আমার প্রাণের বাংলা

ফেব্রুয়ারি মানেই ফাগুন আর আগুন। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকার রাজপথে সালাম, রফিক, বরকতের রক্তে ভেজা পিচঢালা রাজপথ। এত দামে কেনা এই ভাষার মর্যাদা ধরে রাখতে কতটা সচেষ্ট আমরা? মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় কি ভাবছে তারুণ্য, তা জানাচ্ছেন আহসান জোবায়ের

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৯:৫৬

বাংলা ভাষার বিকাশের ইতিহাস ১৩০০ বছরের অধিক পুরনো। মুসলিম সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছিল বাংলা ভাষায়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতাবিরোধী বাংলার নবজাগরণে ও বাংলার সাংস্কৃতিক বিবিধতাকে একসূত্রে গ্রন্থনেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফল প্রকৃতপক্ষে মাতৃভাষা, এর ব্যতিরেকে কি স্পষ্টভাবে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করা যায়? পরিপূর্ণতা আসে? অবশ্যই না। কেননা যে ভাষায় আপামর জনতা অভ্যস্ত নয় সে ভাষা কখনই সর্বস্তরে বোধগম্য হবে না। পৃথিবীতে আমরাই একমাত্র জাতি যারা কি-না মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য রক্ত দিয়েছি। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকার রাজপথ ভিজেছে রক্তে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এই আমরাই আবার প্রতিনিয়ত অবহেলা করছি আমাদের মাতৃভাষাকে। ইদানীং ইংরেজি মাধ্যমে পড়ার হিড়িক পড়েছে। চারপাশে ইংরেজি লিখার ছাড়াছড়ি। অন্য যেকোনো ভাষা শিক্ষায় দোষ নেই, তবে নিজের মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করে কেন? নিজের ভাষাকে যথার্থ সম্মান দিয়ে সরকারি, বেসরকারি অফিস, আদালতের সকল কার্যক্রমে বাংলা ভাষাকে প্রধান্য দিতে হবে। বাংলা নিয়ে গবেষণা হোক, সর্বক্ষেত্রে বাড়ুক বাংলার বহুল ব্যবহার।
—আসফিকুর রহমান আশিক

 

মাতৃভাষা অর্থ মায়ের ভাষা। বাংলাদেশের মাতৃভাষা বাংলা। জন্মের পর মায়ের কোলে মায়ের বাংলা বলে আমরা বড় হই। বাঙালি ছাড়া আর কোনো জাতি তার নিজের ভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করেনি। অকাতরে জীবন বিলিয়ে দেয়নি। তাইতো ফেব্রুয়ারি এলেই আমাদের মধ্যে নতুন করে ভাষাপ্রেম জেগে ওঠে। একুশের মূল চেতনা ছিল রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু রাখা। দেশের সকল মানুষ নিজের ভাষায় যাতে লিখতে ও পড়তে পারে তা নিশ্চিত করা। কিন্তু তা এখনো সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। উচ্চ আদালত, প্রশাসনসহ সর্বত্র এখনো ইংরেজির দাপট। ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্রও লেখা হয় ইংরেজিতে, যেখানে দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ নিরক্ষর। সাইনবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন এমনকি বিজ্ঞাপনেও অপ্রয়োজনীয় ইংরেজির ছড়াছড়ি। কথাবার্তায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্রিত ভাষার ব্যবহারই যেন এক নতুন ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ অনেক ইংরেজি পারদর্শী শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো বাংলা বলতেই পারেনা, যা আমাদের জন্য লজ্জার। পারিবারিক শিক্ষায় বাংলা ভাষার প্রতি সন্তানদের প্রেম জাগ্রত করতে হবে, শুদ্ধ বাংলা চর্চা করতে হবে। রক্ষা করতে হবে বাংলা ভাষার মান।
—মাহমুদা আহমেদ মুক্তি

 

ভাষা আমাদের পরিচয়, আমাদের গৌরব, আমাদের স্বত্তা। মাতৃভাষায় স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারা অহংকারের বিষয় । তবে সেই অহংকারে যেন মিশে না যায় অন্য সংস্কৃতির ছাপ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, হাট-বাজার, ব্যবসা-বাণিজ্য সকল ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিতে হবে মাতৃভাষাকে। আমাদের বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছেই মাতৃভাষা বলতে শুধুমাত্র একটি দিবস, একটি অনুষ্ঠান। তারা জানে না ভাষার মর্যাদা কিভাবে রক্ষা করতে হয়। রফিক, শফিক, বরকত, সালাম, জব্বারসহ ভাষা শহীদদের ত্যাগের মহিমা তাদের কাছে অজানা। বিদেশি ভাষায় দক্ষতা বৃদ্ধি করতে আমরা ব্যস্ত, অথচ অনেকের কাছেই মাতৃভাষা উহ্য। এই ধ্যানধারণা থেকে বের হয়ে না আসতে পারলে আমরা কখনোই মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে পারব না । আমাদের বর্তমান প্রজন্মকে বিদেশি ভাষার প্রতি আকৃষ্ট না করে তাদেরকে মাতৃভাষায় শিক্ষিত করতে হবে। এই প্রজন্মের মাঝে যদি মাতৃভাষা সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া যায় তাহলে পরবর্তী প্রজন্ম মাতৃভাষার গুরুত্ব বুঝবে। একুশে ফেব্রুয়ারি পালনে আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য বজায় রাখতে হবে, 'সর্বস্তরে বাংলা চালু করো’ এই স্লোগানটি যতদিন না বাংলার মানুষের ঘরে ঘরে প্রতিষ্ঠিত হবে ততদিন বাংলা ভাষার মর্যাদা  রক্ষা হবে না। আমাদের জীবন, সংস্কৃতি, সভ্যতায় সকল ক্ষেত্রে বাংলা ভাষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বাংলা ভাষাকে ভালোবাসতে হবে। বাংলাকে ভালোবাসতে হবে।
—ইমরান হুসাইন

 


ফেব্রুয়ারি মাস ভাষার এবং আশার মাস। ফেব্রুয়ারি মানুষের মনে শুধু ফাগুনের আনন্দই জাগায় না, সাথে সাথে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতির কথাও মনে করে দেয়। ভাষার কথা আসলেই শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, মমতাবোধ মনের মধ্যে অজান্তেই জেগে উঠে। আমরা বাঙালিরা হচ্ছি পৃথিবীর একমাত্র জাতি যারা নিজেদের মাতৃভাষা রক্ষায় প্রাণ  দিতেও দ্বিধাবোধ করিনি। ভাষাভাষীর দিক থেকে বাংলা বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম ভাষা, কিন্তু তারপরও আমাদের মাঝে বিদেশি ভাষা চর্চার আগ্রহই বেশি। কেন? কারণ আমরা মনে করি ইংরেজি বা বাংলিশ ভাষা না আওড়ালে বন্ধুমহলে আমাদের জনপ্রিয়তা বাড়বে না। কেউ যদি আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে আমরা তাকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করি। ইংরেজি ভাষা জানা আমাদের সবার জন্যই জরুরি, কিন্তু তা কখনোই মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করে নয়। মাতৃভাষার গুরুত্ব যাদের কাছে যত বেশি সেই জাতি ততবেশি উন্নত। চীন, জাপান, রাশিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স ইত্যাদি দেশের দিকে চোখ রাখলেই কথাটার প্রমাণ মেলে। মাতৃভাষাকে সম্মান ও আত্মস্থ করা ব্যতীত উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। তাই জীবনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগ করতে হবে। শুধু ফেব্রুয়ারি মাসেই নয়, সমগ্র বছরজুড়ে হোক শুদ্ধ বাংলা ভাষার চর্চা। বর্তমান প্রজন্ম এবং আগামী প্রজন্মের কাছে মাতৃভাষার মর্যাদা তুলে ধরতে হবে। বাংলা ভাষাকে কেন্দ্রে রেখে অন্য ভাষায় পারদর্শিতা অর্জন করতে হবে।
—জান্নাতুল শাহরিন অনন্যা

 


বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে রক্তের বিনিময়ে বীরদর্পে মাতৃভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে 'বাংলা'। বর্তমানে সুষ্ঠ সামাজিকীকরণের অভাবে বাংলা ভাষা হারাতে বসেছে তার স্বকীয়তা। সমাজিক মূল্যবোধের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে বার বার অপমানিত হচ্ছে রক্তার্জিত আমার প্রিয় বাংলা ভাষা। ব্যাক্তির সামাজিকীকরণের অন্যতম প্রতিষ্ঠান গণমাধ্যম  বাংলা শেখার অন্যতম ক্ষেত্র হলেও সাম্প্রতিক সময়ে ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের একাংশ যেন বাংলা ভাষা বিকৃত করাকে নিজেদের কর্তব্য বলে বেছে নিয়েছে। সামাজিকীকরণের আরেক প্রতিষ্ঠান বিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে অভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। একসময় প্রমিত বাংলা ভাষা শেখার নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র বলে বিবেচিত হতো দেশের বিদ্যালয়গুলো। কিন্তু সে ঐতিহ্য এখন অতীত হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের বিদ্যালয়গুলোতে প্রমিত বাংলা শেখার যথাযথ সুযোগ পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা। আনুষ্ঠানিক যোগাযোগে বাংলা ভাষায় কথা বলার চর্চাও হারিয়ে যাচ্ছে।  বিদেশি ঢঙে ইংরেজি মিশিয়ে বাংলা বলা তরুণদের একাংশের ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়াও আধুনিক আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে বিদেশী ভাষার লাগামহীন দৌরাত্মে মাতৃভাষার মর্যাদা ক্ষুন্ন  হচ্ছে। তাই মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় সচেতনতার বিকল্প নেই।
—রকি মেরাজ

 

ইত্তেফাক/এসটিএম