মায়ের সাথে নানু বাড়ি গিয়েছেন আড়াই বছর বয়সী ছোট্ট আহাদুল। হঠাৎ বাড়ির পাশের রাস্তা পার হওয়ার সময় গাড়ির ধাক্কায় এক পা হারিয়ে ফেলেন তিনি। এরপর তার জীবনে নেমে আসে অপ্রত্যাশিত এক মলিন শৈশব।
'এক পা হারিয়ে চিকিৎসা নিয়ে যখন বাড়িতে আসি, তখন আর আট-দশটা শিশুর মতো আমারও খেলতে মন চাইতো কিন্ত কেউ আমাকে খেলায় নিতো না আমি প্রতিবন্ধী বলে। তবে আমার অদম্য চেষ্টায় সব কাজ করতে শিখে ফেলি। গাছে ওঠা, এমনকি সাঁতার কাটাও শিখে ফেলি। এসব দেখে আমার সমবয়সী ছেলেরা অবাক হতো। এরপর অনেকেই খেলায় নিতো।'—আলাপচারিতায় এমনটিই বলছিলেন চট্টগ্রাম হুইলচেয়ার ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ও বাংলাদেশ হুইলচেয়ার ক্রিকেট দলের অলরাউন্ডার আহাদুল ইসলাম।
'মহসিন ভাই প্রথম হইলচেয়ার ক্রিকেটের উদ্বোধন করেন ৪টি দল নিয়ে। আমি চট্টগ্রাম দলের অধিনায়ক ছিলাম, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় খেলতে এসে রানার্সআপ হই, এরপর ক্রিকেটে নিয়ে ভালো সম্পর্ক তৈরি হয় অধিনায়ক মহসিন ভাইয়ের সাথে। বাংলাদেশ হুইলচেয়ার ক্রিকেট দলে ডাক পেয়ে দেশের বাইরেও খেলতে যাবার সুযোগ পাই। ভারত আর নেপালে খেলতে গেছি। এই দুই দেশেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছি, কিন্তু এশিয়া কাপে আমরা ১টি ম্যাচ জিতে ফেরত আসি। সেই আফসোস রয়ে গেছে এখনো।
আহাদুলের জন্ম চট্টগ্রামের আনোয়ারায়। অদম্য প্রচেষ্টা ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে অর্নাস শেষ করেছেন হাজী মুহম্মদ মহসিন কলেজ থেকে। এক সময় চাকরি করতেন, কিন্তু চাকরি করলে ক্রিকেট ছেড়ে দিতে হবে বলে ক্রিকেটকেই আঁকড়ে ধরেছেন। আগামীতে ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি ব্যবসার লভ্যাংশ হুইলচেয়ার ক্রিকেটেই বিনিয়োগ করতে চান।
আহাদুল বলেন, ক্রিকেটে আসতে পদে পদে বাঁধার মুখোমুখি হতে হয়েছে আমার। গ্রামে অনেকসময় অনেকে আমাকে ল্যাঙরা বলে ক্ষ্যাপাতো, কটু কথাও বলতো। আমার মা বাবা আমাকে খেলতে দিতে চাইতেন না, তারা ভয় পেতেন ব্যথা পাব বলে।
'আমি নিজেকে প্রতিবন্ধী মনে করি না, আট-দশটা মানুষের মতোই স্বাভাবিক মনে করি। দল থেকে কোনো ধরনের বেতন পাই না, দেশের বাইরে খেলতে গেলে কেবল ছোট্ট একটা সম্মানী পাই। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড আমাদের দায়িত্ব নিলে দেশের বাইরে আমরা আরও ভালো করতে পারব বলে বিশ্বাস করি।'—বলছিলেন আহাদুল।
তিনি বলেন, 'চট্টগ্রাম আমার নিজের একটা টিম আছে, কোন ধরনের খেলাধুলার সরঞ্জাম না থাকায় ও হহুলচেয়ার না থাকায় আমাদের চট্টগ্রাম টিমটি পিছিয়ে আছে। এখন পর্যন্ত ক্রিকেটের জন্য সরকারি বেসরকারি কোনো দপ্তর থেকে সহযোগিতা পাইনি। আমি চাই দেশের স্বার্থে, ক্রিকেটের স্বার্থে কেউ যেন আমাদের পাশে এসে দাড়াঁয়।'
