আসামের কোকরাঝাড়ে এক জঙ্গি হানায় অন্তত ১৪ বেসামরিক নাগরিক মারা গেছেন। পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে একজন জঙ্গিও। আহত হয়েছেন ২০ জন যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা সঙ্কটজনক। জঙ্গিরা সেনা পোশাকে একটি ব্যস্ত মার্কেটে ঢুকে প্রথমে গ্রেনেড ছুঁড়ে এবং পরে গুলি চালায়। দুই থেকে তিন জঙ্গি হামলার পর পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে যাদের ধরার জন্য পুলিশ, আধাসামরিক বাহিনী যৌথ অভিযান চালাচ্ছেন। বিশেষ করে নজর দেওয়া হচ্ছে কোকরাঝাড় আর ধুবরী জেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে। হামলার দায়িত্ব কেউ স্বীকার করেনি। তবে স্থানীয় জঙ্গি গোষ্ঠী বোডোল্যান্ডকে সন্দেহ করা হচ্ছে। খবর বিবিসি, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও টাইমস অব ইন্ডিয়ার।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, গতকাল শুক্রবার দুপুরে বোডোল্যান্ড স্বশাসিত এলাকার প্রধান শহর কোকরাঝাড় থেকে ৫ কিলোমিটার উত্তরে বালাজান তিনিয়ালী বাজারে ওই হামলা চালানো হয়। দ্বিসাপ্তাহিক ওই হাটে সে সময়ে প্রচুর মানুষ ছিলেন। পুলিশ জানায়, একটি অটোরিক্সায় চেপে সেনা পোশাকে আসা হামলাকারীরা সেখানে পৌঁছায়। প্রথমেই একটি গ্রেনেড ছোঁড়ে তারা। ওই বিস্ফোরণে আতঙ্কিত মানুষজন যখন ছুটে পালাতে যান, তখনই বৃষ্টির মতো গুলি ছুঁড়তে থাকে জঙ্গিরা। কয়েকটি দোকানে আগুন ধরে যায় গ্রেনেড বিস্ফোরণে। খবর পেয়ে কোকরাঝাড় জেলা পুলিশ এবং সিআরপিএফ’র একটি বিশাল দল ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। খবর দেওয়া হয় সেনাবাহিনীকে। এরপরই জঙ্গি এবং নিরাপত্তারক্ষীদের মধ্যে শুরু হয় তুমুল সংঘর্ষ। প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে দু’পক্ষের মধ্যে গুলি বিনিময়ের পর নিরাপত্তারক্ষীদের গুলিতে মৃত্যু হয় এক জঙ্গির। মৃত জঙ্গির কাছ থেক উদ্ধার হয়েছে একটি একে ৪৭ রাইফেল এবং একটি তাজা গ্রেনেড। হামলার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, কয়েক মাস আগে এনডিএফবি’র জ্যেষ্ঠ নেতাকে এনআইএ (জাতীয় তদন্ত সংস্থা) আটক করে। প্রায় ১৫ দিন আগে তাকে আসামি করে চার্জশিটও দেয়া হয়েছে। এই চার্জশিটের প্রতিবাদেই জঙ্গিরা হামলা চালিয়েছে।
বোডোল্যান্ড এলাকা উপদ্রুত অঞ্চল বলে সবসময়েই কড়া পুলিশ-আধাসেনাদের পাহারা থাকে। অন্যদিকে বাজারে আসা মানুষজনরাই আহতদের রক্তাক্ত অবস্থায় সাইকেল বা ভ্যানে চাপিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যেতে শুরু করেন। এই হামলায় মৃতদের মধ্যে যেমন বোডোরা রয়েছেন, তেমনই আছেন বাংলাভাষী হিন্দু ও মুসলমান, রাজবংশীরাও। বাডোল্যাণ্ডের স্থানীয় কাউন্সিলের প্রধান হাগমারা মহিলারি জানিয়েছেন, মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে। সামরিক কর্মকর্তা লে. কর্নেল নিউটন বলেছেন, ‘আমরা মনে করছি অন্তত ৩ জঙ্গি মিলে ওই হামলা চালিয়েছে। তাদের একজন সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে। অন্যদের খুঁজতে অভিযান চলছে।’ ঘটনাস্থল ঘিরে রেখেছে নিরাপত্তা বাহিনী। সেখান থেকে অস্ত্র ও গ্রেনেড উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও পর্যন্ত কেউ হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেনি।
সন্দেহ বোডোল্যান্ডের দিকে
আসাম পুলিশের মহাপরিচালক মুকেশ সাহা দাবি করেছেন, হামলায় বোড়ো বিদ্রোহীদের সংগঠন ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট অব বোড়োল্যান্ড- এনডিএফবি জড়িত। এ নিয়ে প্রচুর তথ্য প্রমাণ রয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি। মুকেশ সাহা বলেন, এ ঘটনায় একজন সন্ত্রাসী নিহত হওয়ার পর দেখা গেছে তার কাছে একে-৪৭ এবং গ্রেনেড ছিল। হামলার ধরন দেখেই বোঝা যাচ্ছে, এটা বোডো বিদ্রোহীদের কাজ হতে পারে। তবে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে তিনি রাজি নন। বোডোল্যান্ড এলাকার অতিরিক্ত পুলিশ মহানির্দেশক এল আর বিশ্নোই জানিয়েছেন, নিহত জঙ্গি ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট অফ বোডোল্যান্ড বা এনডিএফবি’র সংবিজিত গোষ্ঠীর সদস্য। এটি দীর্ঘদিন ধরেই নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন।
এনডিএফবি আসামের বোডোল্যান্ডে বসবাসরত খ্রিস্টানদের একটি সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠন। ভারত সরকার এনডিএফবিকে সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকায় রেখেছে। আসাম থেকে বোডোল্যান্ডের স্বাধীনতা পক্ষে ১৯৮৬ সাল থেকে সশস্ত্র লড়াই করে আসছে। আসামের মোট জনসংখ্যার দশ শতাংশ হচ্ছে বোড়ো সম্প্রদায়ের লোক। এনডিএফবি এর আগে আসামে বেশ কয়েকটি হামলা চালিয়েছে। তাদের হামলার প্রধান লক্ষ্য নিরাপত্তা বাহিনী ও বোড়ো সম্প্রদায়ের বাইরের লোকজন। বিশেষ করে সাঁওতাল, মুণ্ডা, ওরাও আদিবাসীদের ওপর হামলা চালিয়েছে সংগঠনটি। ১৯৯৬ সালে আসামের বিধানসভা নির্বাচনের সময় প্রতিদ্বন্দ্বী আদিবাসী কোবরা ফোর্সের ওপর বিরাটাকারের হামলা চালায় এনডিএফবি। এরপর সংগঠনটি হিন্দুদের নিয়ন্ত্রিত জঙ্গি সংগঠন বোডো লিবারেশন ফোর্সের সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। ২০০০ সাল থেকে তাদের দাবি করা বোড়ো ভূখণ্ডে মুসলিম অভিবাসীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। নব্বইয়ের দশকে এনডিএফবি ভুটান-আসাম সীমান্তে ১২ ক্যাম্প স্থাপন করে। রয়্যাল ভুটান আর্মির অভিযানের পর এনডিএফ ২০০৫ সালের মে মাসে ভারত সরকারের সঙ্গে অস্ত্র বিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এতে করে এনডিএফ ভেঙে বিভক্ত হয়ে যায়। একটি অংশ শান্তি আলোচনার পক্ষে আরেকদল আত্মসমর্পণের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। ২০১২ সালে আবারও বিভক্ত হয় সংগঠনটি। অ-বোডো আইকে সংবিজিতের নেতৃত্বাধীন এনডিএফবি (এস) অংশটি সন্ত্রাসী হামলা অব্যাহত রাখে। ২০১৪ সালে মে ও ডিসেম্বর মাসে হামলার জন্য এই অংশটিকে দায়ী করেছে ভারত সরকার।
হাগ্রামা মইলারীর নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীটির হাতেই এখনও পর্যন্ত বোডোল্যান্ড স্বশাসিত এলাকার শাসনভার রয়েছে। তারা রাজ্যে ক্ষমতাসীন সরকারে বিজেপির জোটসঙ্গী। তবে আই কে সংবিজিতের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীটি এখনও সশস্ত্র পথ থেকে সরে আসেনি। তারা মাঝে মাঝেই হামলা চালায় ওখানকার বাঙলাভাষী মুসলমান, কখনও বা ক্রিশ্চান আদিবাসীদের ওপরে। বোডো জঙ্গিদের অভিযোগ তাদের এলাকা দখল করে নিয়েছে বহিরাগত মুসলমান আর আদিবাসী ক্রিশ্চানরা। ২০১২ সাল থেকে একের পর এক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে ওই হামলার পরে পরেই। ওই হামলার পরে লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বোডোল্যান্ড এলাকার এই গণহারে বাস্তুচ্যুতির ঘটনাকে ‘এথনিক ক্লেনসিং’ বলে মন্তব্য করে থাকেন।
ভারতের উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা
মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোওয়াল মৃত ও আহতদের জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণের কথা ঘোষণা করেছেন। নিহতদের স্বজনদের পাঁচ লাখ এবং আহতদের এক লাখ রুপি করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি দিল্লি থেকে আসামের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন গতকাল। তিনি এই ঘটনা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী মোদী হামলার কঠোর নিন্দা জানিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গেও সাক্ষাত্ করেছেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংও মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরিন রিজিজিজু জানিয়েছেন, দোষীদের গ্রেপ্তারে এবং শাস্তি দিতে যাবতীয় সহায়তা কেন্দ্র থেকে দেওয়া হবে। কংগ্রেসের ভাইস প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধীও এক টুইটার বার্তায় এই হামলার কঠোর নিন্দা জানিয়েছেন। রাজ্য মন্ত্রীসভার দ্বিতীয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ঘট্নাস্থলে যায়। হিমন্ত বিশ্বশর্মা জানান, এটা বর্বরোচিত হামলা। তিনি জানান, পুলিশ,সিআরপিএফ এবং আধা সামরিক বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে জঙ্গিদের খুঁজে বের করতে। সেনাবাহিনীও প্রস্তুত রয়েছে। প্রয়োজন হলে তাদের কাজে লাগানো হবে।
