সৈয়দ আবুল মকসুদ বাংলাদেশের একজন শক্তিমান কলাম লেখক, কবি, সাংবাদিক ও উঁচু মাপের একজন গবেষক ছিলেন। গবেষণার জন্য মৌলিক সূত্রের ওপর নির্ভরশীলতা ছিল তার সহজাতগুণ। আর এই গবেষণার প্রয়োজনে তিনি দিনের পর দিন দেশের জেলায় জেলায় ঘুরেছেন।
পশ্চিম বাংলা, দিল্লি, প্যারিস, এমনকি পাকিস্তানে পর্যন্ত গেছেন। এই সূত্রে তিনি নানা মহৎ ব্যক্তির তথ্য, উপকরণ, পত্রিকা ও ডায়েরি সংগ্রহ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। তার তথ্যবহুল বইগুলোতে এর স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। এই পরিশ্রম ও মৌলিক সূত্রনির্ভরতার কারণেই এসব বইয়ের গ্রহণযোগ্যতা পাঠকসমাজে অনেক বেশি।
কবিতা দিয়ে জীবন শুরু করা মানুষটি গবেষণার ক্ষেত্রে ছিলেন একনিষ্ঠ সাধকের মতো। পাশাপাশি সাংবাদিকতা ও গবেষণাসংক্রান্ত বই প্রকাশেও নিষ্ঠার অভাব ছিল না তার। ‘নবাব সলিমুল্লাহ ও তার সময়’, ‘পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রনাথ’, ‘স্মৃতিতে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’, ‘ঢাকার বুদ্ধদেব বসু’, ‘কাগমারী সম্মেলন’ ‘সলিমুল্লাহ মুসলিম হল’, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা’, ‘স্যার ফিলিপ হার্টগ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য’সহ প্রতিটি কাজেই রেখেছেন মৌলিক গবেষণার ছাপ।
যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে হামলা চালিয়ে নিরীহ মানুষ হত্যা করলে মকসুদ ভাই এর প্রতিবাদ করলেন অভিনব উপায়ে। তিনি শপথ নিলেন, যত দিন ইরাকে আগ্রাসী বাহিনী থাকবে, তত দিন পশ্চিমাদের উদ্ভাবিত সেলাই করা কাপড় পরবেন না। সেই থেকে সেলাইবিহীন ধবধবে সাদা কাপড় পরতেন তিনি। ঘরে-বাইরে, শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষায় তার পরনে সেই পোশাকই শোভা পেত। তার দুই দশকের এই প্রতিবাদের মধ্যে তথা তার চিন্তা-চেতনায় চিরজীবন আমরা গান্ধীবাদের একটা প্রভাব দেখতে পাই। গান্ধীর অহিংস নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। জীবনযাপনে গান্ধীর প্রতি তাঁকে বেশ আকৃষ্ট থাকতে দেখেছি আমরা। গান্ধীকে নিয়ে লেখা তার ‘গান্ধী নেহরু ও নোয়াখালী’ এবং ‘গান্ধী মিশন ডায়েরি’র কথা আমরা জানি। একটি ইংরেজি বইও লিখেছেন তিনি গান্ধীকে নিয়ে- Pyarelal’s unpublished correpondence The Noakhali Peace Mission of Mahatma Gandhi’.

ইরাকে যখন যুক্তরাষ্ট্র হামলা করে, তখন বাংলাদেশে বিএনপি-জামাতের নেতৃত্বাধীন চার দলীয় ঐক্যজোট সরকারের শাসনকাল। ঐ সরকারের নীতিনির্ধারকেরা সৈয়দ মকসুদ ভাইয়ের এ ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ পছন্দ করেননি। এর মধ্যে ২০০৪ সালে কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা হলো। ঐ হামলাকে ‘ফ্যাসিবাদের নগ্নরূপ’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি একটি জাতীয় দৈনিকে কলাম লিখলেন। এ জন্য বাসস থেকে তাকে এ ধরনের লেখা আর লিখতে বারণ করা হলো। এর প্রতিবাদে তিনি বাসস থেকে পদত্যাগ করেন।
মকসুদ ভাই মওলানা ভাসানীর অনুসারী ছিলেন, তার জীবনী ছাড়াও কাগমারী সম্মেলন নিয়ে আলাদা বই লিখেছেন। ভাসানীর অনুসারী হলেও তিনি জাতীয়তাবাদী নেতা বঙ্গবন্ধু কিংবা অন্য নেতাদের অবদানকে কখনোই খাটো করে দেখেননি। তিনি ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, ছয় দফা কর্মসূচি, অসহযোগ আন্দোলন, মুজিবনগর সরকার নিয়েও লিখেছেন। ইতিহাসে, সমাজে যার যা প্রাপ্য, তাকে তা দিয়েছেন। তিনি একদিকে যেমন মহাত্মা গান্ধী, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্কে নিয়ে বই লিখেছেন, তেমনিভাবে লিখেছেন মুসলিম লীগ নেতা সলিমুল্লাহকে নিয়েও। গবেষণা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েও।
আমার সঙ্গে মকসুদ ভাইয়ের সম্পর্ক ছিল খুবই আন্তরিক ও হৃদ্যতাপূর্ণ। তার মতো আন্তরিক ও নিরহংকারী মানুষ খুব কমই দেখেছি। অত্যন্ত সদালাপি এই মানুষটি প্রায়ই শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির রাজধানী হিসেবে খ্যাত আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ছুটে আসতেন। তিনি আমার প্রতিষ্ঠিত চিনাইর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অনার্স কলেজের বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। মকসুদ ভাইকে যখনই স্মরণ করেছি তখন তিনি সাড়া দিয়েছেন। তাকে নিয়ে আমার সভাপতিত্বে সর্বশেষ অনুষ্ঠানটি হয়েছিল ২০১৯ সালের ৭ ডিসেম্বর, শনিবার। অনুষ্ঠানটির আয়োজক ছিল ঢাকায় বসবাসরত ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসীদের প্রাণের সংগঠন ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সমিতি, ঢাকা’। সেখানে প্রথিতযশা অর্থনীতবিদ ড. আকবর আলি খানকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়।

সেই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মকসুদ ভাই বলেছিলেন, আকবর আলি খানের সংবর্ধনা সভাটি আমার কাছে একটি ব্যতিক্রমধর্মী অনুষ্ঠান বলে মনে হয়েছে। এই অনুষ্ঠানের গুরুত্ব ও মহত্ব অন্য যে কোনো অনুষ্ঠানের চেয়ে বেশি। কেননা বাংলাদেশে এখন জ্ঞান চর্চার একটা দুর্ভিক্ষ চলছে। বর্তমানে গুণীজনদের সেভাবে আর মূল্যায়ন করা হয় না। উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী একজন ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ। অনেকদিন থেকে তাকে আমি জানি। তিনি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ জানে কীভাবে গুণী মানুষকে কদর করতে হয়। আমি আশা করব ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ এই ঐতিহ্য সমুন্নত রাখবে।
সেদিন তিনি গুণীজনদের কদর বা মূল্যায়ন বিষয়ে ঠিকই বলেছিলেন। আর বাস্তবতা এমন বলেই অনেক অযোগ্য ব্যক্তি একুশে ও স্বাধীনতা পদকসহ রাষ্ট্রীয় কতো পদক পাচ্ছেন! কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, মকসুদ ভাইকে আমরা তার জীবদ্দশায় সেভাবে কোনো মূল্যায়নই করিনি। এটা নিঃসন্দেহে তার প্রতি অবিচার এবং লজ্জাজনক।
বাংলাদেশের লেখক-বুদ্ধিজীবী-সাংবাদিকদের বেশির ভাগই ব্যক্তিস্বার্থে যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তখন সেই দল ও সরকারের অন্যায় কাজের সাফাই গাইতেও দ্বিধা করেন না। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশে এ ধারা চলে আসছে। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর যারা নীরব ছিলেন কিংবা ক্ষমতাসীনদের বন্দনায় ব্যস্ত ছিলেন, তাদের কেউ কেউ এখন কট্টর আওয়ামী লীগার সেজেছেন! কিন্তু মকসুদ ভাই এক্ষেত্রে ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তিনি কারও প্রতি কঠোর ভাষা ব্যবহার না করেই-বরাবর সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালোই বলতেন। তার লেখায় আবেগ ও গালাগালের চেয়ে যুক্তি ও তথ্য অধিক প্রাধান্য পেয়েছে।
চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি স্ত্রী সুলতানা মকসুদ এবং দুই সন্তান জিহান মকসুদ ও সৈয়দ নাসিফ মকসুদসহ সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন মকসুদ ভাই। এমন একজন মানুষের চলে যাওয়ায় আমাদের দেশের সাংবাদিকতা ও গবেষণার জগতে খুব বড় রকমের একটা শূন্যতা তৈরি হলো। মকসুদ ভাই সবসময় আমাদের হৃদয়ের মণিকোঠা জীবন্ত গোলাপের ন্যায় বেঁচে থাকবেন।
লেখক: সংসদ সদস্য, যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা,
পঁচাত্তর পরবর্তী প্রতিরোধ যোদ্ধা,
সম্পাদক, মত ও পথ।
ইত্তেফাক/এএএম
