গত সেপ্টেম্বরে ভারত সফরে গিয়েছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সে সময় রাজধানী দিল্লী নয়, নিজের রাজ্য গুজরাটে চীনের প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ঐ সফরে আতিথেয়তার কোনো কমতি ছিল না। গত বৃহস্পতিবার নরেন্দ্র মোদীকে নিজের প্রদেশ শানজি’তে স্বাগত জানিয়ে সেই আতিথেয়তাই যেন ফিরিয়ে আনলেন জিনপিং। আর এই প্রোটোকল ভাঙার মধ্য দিয়ে সহজ হয়ে ওঠে দুই পক্ষের আলোচনার পরিবেশও।
ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভারতকে বিশ্বের দরবারে নতুন করে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এখনো সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছেন। এজন্য কৃতিত্বের পাশাপাশি সমালোচনাও কম মিলছে না তার। অনেকে বলেন, মোদী নাকি দেশে থাকার চেয়ে বিদেশে থাকতেই বেশি পছন্দ করেন। তবে এ ধরনের সমালোচনা গায়ে না মেখে প্রধানমন্ত্রী নিজের হাতেই যেন নিয়ন্ত্রণ করছেন পররাষ্ট্রনীতিও। গত মাসেই তিনি ফ্রান্স, জার্মানিসহ তিনটি দেশ সফর করেন। আর এ সপ্তাহেই তিনদিনের চীন সফর শেষ করেছেন। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম বত্সর পূর্তির আগের এই সফর নানা কারণেই দুই দেশের জন্য তাত্পর্যপূর্ণ।
চীন ও ভারত এশিয়ার অন্যতম দুই প্রভাবশালী দেশ। যদিও দুই দেশের মধ্যে বহু বিষয়ে রয়েছে মতভেদ। সীমান্ত বিতর্ক থেকে বাণিজ্য বৈষম্য বা ভারত মহাসাগরে চীনা সক্রিয়তা ইস্যুতে মতবিরোধ চলছে। তাই এবারের সফরে এইসব দীর্ঘমেয়াদী সমস্যাকে আড়াল না করে দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্কে ‘আস্থা’ বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়েছেন মোদী। সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে মোদীর প্রথমদিন দেড় ঘণ্টা বৈঠক হয়। সেখানে কোনো প্রসঙ্গই প্রধানমন্ত্রী লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেননি। বরং স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে চীনের করিডর তৈরি করা নিয়ে নয়াদিল্লির অসন্তোষের কথাও।
বৈঠকের পর ভারতের পররাষ্ট্র সচিব এস জয়শঙ্কর জানান, দুই দেশের মধ্যে কীভাবে আস্থা বাড়ানো যায়, বিভিন্ন ক্ষেত্রর বৈষম্য দূর করে ঐকমত্য তৈরি করা যায় তা নিয়েই আলোচনা হয়েছে। কূটনীতিকদের মতে, বিষয়টি এমন নয় যে, মোদী-জিনপিং বৈঠকের পর ইতিবাচক পথে হাঁটতে শুরু করবে ভারত এবং চীনের সম্পর্ক। কারণ এই সম্পর্ক অত্যন্ত জটিল। সাউথ ব্লক আশা করে শিগগিরই সমাধান আসবে। তবে একই সঙ্গে মনে করা হচ্ছে, আর্থিক ও সামরিকভাবে এশিয়ার সবচেয়ে শক্তিধর রাষ্ট্র চীনের সঙ্গে নিরন্তর আলোচনা চালিয়ে যাওয়াটাও অত্যন্ত জরুরি। আর মোদী-জিনপিং ব্যক্তিগত রসায়ন ভালো হওয়ায় এ কাজ সহজ হবে। অন্যদিকে, ভারত-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়া এবং জাপানের মধ্যে যে সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে, তা অস্বস্তিতে রেখেছে চীনকে। তাই কূটনৈতিকভাবে দিল্লিকে কাছে টানাও বেজিংয়ের জন্য কিছুটা হলেও প্রয়োজনীয়।
দুই দেশের এই সমীকরণ তৈরিতে জিনপিংয়ের প্রোটোকল ভাঙা বা আতিথেয়তা অনুঘটকের কাজ করেছে। মোদীও চেষ্টা করেছেন চীনাদের কাছে টানতে। সফরকালে মোদী চীনা নাগরিকদের জন্য ইলেকট্রনিক বা ই-ভিসা চালু করার ঘোষণা দিয়েছেন। ভারত এবং চীনের সম্পর্কের ঐতিহাসিক দিক স্মরণ করিয়ে দিয়ে মোদী বলেছেন, নিজেদের মতো সম্পর্কে আমরা দুই দেশই যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পেলে আন্তর্জাতিক আঙ্গনে লাভবান হবে দুই পক্ষই। নরেন্দ্র মোদী চীন সফর শুরুর আগেই জানান, তাঁর এই সফর দুই দেশের দ্বি-পক্ষীয় সম্পর্ককে আরো দৃঢ় করবে। এছাড়া এ সম্পর্ক এশিয়া ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে মাইলফলক হয়ে থাকবে। মোদীর চীন সফরকে দেখা হচ্ছে নানা আঙ্গিকে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মোদীর এবারের সফর অগ্রগতির প্রথম পদক্ষেপ। এখনকার মতো উচ্চ আস্থা এর আগে কখনো দেখা যায়নি। একজন ক্ষমতাবান ও আত্মবিশ্বাসী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সফর করেছেন নরেন্দ্র মোদী। এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন যুগের সৃষ্টি করেছেন তিনি। তিনি জোর দিয়েছেন আস্থা বাড়াতে। চীনা বিনিয়োগকারীদের ভারতে বিনিয়োগের আহবান জানিয়েছেন। কথা বলেছেন দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো নিয়েও। নরেন্দ্র মোদী দায়িত্ব নেয়ার পর এসব দেশ সফরের সিদ্ধান্ত নেয়ার মাধ্যমে একটি বিষয় স্পষ্ট করতে চেয়েছেন যে তিনি বন্ধু দেশকে কতটা গুরুত্ব দেন। বর্তমানে ভারত আসিয়ান অঞ্চলে তার সতর্ক উপস্থিতি নিশ্চিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। জাপান, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্রদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করছে। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সঙ্গে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। আর প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করতে চাইছে যাদের সঙ্গে হাজার বছরের সভ্যতার সম্পর্ক রয়েছে।
