সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

পার্বত্য সীমান্তে সন্ত্রাসী গ্রুপের সাতটি আস্তানা

পাচার করা অস্ত্র মাদক ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশে

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০২১, ০১:৫১

পার্বত্য সীমান্তের ওপারে রয়েছে শান্তি চুক্তিবিরোধী উপজাতীয় সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপের ৭টি আস্তানা। সেখান থেকে অবাধে আসছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ। আর এসব মাদক ও অত্যাধুনিক অস্ত্র তারা ব্যবহার করছে এবং সেখান থেকে সারাদেশে উগ্রপন্থী ও সন্ত্রাসীদের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছে। 

পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি আঞ্চলিক সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের কাছে এলএমজি, এসএমজি/একে৪৭, ৭.৬২ মিঃমিঃ রাইফেল, এম-১৬ রাইফেল, জি-৩ রাইফেল, ০.২২ রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল, পিস্তল, মর্টার, দেশীয় পিস্তল, দেশীয় বন্দুক, হ্যান্ড গ্রেনেডসহ রকেট লাউঞ্চারও রয়েছে। একই সঙ্গে ইয়াবা, আইসসহ ভয়ঙ্কর সব মাদকও দেশে আসছে। ৩ পার্বত্য জেলায় হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধ করেও উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা ওই সাত আস্তানায় গিয়ে নিরাপদে আশ্রয়ে থাকেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঝে মধ্যে অবৈধ অস্ত্র, গুলি ও অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করা হলেও এদের নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। 

ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এলাকায় শান্তিপ্রিয় পাহাড়ি-বাঙালীরা ওই সব সশস্ত্র উপজাতি সন্ত্রাসীদের কাছে এ ধরনের জিম্মি হয়ে রয়েছে। 

পার্বত্য অঞ্চলের সীমান্তে মিয়ানমার ও মিজোরাম অবস্থিত। সীমান্তে প্রায় ১০১ কিলোমিটার এলাকা অরক্ষিত। হাঁটা ছাড়া সেখানে যাওয়ার কোন রাস্তা নেই। সীমান্তের ওপরে সাত আস্তানায় অস্ত্র প্রশিক্ষণ ও মাদক মজুদ রাখা হয়। সীমান্তের এই ১০১ কিলোমিটার এলাকাটি চোরাচালানিদের নিরাপদ রুট হওয়ায় মজুদকৃত অস্ত্র ও মাদক নিয়মিত পার্বত্য অঞ্চলে আসছে। মিয়ানমারের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে পার্বত্য অঞ্চলের সন্ত্রাসী গ্রুপের যোগাযোগ রয়েছে। দেশের পার্বত্য অঞ্চলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বড় বড় সন্ত্রাসী কার্যক্রমের খবর পেয়ে যখন অভিযান চালায়। অভিযানের টের পেয়ে তখন সন্ত্রাসীরা সীমান্তের ওপারে আস্তানায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। শান্তি চুক্তির বিপক্ষে সন্ত্রাসী গ্রুপের সেখানে ঘাটি। যেহেতু ওই এলাকায় হেঁটে যেতে হয়, তাই যখন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সেখানে পৌঁছায়, ততোক্ষণে সন্ত্রাসীরা তাদের আস্তানায় চলে যেতে সক্ষম হয়। উঁচু-নিচু পাহাড় দিয়ে ওই এলাকায় হেঁটে যেতে দুই থেকে তিন দিন লেগে যায়। এই এলাকায় সড়ক স্থাপন করা অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। পার্বত্য অঞ্চলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। 

এ কারণে পূর্বের চেয়ে পার্বত্য অঞ্চলে এখন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক উন্নত বলে স্থানীয় প্রশাসন ও বাসিন্দারা জানান। ব্যবসায়ী মহলও একই অভিমত ব্যক্ত করেছেন। এই এলাকায় সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায়ই এখন পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি বিনষ্ট হওয়ার অন্যতম কারণ। পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ি-বাঙালিদের ৯৫ ভাগ মানুষ শান্তি চুক্তির পক্ষে। সেখানকার মানুষ এখন অনেক সচেতন। ৯৫ ভাগ মানুষ এসব সন্ত্রাসী গ্রুপের ঘৃণা করে। কিন্তু প্রাণের ভয়ে তাদের চাঁদা দিতে হয়। চাঁদা না দিলে হত্যা অপহরণসহ নানাভাবে নির্যাতন করা হয়। আর হত্যা করলেও কোন বিচার হয় না। এদের সন্ত্রাসীদের ধারণা। 

তারা জানে, বিচারে সাক্ষী দিয়ে কেউ আসবে না। অতিসম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্ত্র পাচার করার সময় সীমান্তরক্ষী বাহিনী কর্তৃক ৩ জন অন্য দেশের নাগরিককে আটক করে। তাদের নিকট হতে ২৮টি একে-৪৭, ১টি ৫.৫৬ এমএম একে-৪৭ রাইফেল, ১টি ০.৩০ কার্বাইন ও ৩৮৯৪ রাউন্ড তাজা গুলি উদ্ধার করা হয়। 

জানা যায়, ইউপিডিএফ (মূল) দলের সশস্ত্র গ্রুপের জন্য এসব অস্ত্রসমূহ প্রতিবেশী দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর নিকট হতে ক্রয় করা হয়। সীমান্তরক্ষী বাহিনী এই বিপুল পরিমাণ অস্ত্র আটক করতে না পারলে চোরাচালানকারীরা অস্ত্রগুলো ইউপিডিএফ (মূল) দলের নিকট পৌঁছাতে সক্ষম হতো। গত মার্চে ইউপিডিএফ (মূল) দল নতুন করে অস্ত্রের চালান বাংলাদেশে নিয়ে আসার সংবাদ পায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এই সংবাদের প্রেক্ষিতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অনুসন্ধানে জানতে পায় যে, ইউপিডিএফ (মূল) দল ভারতের ত্রিপুরা হতে দীপঙ্কর ভৌমিক ও বিকাশ নামক ২ জন ব্যক্তি নিকট হতে ১৬টি বিভিন্ন প্রকার অস্ত্র ও ৫ হাজার রাউন্ড গুলির ক্রয় করেছে। বিশ্বস্ত তথ্য মতে, এই অস্ত্রের চালানটি সীমান্ত দিয়ে যেকোনো সময় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সব সময় কড়া নজরদারিতে এই বিষয়টি রেখেছিল। গোপন সংবাদের প্রেক্ষিতে গত ৪ নভেম্বর রাঙামাটির সাজেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অভিযান চালিয়ে ইউপিডিএফ-এর চারটি আস্তানা ধ্বংস করে। 

এ সময় ওই আস্তানা থেকে বিপুল পরিমাণ অগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরক, ও সামরিক পোশাক উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত আগ্নেয়াস্ত্র ও সরঞ্জামের মধ্যে ছিল দু’টি বন্দুক, ১টি পিস্তল, পিস্তলের দুই রাউন্ড তাজা গুলি, বন্দুকের গুলির খালি খোসা ৪টি, একটি পরিপূর্ণ বোমা, প্লাস্টিক বোমা ৫শ গ্রাম, বোমা বানানোর সরঞ্জামাদি, বিপুল পরিমাণ কমব্যাট পোশাক ও কম্ব্যাট ট্রাউজারসহ বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম। পাহাড়ে ব্যাপক উন্নয়ন হলেও সন্ত্রাসীদের কারণে শান্তি বিনষ্ট হচ্ছে। পার্বত্য অঞ্চলে স্বাধীনতার আগে ১৯৭০ সালে মাত্র ৪৮ কিলোমিটার রাস্তা ছিল। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য অঞ্চলে নির্মাণ করেছে ১৬০০কিলোমিটার রাস্তা। এ রাস্তায় অসংখ্য ব্রিজ ও কালভার্ট।

পার্বত্য অঞ্চলকে অশান্ত করার মূলে রয়েছে জেএসএস (মূল), জেএসএস (সংস্কার), ইউপিডিএফ (মূল), ইউপিডিএফ (সংস্কার)। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব যিনি আছেন তিনি প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় সরকারের সব সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করছেন। সেই ব্যক্তিটি জাতীয় পতাকা ব্যবহার করছেন। তবে তিনি রাষ্ট্রীয় কোন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকে না। দাওয়াত  দিলেও আসেন না। পাহাড়ি-বাঙালিদের দাবি, তার সব সুযোগ-সুবিধা বাতিল করে যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হোক। পার্বত্য অঞ্চলে সব বিশৃঙ্খলার নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছে ওই ব্যক্তি বলে পাহাড়ি-বাঙালিদের দাবি। 

 

ইত্তেফাক/এমএএম