নির্বাচনে হারতে হারতে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে ভারতের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের। নেতৃত্বের দুর্বলতায় নড়বড়ে দলের অবস্থান। সর্বশেষ দিল্লিতে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকা দলটি বিধানসভা নির্বাচনে একটিও আসন পায়নি। এমন পরাজয়ে দলের নেতাকর্মীদের মনোবল এখন তলানিতে ঠেকেছে। গান্ধী পরিবারের ছেলে রাহুল গান্ধীকে দলে বড় পদ দিলেও তেমন কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন বা চমক দেখাতে পারেননি তিনি। দলের অনেকেই নেতৃত্বে পরিবর্তনের কথা বলছেন। কেউ কেউ রাহুলের পরিবর্তে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে নেতৃত্ব দেয়ার পক্ষে। এ অবস্থায় দলের হাল আবারো শক্ত হাতে ধরেছেন সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী! জমি অধিগ্রহণ বিল নিয়ে মোদী সরকারের উপর চাপ ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছেন তিনি। এ অবস্থায় জমি বিল পাস করানো কঠিন দেখে কয়লা ও খনি বিল পাস করিয়ে আর্থিক সংস্কারের পথে কিছুটা হলেও এগোতে চাইছেন নরেন্দ্র মোদী।
শিল্পে নতুন বিনিয়োগ আনতে মরিয়া বর্তমান সরকার বিগত ইউপিএ সরকারের জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ বিলে সংশোধন করতে চাইছে। কিন্তু সেই বিলের বিরুদ্ধে কংগ্রেস, তৃণমূল, বাম থেকে শুরু করে সব দলই এক সারিতে এসেছে। সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি ভবন পর্যন্ত ১৪টি দলের এমপিদের নিয়ে মিছিল করেন সোনিয়া গান্ধী। সেখানে গিয়ে জমি অধিগ্রহণ বিলের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিয়েছেন। প্রণব মুখার্জিকে স্মারকলিপি দিয়েছেন। এছাড়া জমি বিলের সমালোচনা করে দিন কয়েক আগে গান্ধীবাদী আন্না হাজারেকে চিঠি লিখেছেন সেনিয়া গান্ধী। এ দৃশ্য দেখে অনেকেই মনে করেছেন কংগ্রেসের মেরুদণ্ড আবারো ফিরে এসেছে।
সম্প্রতি জমি বিলের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সোনিয়াকে পাশে চান আন্না হাজারে। আর এ আহবানে সাড়া দিতে দেরি করেননি কংগ্রেস সভানেত্রী। তিনি চিঠি লিখেছে জানিয়েছেন, এ ব্যাপারে কংগ্রেসের লড়াই অব্যাহত থাকবে। বিভিন্ন দলের এমপিদের নিয়ে মিছিলের সাফল্য ধরে রাখতে এখন বিভিন্ন রাজ্যে সফরে যাচ্ছেন কংগ্রেস সভানেত্রী। তার সফরসূচিতে সেই সব জায়গাগুলোই প্রাধান্য পাচ্ছে, যেখানে অকাল বৃষ্টিতে চাষাবাদে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন রাজ্যে সফরের সময় সভা-সমাবেশে যোগ দেবেন তিনি। বলা হচ্ছে, ‘নরেন্দ্র মোদীর, কৃষক বিরোধী’ শ্লোগান তুলে গোটা দেশের কৃষকদের খেপিয়ে তুলতেই রাজ্য সফরে নামছেন সোনিয়া। শুধু জমি বিল নয়, সরকার যে কৃষক বিরোধী সেই বার্তা দিতে আরো কিছু বিষয়ও যুক্ত করতে চাইছেন তিনি। সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে কৃষি পণ্যের ক্ষয়ক্ষতির জন্য কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবিও তুলছেন সোনিয়া। আগামী মাসে দিল্লিতে একটি বড় কৃষক সভারও আয়োজন করবে কংগ্রেস। কংগ্রেস সূত্রের খবর, এসব রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অনুপস্থিত থাকা রাহুল গান্ধী যাতে ফিরে এসেই আন্দোলনের হাল ধরতে পারেন, তার জন্যই জায়গা তৈরি করে দিচ্ছেন মা সোনিয়া গান্ধী। রাহুল গান্ধীও রাজ্য সফরে বের হবেন।
কংগ্রেসের বর্তমান প্রেক্ষাপটে জমি অধিগ্রহণ বিলকে কেন্দ্র করে দলের হাল ধরার বিষয়ে সোনিয়া গান্ধীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরি ছিলো। এর একটি কারণ হলো পার্লামেন্টের ভেতরে বা বাইরে যেখানেই হোক না কংগ্রেস দুর্বল অবস্থায় রয়েছে এবং মধ্য মেয়াদী রাজনৈতিক পুনর্বাসনের জন্য দলটিকে জোটগত রোড ম্যাপের উপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। এছাড়া দলটি এখন বামদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চাইছে। আর এক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণ বিলের বিরুদ্ধে আন্দোলন খুবই ফলপ্রসূ হতে পারে। আর দুটি রাজ্যে নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসছে। কংগ্রেসের জন্য এই নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতে একের পর এক নির্বাচনে হারার পর কংগ্রেসের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু কার হাত ধরে দলটি ঘুরে দাঁড়াবে তা নিয়ে সংশয় বাড়ছিলো দলের নেতাকর্মীদের। সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী নাকি প্রিয়াঙ্কা গান্ধী কংগ্রেসের হাল ধরবেন তা নিয়েই গত কয়েক মাস ধরে দলের মধ্যে শোরগোল চলে আসছিলো। দলের প্রবীণ নেতারা চাইছিলেন সোনিয়া গান্ধীই ফের দলের হাল ধরুক। তবে দলের নতুন প্রজন্মের দাবি, কংগ্রেসের হাল প্রিয়াঙ্কা গান্ধী না ধরলে আর দলটি উঠে দাঁড়াতে পারবে না। কারণ রাহুলের নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শরিক দলগুলোকে নিয়ে রাহুলের পক্ষে যে পথ চলা সম্ভব নয় তাও একের পর এক নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে। সেখানে দাঁড়িয়ে ২০০৩ সালের মতো জাতীয় স্তরে ধর্মনিরপেক্ষ জোট গড়ার ক্ষমতা একমাত্র সোনিয়া গান্ধীরই রয়েছে। হয়তো সে বিষয়টি নিজেও উপলব্ধি করেছেন সোনিয়া গান্ধী। গত কয়েকদিনে তিনি সরব ভূমিকা দেখিয়েছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে আদালতের সমনের পর তার পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন সোনিয়া। তার এ ভূমিকায় দলকে আবারো সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়ার কিছুটা আভাস মিলছে। বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে একজোট হয়ে মিছিল, জমি অধিগ্রহণ বিলের বিরুদ্ধে আন্দোলন এগুলো হতে পারে তার ফিরে আসার কার্যকরী প্রথম পদক্ষেপ।
