হতদরিদ্রদের জীবিকার সংস্থান করেছে ভোকেশনাল ট্রেনিং স্কলারশিপ

আপডেট : ২৭ মে ২০১৫, ০৩:০১

মোহাম্মদ রেজাউল করিম। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তপুর থানার রহমপুর গ্রামে থাকেন তিনি। ছোটবেলা থেকে ইচ্ছা ছিল প্রকৌশলী হওয়ার। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারেননি রেজাউল। ফলে প্রকৌশলী আর হওয়া হয়নি তার।

 

আমাদের দেশের প্রতিযোগিতাপূর্ণ কর্মবাজারে রেজাউলদের স্থান খুবই নড়বড়ে। বেঁচে থাকার সংগ্রামে নিজের অবস্থানকে তাই শক্তিশালী করতে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক-বাংলাদেশ ইসলামিক সলিডারিটি এডুকেশনাল ওয়াকফের (আইডিবি-বিআইএসইডব্লিউ) ভোকেশনাল ট্রেনিং স্কলারশিপের আওতায় ওয়েল্ডিং অ্যান্ড ফেব্রিকেশন ট্রেডে ছয় মাসের ফ্রি ট্রেনিং করে এখন তিনি একটি প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। এই এক ট্রেনিংয়েই বদলে যায় রেজাউলের জীবন। বদলে যাওয়া জীবন সম্পর্কে রেজাউল বলেন, ‘আমি আগে ভয় পেতাম যেম কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবো। কারণ, আমার তেমন কোনো লেখাপড়া ছিল না। আর এখন আইডিবি-বিআইএসইডব্লিউতে ট্রেনিং করে একটা কোম্পানিতে চাকরি করছি। এতে আমি সব মিলিয়ে ১৪ হাজার ৫শ টাকা এবং অন্যান্য বেতন বাবদ প্রায় ২০ হাজার টাকা প্রতি মাসে আয় করছি। আমার সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতিমাসে আমার হাতে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা থাকে।’

 
শুধু রেজাউলই নয়; তার মতো শহীদুল, আতাউর, বশীরসহ আরও অনেকেই এই প্রশিক্ষণ নিয়ে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখছেন। এদের মধ্যে বশীর আহমেদ মালেশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করে প্রতিমাসে ৯৮ হাজার টাকা আয় করছেন।
 
এই ভোকেশনাল ট্রেনিং স্কলারশিপ সম্পর্কে আইডিবি-বিআইএসইডাব্লিউর প্রোগ্রাম অফিসার জাহিদ-আল-মাহাদী বলেন, ‘এই স্কলারশিপ ২০১২ সালে শুরু হয়। এখন পর্যন্ত এখানে ২৬০ জন বিভিন্ন ট্রেডে ট্রেনিং নিয়েছে এবং তারা সবাই দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন।’
 
একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রার্থী কীভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারছে এবং কেমন টাকা আয় করছেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আইডিবি-বিআইএসইডব্লিউ শুধু প্রশিক্ষণই দিচ্ছে না, পাশাপাশি প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের কর্মসংস্থানের উদ্যোগও গ্রহণ করে থাকে। এক্ষেত্রে আইডিবি-বিআইএসইডব্লিউর প্লেসমেন্ট সেল সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। তাছাড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রার্থীরাই কাজ খুঁজে নিচ্ছে সাফল্যের সাথে। এখানকার অনেক শিক্ষার্থীই মাসে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয় করছে।’
 
ওয়েল্ডিং অ্যান্ড ফেব্রিকেশন ট্রেডের প্রশিক্ষক মনিরুজ্জামান বলেন, ‘এখানে আমরা এমনভাবে প্রার্থীদের তৈরি করি যাতে তারা বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারে। দেশ-বিদেশে আমাদের প্রশিক্ষণার্থীরা সবাই কর্মরত রয়েছে। এবং তুলনামূলক ভালো বেতন পাচ্ছে।’
 
তিনি জানান, অষ্টম শ্রেণি থেকে এসএসসি বা দাখিল উত্তীর্ণ এবং সর্বোচ্চ ২৫ বছর বয়সী যে কেউই এই স্কলারশিপের জন্য আবেদন করতে পারবে। তবে এইচএসসি, স্নাতক বা স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ বা অধ্যয়নরত প্রার্থীরা এর জন্য আবেদন করতে পারবেন না।
 
এই প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামের ট্রেড কোনগুলো, তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভোকেশনাল ট্রেনিং স্কলারশিপে আমরা ৪টি ট্রেডের উপর ৬ মাসের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। ট্রেডগুলো হলো—ইলেক্ট্রিক্যাল ওয়ার্কস, ওয়েল্ডিং অ্যান্ড ফেব্রিকেশন, ইলেক্ট্রনিক্স এবং রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ারকন্ডিশনিং।’
 
এই ট্রেনিংয়ের সুবিধা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা চাকরির উপযোগী সিলেবাস অনুসরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করে থাকি। তাছাড়া এই প্রোগ্রামে ৫০ টাকার ফরম পূরণ করা ছাড়া প্রশিক্ষণার্থীকে আর কোনো অর্থ ব্যয় করতে হয় না। আমরাই প্রশিক্ষণ চলাকালীন শিক্ষার্থীদের থাকা-খাওয়ার যাবতীয় ব্যয় বহন করে থাকি। মাসিক ভাতা হিসেবে ৫০০ টাকাও প্রদান করে থাকি।’
 
কীভাবে শিক্ষার্থীদের ট্রেনিংয়ের জন্য নির্বাচিত হয়, এই বিষয়ে মাহাদী বলেন, ‘প্রথমে লিখিত পরীক্ষার ভিত্তিতে মেধানুসারে প্রার্থী বাছাই করা হয়। লিখিত পরীক্ষায় বাংলা, ইংরেজি, ও গণিত বিষয়ে সাধারণ দক্ষতা যাচাই করা হয়। এরপর মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয় প্রার্থী।’
 
ছয় মাসের এই ভোকেশনাল প্রশিক্ষণে প্রতিদিন ৫ ঘণ্টা করে সপ্তাহে ৬ দিন ক্লাস করতে হবে এবং প্রশিক্ষণের সময় সকাল ৮টা থেকে বেলা বেলা ১টা পর্যন্ত। মাহাদী বলেন, ‘পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে উত্তীর্ণ এবং মাঠ পর্যায়ে কমপক্ষে দুই-তিন বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে, এমন প্রশিক্ষকই আমরা নিয়োগ দিয়ে থাকি। ফলে তারা সফলভাবে প্রশিক্ষণার্থীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ প্রদান করতে পারেন।’
 

কারিগরি শিক্ষার এই মাধ্যমটি তাই না পূরণ হওয়া স্বপ্নের দরজা খুলে দিতে পারে। বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন www.idb-bisew.org।