শুক্রবার, ২৭ মে ২০২২, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

পর্যটনশিল্পে সুদিন ফিরবে কবে? 

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২২, ১১:৫৪

বাংলার ভূপ্রকৃতির বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্য প্রাচীনকাল থেকেই ভ্রমণপিপাসুদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশ স্বল্প আয়তনের দেশ হলেও বিদ্যমান পর্যটন আকর্ষণে যে বৈচিত্র্য থাকা প্রয়োজন তা সহজেই বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে সক্ষম। বিশ্বের বৃহত্তর সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন, পাহাড়ের স্বর্গরাজ্য বৃহত্তর চট্টগ্রাম, গাছগাছালি ও পশু-পাখির অভয়ারণ্য সুন্দরবন, বাগেরহাট ষাটগম্বুজ মসজিদ, সোনারগাঁসহ ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং বাংলার সংস্কৃতি ও রুচিশীল ভ্রমণপিপাসুদের চিত্তকে আকর্ষণ করে। কিন্তু এতসব বৈচিত্র্যময় পর্যটন আকর্ষণ ক্ষেত্র থাকা সত্ত্বেও দেশের পর্যটনশিল্প আন্তর্জাতিক ও দেশীয় ভ্রমণপিপাসুদের ভ্রমণ চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হয়নি। এর জন্য দায়ী হলো অপরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থা, পর্যটকদের অনিরাপত্তা, যত্রতত্র ময়লা আবর্জনার স্তূপ, সড়ক ব্যবস্থার নাজুক পরিস্হিতি, পর্যটকদের সঙ্গে অশোভনীয় আচরণ ও হয়রানি এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীদের একচ্ছত্র সিন্ডিকেটের প্রভাব।

বাংলাদেশের প্রায় সব পর্যটন কেন্দ্র অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে এবং পূর্বের গতানুগতিক ধারায় চলে আসা পর্যটন কেন্দ্র সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রুচিশীল মানুষকে আকর্ষণ করতে পারছে না। বিশেষ করে যত্রতত্র স্থানে পর্যটকদের মলমূত্র, ব্যবহূত বিভিন্ন বর্জ্য, প্লাস্টিক ইত্যাদি পরিবেশের জন্য যেমন হুমকির কারণ হচ্ছে, তেমনি পর্যটকদের জন্যও বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পর্যটন এলাকায় অব্যবস্থাপনার যাঁতাকলে অনুমোদনহীন ভবন ও স্থাপনাও পর্যটন ব্যবস্থার দুর্ভোগ ও সৌন্দর্য বিনষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশে পর্যটনশিল্প অনগ্রসরতার অন্যতম আরেকটি কারণ হচ্ছে, পর্যটকদের জন্য যথাযথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা না থাকা। চুরি-ছিনতাই, স্থানীয় সিন্ডিকেট, নারী ও শিশু হয়রানির ভয় ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশের পর্যটন কেন্দ্রে পরিবার নিয়ে নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে ভ্রমণ করার মতো পরিবেশ পাওয়া যায় না। এসব পরিস্হিতির মধ্যে সম্প্রতি কক্সবাজারে একজন নারী পর্যটকের ধর্ষণের ঘটনা পুরো পর্যটন ব্যবস্থায় একটি ভীতিকর পরিস্হিতি তৈরি করেছে। মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে ভ্রমণ করাকে এখন নিরাপদ মনে করছে না। এছাড়াও ২০১৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার একজন নারী পর্যটকের ওপর যৌন হয়রানির ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পর্যটন নিরাপত্তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। বাংলাদেশে পর্যটন ব্যবস্থার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০১৩ সালে সরকার টু্যরিস্ট পুলিশ ইউনিট চালু করে। ২০২০ সালে ফৌজদারি অপরাধসহ ২২ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তদন্েতর ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। প্রথম দিকে তাদের সক্রিয় কার্যক্রম প্রশংসা কুড়ালেও বর্তমানে কিছু ক্ষেত্রে তাদের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আবার পর্যটন কেন্দ্রীক ব্যবসায় জড়িত থাকা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর অবহেলাও চোখে পড়ার মতো। তাদের চোখের সামনে অপরাধমূলক ঘটনা দেখেও তারা যেন নিশ্চুপ থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ পত্রপত্রিকায় দেখা যায়। সুতরাং এ বিষয়ে সরকারের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের আরো সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। বাংলাদেশের পর্যটন কেন্দ্রে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সক্রিয় ভূমিকা আরো জোরদার করতে হবে। যথাযথ দায়িত্ব পালনে পুরস্কার, অবহেলায় শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যেও সক্রিয়তা প্রকাশ পাবে।

পর্যটন খাতে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় দুটি বিষয় অত্যাবশক— ক. পর্যাপ্ত বিনিয়োগ; খ. নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ব্যবসায়িক সাফল্য সুদৃঢ় করতে বিনিয়োগের একটি অংশ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ব্যয় করা উচিত। কেননা অনিরাপদ ও আশঙ্কাজনক কোনো স্থানে মানুষ যেতে চাইবে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি পর্যটন এলাকার পরিবহন ও জনসাধারণের উচিত পর্যটকদের সাথে আরো আন্তরিক বন্ধুসূলভ আচরণ ও সহযোগী মনোভাবের হওয়া।

অন্যদিকে পর্যটন এলাকায় মানসম্মত রেস্টুরেন্টের সংখ্যাও থাকে কম। আর যা থাকে সেখানেও গলাকাটা বাণিজ্য। নিন্মমানের ও অস্বাস্হ্যকর পরিবেশে তৈরি করা এসব খাবারের দামও থাকে বেশ চড়া। পর্যটন কেন্দ্রে জিনিসপত্রের দাম একটু বেশি, তাই বলে স্বাভাবিক বাজার মূল্যের চার-পাঁচ গুণ বেশি থাকবে তা কাম্য নয়। আমাদের ভ্রমণের সিজনগুলোতে অথবা কোথায়ও পর্যটকদের উপস্হিতি বেশি হলে পর্যটন এলাকার হোটেল ভাড়া আকাশচুম্বী হয়ে দাঁড়ায়। এসব বিষয় পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পর্যটন ব্যবস্থার বেহালদশার কারণে প্রতি বছর দেশের বড় একটি ভ্রমণপিপাসু মানুষ বাড়তি অর্থ খরচ করে দেশের বাইরে ভ্রমণে চলে যায়। দেশে যদি মানসম্মত নিরাপদ পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা যেত তাহলে দেশের অর্থ দেশে খরচ হয়ে দেশের ক্ষুদ্র থেকে বড় ব্যবসায়ী সবাই ব্যবসায়িকভাবে লাভবান হতো। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ, যানবাহনে সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে আমরা দেশি-বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ করতে পারি।

লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

নিশ্চয়ই থামো তুমি রুমির শহর কোনিয়ায়

তুরস্ক প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য যেখানে এসে মিশে গেছে