শিশু-কিশোরদের কোরআন শেখায় ছোট দুই বোন

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২২, ১৭:৫১

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত চৌদ্দ বছর বয়সী আমেরিকান মারইয়াম মাসুদ ও ছয় বছর বয়সী তাঁর ছোটবোন ফাতিমা মাসুদ সোশ্যাল মিডিয়া ও টিভি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সমবয়সী শিশু-কিশোরদের শেখাচ্ছে পবিত্র কোরআনের শুদ্ধ তেলাওয়াত। উপস্থাপন করছেন ইসলামী নানা বিষয়; তাদের ভিডিও দেখছে লাখ লাখ শিশু-কিশোর। তবে দু’বোনের এ যাত্রাটা সহজ ছিলো না—নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে তারা নিজেদের মেলে ধরছেন খুদে কোরআন শিক্ষক হিসেবে।

মারইয়াম মায়ের গর্ভে থাকাকালীন আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্টে দেখে ডাক্তার বলেছিলেন, অনাগত শিশু ‘ডাউন সিনড্রোম’ নিয়ে জন্মাবে। বিকলাঙ্গ হওয়ার সম্ভবনা প্রকট! মারইয়ামের মা শাকিলা তখন আল্লার কাছে দোয়া করেন— মেয়েটি যেন সুস্থ হয়ে জন্মায়। মনে মনে নিয়ত করেন, মেয়েকে কোরআনের হাফেজা বানাবেন; ইসলামের জন্য নিবেদিত করবেন। মায়ের দোয়া বৃথা যায়নি। মারইয়াম পৃথিবীতে এসেছিল সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে। বাবা মাসুদুর রহমানের নামানুসারে জন্মের পর তার নাম রাখা হলো মারইয়াম মাসুদ লাম।

মা শাকিলা নিয়ত মতেই মেয়েকে কোরআনের হাফেজা বানানোর প্রস্তুতি নিতে থাকেন। ছোটবেলা থেকে মা শাকিলা মারইয়ামকে তাজবিদ শেখানোর পাশাপাশি কুরআনের ছোট ছোট সূরাগুলো মুখস্থ করাতে থাকেন। মেয়েকে শুদ্ধ কোরআন তেলাওয়াত শেখানোর জন্য নিজেই আল মাগরিব ইনিস্টিউট থেকে তাজবিদের উপর করেছেন কোর্স; এছাড়াও কুরআন শেখানো কয়েকটি ইনস্টিটিউট থেকে নিয়েছেন উচ্চতর প্রশিক্ষণ। মারইয়ামের বয়স যখন চার বছর, তখনি তার সুরেলা কণ্ঠের কোরআন তেলাওয়াত বিস্মিত ও মুগ্ধ করতো সবাইকে। সাত থেকে নয়— দুই বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের পর মারইয়াম মাত্র নয় বছর বয়সে কোরআনে হাফেজা হয়েছে। অবাক করা ব্যাপার হলো- মারিয়াম কোনো নির্দিষ্ট হিফজের স্কুলে কখনো ভর্তি হয়নি। মায়ের মুখে শুনে শুনে কোরআন মুখস্থ করেছে সে।

মারইয়ামের বর্তমান বয়স পনের ছুঁই ছুঁই। পড়ছে অষ্টম গ্রেড-এ নিউ জার্সির নূর একাডেমিতে। বাবা-মা দুজনেই বাংলাদেশি নাগরিক। মারইয়ামের বাবা মাসুদুর রহমান পেশায় একজন সফটওয়্যার প্রকৌশলী। সপরিবারে বাস করেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির সমারসেটে। মারইয়ামের মতো তার ছোটবোন ফাতিমা মাসুদও জনপ্রিয় কোরআনের খুদে শিক্ষক হিসেবে। বয়স তার ছয় এর কোঠায়। এখনই সে পবিত্র কোরআনের ৯ পারা মুখস্থ করে ফেলছে। এরমধ্যেই মারইয়ামের সাথে টিভি চ্যানেলে করেছে কুরআন বিষয়ক বহু অনুষ্ঠান। সেও মারইয়াম সাথে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত কোরআন শেখার ক্লাশে উপস্থিত থাকে। কাতার, মালেশিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশে ইসলামিক সেমিনারও করেছে তারা। 

মারইয়ামের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব মিলে এখন অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ৩৬ লাখের মতো। বর্তমানে মারইয়াম গাইড ইউএস টিভিতে ‘কোরআন উইথ মারইয়াম’ শীর্ষক শিশুদের একটি অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করছে। বিখ্যাত মুসলিম স্কলার ড. ইয়াসির কাদ্বির সঙ্গে মারইয়ামের কুরআন শেখানো বিষয়ক অনুষ্ঠান অস্ট্রেলিয়ার টেলিভিশন চ্যানেল ওয়ানফোরকিডস এবং মালয়েশিয়ান চ্যানেলে ‘ওমর’ ও ‘হানা শো’ প্রচারিত হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে পিতৃমাতৃহীন শিশুদের নিয়ে কাজ করা সংস্থা ইসলামিক রিলিফ ইউএস-এর অ্যাম্বাসেডর সে। পিতৃ-মাতৃহীন অনাথ শিশুদের সাহায্যের জন্য নিজের সোশ্যাল মিডিয়া একাউন্টের মাধ্যমে তুলেছেন কয়েক লক্ষ টাকা ডোনেশন পৌঁছে দিয়েছে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের খাবার ও পড়ালেখার কাজে। 

ভয়েজ অব আমেরিকার এক সাক্ষাৎকারে মারইয়াম বলে, ‘ভবিষ্যতে আমি ইসলামিক স্কলার হতে চাই। যাতে আগামী প্রজন্ম পবিত্র কোরআন পড়তে ও তার বাণীর সৌন্দর্য অনুধাবন করতে পারে। ইসলামকে নিজেদের জীবনে মননশীল করতে পারে।’

মারইয়াম বহুমাত্রিক কাজের জন্য মুসলিম বিভিন্ন দেশ থেকে পেয়েছেন একাধিক সম্মাননা। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ থেকেও পেয়েছেন কোরআন সম্মাননা।

ইত্তেফাক/এসটিএম