প্রকৌশলী থেকে সফল উদ্যোক্তা

'অন্যরকম' সোহাগের গল্প

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১২:৪২

পড়ালেখায় ভালো হওয়ায় মা-বাবা চেয়েছেন ছেলেকে ডাক্তার বানাবেন, কিন্তু ছেলে হতে চাইলেন প্রকৌশলী। যথারীতি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে ভালো ফল করে ভর্তি হলেন বুয়েটে। পরে ভালো চাকরি পেলেও সিদ্ধান্ত নিলেন উদ্যোক্তা হবেন। গড়ে তুললেন দেশের বহুমাত্রিক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অন্যরকম গ্রুপ। সৃষ্টি হলো বহু মানুষের কর্মসংস্থান। বলছিলাম অন্যরকম গ্রুপের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান সোহাগ-এর কথা।

শিক্ষক বাবা আবুল হোসেনের তিন সন্তানের সবচেয়ে ছোট সন্তান মাহমুদুল হাসান সোহাগ ১৯৮৩ সালের ৭ জুন জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। সরিষাবাড়ীর স্থানীয় প্রতিষ্ঠান নাসিরউদ্দিন কিন্ডারগার্টেনে কাটে তাঁর বাল্যকাল। পরবর্তীতে রিয়াজ উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয় থেকে বোর্ড স্ট্যান্ডসহ কৃতিত্বের সাথে মাধ্যমিক সম্পন্ন করে ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। উচ্চমাধ্যমিকে সম্মিলিত মেধাতালিকায় পঞ্চম হন সোহাগ। পরে তড়িৎ প্রকৌশলে ভর্তি হন বুয়েটে। শেষবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়টির আইআইসিটিতে রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে চাকরি শুরু করেন। কিন্তু বছরখানেক বাদে চাকরি ছেড়ে দিয়ে ভাবলেন এবার উদ্যোক্তা হবেন। অন্যরুকম গ্রুপে গড়ে তুললেন বেশকিছু প্রতিষ্ঠান। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রকমারি ডটকম, যেটি অনলাইনে বই কেনার জন্য সারাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

এছাড়াও সোহাগ বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড-এর একাডেমিক কাউন্সিলরও ছিলেন। তার কোম্পানি পাই ল্যাবস বাংলাদেশ লিমিটেড থেকে নির্মাণ করা হয়েছে বাংলাদেশের প্রথম ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম)। এছাড়া তিনি ইজি ভোটিং কাউন্ট সিস্টেম (ইভিসিএস) ও ইজি ওমআর সল্যুশন সফটওয়্যারেরও জনক। সোহাগের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় ২,০০০ হাজারের বেশি কর্মী কাজ করছেন। খণ্ডকালীন কর্মীর সংখ্যা আরও অনেকবেশি। সোহাগ বলেন,  ‘অত্যাধিক জনসংখ্যাকে আমরা সমস্যা মনে করি; কিন্তু বাস্তবতায় জনসংখ্যাকে ঠিকমতো কাজে না লাগাতে পারাটা সমস্যা। আমাদের ফোকাস যদি হয় জনশক্তিকে দক্ষ করে তোলা, সমৃদ্ধ করা—তবেই আমরা অর্থনীতিতে অন্যদের থেকে এগিয়ে যাব।’

তবে সোহাগের উদ্যোক্তা জীবনের শুরু এরও আগে, বুয়েটের প্রথম বর্ষে থাকাকালীন সময়ে। একদিকে সেশনজট তাকে ভাবিয়ে তুলছিল, অন্যদিকে ক্লাস-প্রাইভেট পড়ার সময় খেয়াল করতেন শিক্ষকদের তেমন একটা প্রশ্ন করার সুযোগ নেই। তিনি চিন্তা করলেন, এমন একটা একাডেমিক প্রতিষ্ঠান করবেন, সেখানে নির্দ্বিধায় যেকেউ যেকোনো প্রশ্ন করবে। যে চিন্তা সেই কাজ—কয়েকজন সহপাঠীকে নিয়ে মাত্র ছয় হাজার টাকা পুঁজি দিয়ে চালু করেন ‘উদ্ভাস’ একাডেমিক কেয়ার। ৮০০ টাকা ভাড়ায় একটি কক্ষে কার্যক্রম শুরু করেন; প্রতিষ্ঠার কয়েকমাস পর ছাত্রসংখ্যা কমতে থাকায়, জমে যায় বেশ কয়েকমাসের বকেয়া ভাসা বাড়া। এমন পরিস্থিতিতে বেশ কয়েকজন পার্টনার বিদায় নিয়ে নেয়; কিন্তু সোহাগ ও আরেক পার্টনার আবুল হাসান চালিয়ে নেন উদ্ভাস। সময়ের পালাবদলে সেই উদ্ভাস এখন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি সহযোগী শিক্ষা সংস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে তাঁদের প্রায় ৬০ টিরও বেশি শাখা রয়েছে।

দেশের ই-কমার্স খাতে যুগান্তকারী ভুমিকা রাখার জন্য বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে পেয়েছেন উদ্যোক্তা সম্মাননা, আনোয়ারুল কাদির ইনোভেটর অ্যাওয়ার্ড, প্রথম আলো উদীয়মান তরুণ উদ্যোক্তা সম্মাননা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে তরুণ উদ্যোক্তা এবং ইভিএম জি কো-ইনভেন্টর হিসেবে অবদান রাখায় ‘বিশেষ সম্মাননা’ পুরস্কার। এছাড়াও বিশ্বের সর্ববৃহৎ সিটি স্কুল ‘সিটি মন্টেসরি স্কুল’ কর্তৃক ‘অ্যাম্বাসেডর অব পিস’ সম্মাননাসহ পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা।

ইত্তেফাক/এসটিএম