সামনে বিস্তৃত সবুজ মাঠ। পেছনে তাল-সুপারির বনানী। একপাশে জলে টইটুম্বুর দীঘি। অন্যপাশে সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলে যাওয়া খাল। আর মধ্যখানে মধ্যমণি হয়ে আছে একটি ‘ই’ আকৃতির স্থাপনা। প্রিয় উলানিয়া করোনেশন হাইস্কুল। হাজারো শিক্ষার্থীর প্রাণের বিদ্যাপীঠ। শতবর্ষ পার করলো স্কুলটি। ১৯১২ সালে যাত্রা হলো শুরু। আজও চলছে অবিরাম। স্কুলটির অবস্থান বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে। উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার উত্তরে। উলানিয়া জমিদার বাড়ি সংলগ্ন। স্কুল প্রতিষ্ঠার ছোট্ট একটা গল্প শোনা গেছে স্থানীয়দের কাছ থেকে। এ এলাকার প্রবীণ মাস্টার কায়সার আহাম্মেদ জানালেন- স্কুল প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। তিনি শুনেছেন তার বাবা তত্কালীন চেয়ারম্যান মাস্টার মকবুল আহাম্মেদের কাছ থেকে। তার কথার সারমর্ম অনেকটা এরকম।
উলানিয়ায় ১৯১২ সালের আগ পর্যন্ত কোনো স্কুল ছিলো না। জমিদার বাড়ির ছেলেরা ঢাকা, কলকাতা ও বরিশাল শহরে লেখাপড়া করত। জমিদারদের ভাবনা ছিল নেতিবাচক। প্রজার সন্তান শিক্ষিত হলে তাদের সম্মান করবে না—এমনটাই ধারণা ছিলো। তবে তাদের এ ধারণা ভুল প্রমাণিত করলো এক প্রজার ছেলে। সে ১৯১১ সালের কথা। কলকাতার গড়ের মাঠে সমগ্র বাংলার জমিদারদের বার্ষিক সম্মেলন শুরু হয়। বাংলার তত্কালীন মুখ্যমন্ত্রীসহ অন্য রাষ্ট্রীয় অতিথিরা মঞ্চে বসা। অনুষ্ঠান পরিচালনা করছিলেন তত্কালীন মন্ত্রিপরিষদের সচিব। দর্শকসারিতে শত শত জমিদার বসা। হঠাত্ অনুষ্ঠানের পরিচালক মাইকে ঘোষণা করলেন, আমি বরিশালের উলানিয়ার এক গরিব প্রজার সন্তান। এক মহানুভব জমিদারের সহায়তায় আমি লেখাপড়া করতে পেরেছি। উলানিয়ার সেই জমিদার ইসহাক চৌধুরী দর্শকসারিতে বসা থাকবেন আর আমি মঞ্চে, এমনটা হতে পারে না। তাই আমি ইসহাক চৌধুরীকে মঞ্চে আসন গ্রহণ করার অনুরোধ জানাচ্ছি। সঙ্গে সঙ্গে করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো সমাবেশস্থল। বিষয়টি চৌধুরীর মনে দাগ কাটে। তিনি ভাবলেন, যেখানে শত জমিদার দর্শকসারিতে, সেখানে শিক্ষার জোরে এ গরিব প্রজার সন্তান অতিথির আসনে। তাই তিনি উলানিয়ায় একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার কথা চিন্তা করলেন। যাতে এ এলাকার সন্তানেরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভালো পদে অধিষ্ঠিত হতে পারে। সম্মেলন থেকে ফিরেই তিনি বিশাল সুপারি বাগান কেটে নির্মাণ করেন একটি শনের ঘর। সেখান থেকেই ১৯১২ সালে উলানিয়া স্কুলের পথচলা শুরু। সম্ভবত জমিদার ইসহাক চৌধুরীর স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। এই স্কুলের অনেক শিক্ষার্থী বর্তমানে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত। তাদের মধ্যে আছেন প্রখ্যাত কলামিস্ট আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান কবি আসাদ চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রব, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার সাবেক ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আজিজুল ইসলাম ভূঁইয়া, প্রখ্যাত আইনজীবী এডভোকেট মুনসুর আহাম্মেদ, ঢাকার পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ, যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতা নুরুর রহমান জাহাঙ্গীর, সাবেক সচিব গোলাম মোস্তফা তালুকদার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মো.আরিফ হোসেন, ছাত্রনেতা মো. সেলিম হোসেন প্রমুখ।
উলানিয়া সম্পর্কে বলতে গিয়ে কবি আসাদ চৌধুরী বলেন- প্রচুর উলুবন থাকার কারণে এ অঞ্চলের নামকরণ করা হয়েছে উলানিয়া। এখানে প্রচুর নলের আখড়া থাকায় নলের হাবেলী নামেও পরিচিত ছিল। ৩০০ বছর আগে নয়া রাজা চৌধুরী, কালা রাজা চৌধুরী ও হাসান রাজা চৌধুরী— এই তিন সহোদর লবণের ব্যবসায়ের জন্য উলানিয়ায় বসতি স্থাপন করেন। ব্রিটিশ আমল থেকেই কলকাতা থেকে উলানিয়ায় পত্রিকা যেতো। সে সময় উলানিয়ার রাস্তায় কেরোসিন জ্বালিত ল্যাম্প পোস্ট ছিলো।
একটা খারাপ সংবাদ দিয়ে শেষ করছি। প্রিয় এই স্কুলের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে সর্বনাশা মেঘনা নদী। সাত বছর আগে উলানিয়া স্কুল থেকে মেঘনার দূরত্ব ছিল ছয় কিলোমিটার। এখন তা দশমিক ১৫ কিলোমিটার। তাহলে কি হারিয়ে যাবে উলানিয়া স্কুল? হারিয়ে যাবে নাট্যকার আতিকুল হক চৌধুরী, মরহুম বিচারপতি আব্দুর রহমান চৌধুরী, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, ভাষাসৈনিক বাহাউদ্দিন চৌধুরীর স্মৃতিবিজড়িত উলানিয়া?
লেখক: সাংবাদিক
