পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গ হত্যা

ফের তুলকালাম যুক্তরাষ্ট্রে

আপডেট : ০৪ মে ২০১৫, ১৪:১৭
 
পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গ মৃত্যুর ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে খুব অল্প সময়ের মধ্যে বেশ কয়েকটি ঘটলো। সবশেষ এক সপ্তাহ আগে পুলিশ হেফাজতে মারা গেছে কৃষ্ণাঙ্গ যুবক ফ্রেডি গ্রে। তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তুলকালাম মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের বাল্টিমোর নগরী। খুব দ্রুততম সময়ে সর্বস্তরের মানুষের বিক্ষোভ রূপ নেয় রক্তাক্ত সংঘর্ষ ও দাঙ্গায়। এক পর্যায়ে জারি করা হয় কারফিউ। তবে সুখের কথা, ঐ হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে ছয় পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করা হচ্ছে খুব শিগগিরই।
 
ফ্রেডি গ্রের মর্মান্তিক মৃত্যুতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন আমেরিকার কালো বর্ণ গোষ্ঠীর মানুষ। ২৭ এপ্রিল গ্রের শেষকৃত্য হবার পরই বিক্ষোভে ফেটে পড়েন তারা। শ্লোগান তোলা হয়, ‘নো জাসটিস, নো পিস’। ন্যায়বিচার নেই, তো শান্তি নেই। এক পর্যায়ে তাদের বিক্ষোভ দাঙ্গায় রূপ নেয়। পশ্চিম বাল্টিমোরে জ্বালিয়ে দেয়া হয় শতাধিক প্রাইভেট কার। পুড়িয়ে দেয়া হয় অন্তত ১৫টি ভবন। এ পরিস্থিতিতে গ্রেফতার করা হয় প্রায় দু’শ’ জনকে। কারফিউ জারি করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নগরীতে মোতায়েন করা হয় ন্যাশনাল গার্ড ও অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যদের। এরপরও কারফিউ ভঙ্গের ঘটনা ঘটে। এ সময় আটক করা হয় অনেককেই। কিন্তু গত শনিবার বাল্টিমোরে দেখা যায় সর্বস্তরের মানুষের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ। সবাই বেশ উত্ফুল্ল। কারণে কৃষ্ণাঙ্গদের জাত্যাভিমান ঠেকাতে এগিয়ে এসেছেন বাল্টিমোরের অন্যতম শীর্ষ আইনজীবী ও স্টেট অ্যাটর্নি ম্যারিলিন মোসবি। কৃষ্ণাঙ্গ যুবক হত্যার সুবিচার আদায়ের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। মামলায় ছয় পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পরিকল্পনা নিয়েছেন তিনি।
 
গত ১২ এপ্রিল স্যান্ড টাউনের প্রেসবুরি স্ট্রিট থেকে আটক করা হয় ফ্রেডি গ্রেকে। পুলিশের ডাকে সাড়া না দিয়ে দৌড় শুরু করলে তাকে তাড়া করে ধরা হয়। মোবাইল ফুটেজে দেখা যায়, গ্রেকে মাটিতে উবু করে ধরে রেখেছে হলুদ ইউনিফর্মে দুই পুলিশ সদস্য। এরপর তার দুই হাত পেছনে নিয়ে হাতকড়া পরিয়ে দেয়া হয়। গ্রে এ সময় তার ইনহেলার দেয়ার অনুরোধ করলেও পুলিশ সদস্যরা তাতে পাত্তা দেননি। পুলিশ ভ্যানে তোলার পর তার পায়েও বেড়ি পড়ানো হয়। কিন্তু সিট বেল্ট বাঁধা হয়নি। গ্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সে অবৈধভাবে একটি সুইচব্লেড বহন করছিলো। তবে স্টেট অ্যাটর্নি মোসবি জানিয়েছেন, ছুরি বহন করা আমেরিকায় বৈধ। এটা কারো গ্রেফতারের কারণ হতে পারে না। সুতরাং ফ্রেডির গ্রেফতারও অবৈধ। আর গ্রেফতারের পর তার মৃত্যু নরহত্যার অপরাধ। মোসবি আরো জানান, গ্রের বারংবার অনুরোধ সত্ত্বেও তার কোন চিকিত্সা সুবিধা বন্দোবস্ত করা হয়নি। এরপর পথিমধ্যেই ঐ ভ্যানে তোলা হয় অন্য এক মামলার আসামিকে। এভাবে নানা কারণে গাড়ি চারবার থামানো হলেও গ্রের স্বাস্থ্যগত দিকটি একবারের জন্যও বিবেচনায় নেননি পুলিশ কর্মকর্তারা। ২৫ বছর বয়সী যুবক গ্রের মৃত্যুকে ‘নরহত্যা’ বলে মন্তব্য করে মিডিয়ার নজর কেড়েছেন বাল্টিমোরের শীর্ষ আইনজীবী ম্যারিলিন মোসবি। এরপরই বাল্টিমোরে আনন্দ মিছিল বের করে এলাকাবাসী। যেন বাস্তবায়িত হতে চলেছে বহুদিনের দাবি।
 
পুলিশ হেফাজতে থাকাকালে ফ্রেডি গ্রে মেরুদণ্ডে মারাত্মক জখম হন। ম্যারিলিন মোসবি জানিয়েছেন, সমন্বিত, পুঙ্খানুপঙ্খ ও স্বাধীন তদন্ত শেষে এটাকে হত্যাকাণ্ড বলেই প্রমাণিত হয়েছে। তিনি জানান, পুলিশ ভ্যানে ফ্রেডিকে নেয়ার সময় তার হাতে পায়ে বেড়ি বাঁধা হয়, কিন্তু তাঁর সিট বেল্ট বেঁধে দেয়া হয়নি। যা ছিলো বেআইনী। দ্রুত বেগে গাড়ি চলার কারণেই ফ্রেডি মেরুদণ্ডে প্রচণ্ড আঘাত পান। গ্রে’র মৃত্যুর পর এক লেফটেন্যান্ট ও এক সার্জেন্টসহ ছয় পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তবে তাদের আটক করা হয়েছে কি-না, তা পরিষ্কার নয়। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগের মুখে পড়তে পারেন পুলিশ ভ্যানের চালক সিজার গুডসন। তার বিরুদ্ধে আনা হতে পারে পরোক্ষ হত্যার অভিযোগ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ত্রিশ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হতে পারে গুডসনকে। বাকি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত মানুষ হত্যা, হামলা ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ আনা হতে পারে।
 
পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, গ্রের জরুরি চিকিত্সা সেবা দরকার ছিলো। তাকে শক ট্রমা কেন্দ্রে নেয়া হলেও তখন তার সংকটাপন্ন অবস্থা। ময়না তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত গ্রের মৃত্যুর কারণ। এবিসি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রের মাথায়ও আঘাতের চিহ্ন ছিলো, যা পুলিশ ভ্যানের দরজার আঘাত বলেই প্রতীয়মান হয়েছে। তবে গ্রে হত্যা মামলাটি যে বেশ চাঞ্চল্যকর হতে যাচ্ছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত পুলিশ কর্মকর্তারাও নিজেদের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছেন, যিনি এরই মধ্যে বলতে শুরু করেছেন যে, তার মক্কেলরা নির্দোষ।
 
যুক্তরাষ্ট্রের বিউরো অফ জাস্টিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর পুলিশের হাতেই মারা যায় গড়ে ৯৩০ জন। চলতি বছরেই মারা গেছে ১৬৭ জন। এর মধ্যে কালো দেহী মানুষকে হত্যার জন্যই সবচেয়ে বেশি বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্র।