলাকার মানুষকেও এ বিষয় সচেতন হতে পরামর্শ দেন তিনি।